শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও জনসংঘের প্রতিষ্ঠা
১৯৫০ সালে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে লিয়াকত-নেহরু চুক্তির বিরোধিতা করে কেন্দ্রীয় শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর লক্ষ্য ছিল, দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়, জাতীয় ঐক্য এবং ভারতীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করা।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ব্যক্তিত্বের সহযোগিতায়, বিশেষত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মতো নেতাদের সঙ্গে নিয়ে, ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জনসংঘ। জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ একীকরণের দাবিও সংগঠনটির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য ছিল, একটি দেশে দুটি সংবিধান, দুটি প্রধান এবং দুটি পতাকা থাকতে পারে না।
১৯৫৩ সালে কাশ্মীরে তাঁর মৃত্যুকে জনসংঘের রাজনৈতিক আন্দোলনে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। জাতীয় সংহতি, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা এবং কাশ্মীরের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে তাঁর অবস্থান পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বিজেপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকে।
জনসংঘ থেকে বিজেপি: রাজনৈতিক বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
১৯৫১–১৯৬৭: জনসংঘের উত্থান
প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনটি আসন পায় জনসংঘ। পরে দীনদয়াল উপাধ্যায় ‘একাত্ম মানবদর্শন’-এর ধারণাকে দলের আদর্শগত ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। ১৯৬৭ সালে একাধিক রাজ্যে কংগ্রেসবিরোধী জোট সরকারেও অংশ নেয় জনসংঘ।
১৯৭৫–১৯৭৭: জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন
ইন্দিরা গান্ধীর ঘোষিত জরুরি অবস্থার বিরোধিতায় জনসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্য গড়তে জনতা পার্টিতে মিশে যায় জনসংঘ। অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আডবাণীর মতো নেতারা পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
১৯৮০–১৯৯৬: বিজেপির আত্মপ্রকাশ ও বিস্তার
জনতা পার্টির অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের পর প্রাক্তন জনসংঘ নেতারা ১৯৮০ সালে বিজেপি গঠন করেন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন অটলবিহারী বাজপেয়ী। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মাত্র দুটি আসন পেলেও, আডবাণীর নেতৃত্বে রাম জন্মভূমি আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রসারের সঙ্গে দলের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। ১৯৯৬ সালে বিজেপি লোকসভার বৃহত্তম একক দল হয়ে ওঠে।
১৯৯৮–২০০৪: এনডিএ সরকারের অধ্যায়
বাজপেয়ীর নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) সরকার দেখায়, কংগ্রেসের বাইরে থাকা একটি জোটও পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারে। পারমাণবিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সংস্কার ও পরিকাঠামো উন্নয়ন এই সময়ের উল্লেখযোগ্য বিষয়।
২০১৪ থেকে বর্তমান: সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও আদর্শগত কর্মসূচি
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিজেপি। ২০১৯ সালে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং ২০২৪ সালে রামমন্দিরের উদ্বোধন দলের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
অর্থনৈতিক দর্শন: স্বদেশি থেকে আত্মনির্ভর ভারত
জনসংঘের অর্থনৈতিক দর্শন গড়ে উঠেছিল নেহরুর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনা ও বৃহৎ সরকারি শিল্পকেন্দ্রিক মডেলের বিকল্প হিসেবে। ছোট ব্যবসা, কৃষি, গ্রামীণ শিল্প এবং স্থানীয় উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছিল দলটি। অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরতার বিরোধিতা করে স্বদেশি অর্থনীতির পক্ষে সওয়াল করা হয়েছিল।
দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ‘একাত্ম মানবদর্শন’-এর পাশাপাশি ‘অন্ত্যোদয়’—সমাজের প্রান্তিকতম মানুষের উন্নয়ন—এই রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হয়ে ওঠে।
তবে বর্তমান বিজেপির অর্থনৈতিক নীতি আগের জনসংঘের মডেলের হুবহু প্রতিরূপ নয়। বিশ্বায়ন, প্রযুক্তি ও বেসরকারি বিনিয়োগের বাস্তবতা মেনে নিয়ে সরকার একদিকে বাজারনির্ভর বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছে, অন্যদিকে মহাসড়ক, রেল, বন্দর এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোয় সরকারি মূলধনী ব্যয় বাড়িয়েছে।
এই পরিবর্তনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল:
-
● আত্মনির্ভর ভারত: দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহ-শৃঙ্খলে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য।
-
● প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI): নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে আর্থিক প্রণোদনা।
-
● ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার: আধার, ইউপিআই এবং ডিজিলকারের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিষেবা প্রদান ও আর্থিক লেনদেনের ডিজিটাল সম্প্রসারণ।
-
● কর ও ব্যবসায়িক সংস্কার: জিএসটি, করব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ।
-
● অন্ত্যোদয় থেকে কল্যাণমূলক পরিষেবা: আবাসন, শৌচাগার, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যবিমা ও কৃষি সহায়তার মতো প্রকল্পের মাধ্যমে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উপর জোর।
অর্থাৎ, জনসংঘের স্বদেশি ভাবনা বর্তমান বিজেপির কাছে কেবল আমদানি কমানো বা দেশীয় পণ্য ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং দেশীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি, পরিকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে তা যুক্ত হয়েছে।
‘লাভার্থী’ রাজনীতি ও বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি
ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জাতপাতভিত্তিক সমীকরণ, নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সমর্থন এবং আঞ্চলিক জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিজেপি সেই পরিচিত সমীকরণের পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপকদের একটি বৃহত্তর ভোটার গোষ্ঠী হিসেবে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে। এই গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘লাভার্থী’ বলা হয়।
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, উজ্জ্বলা যোজনা, স্বচ্ছ ভারত অভিযান এবং পিএম-কিষান প্রকল্পের মতো কর্মসূচির সুবিধাপ্রাপকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে দলটি সামাজিক ভিত্তি বিস্তারের চেষ্টা করেছে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পাঠানো বা ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT), আধারভিত্তিক পরিষেবা এবং ডিজিটাল যোগাযোগ এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এর পাশাপাশি বুথস্তরে ‘পন্না প্রমুখ’ ব্যবস্থা—ভোটার তালিকার নির্দিষ্ট পৃষ্ঠার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী—এবং ধারাবাহিক প্রচার বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে সাহায্য করেছে। নির্বাচনের সময়সীমার বাইরে গিয়েও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার এই কৌশল দলটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপর জোর দিয়ে বিজেপি প্রশাসনিক পরিষেবা প্রদানকে রাজনৈতিক বার্তার অংশ করে তুলেছে। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, সুবিধার প্রকৃত বণ্টন এবং তার নির্বাচনী প্রভাবের মূল্যায়ন করতে হলে সরকারি তথ্য ও স্বাধীন পর্যালোচনাও গুরুত্বপূর্ণ।
৩৭০ অনুচ্ছেদ থেকে রামমন্দির: আদর্শগত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন
দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির একাধিক আদর্শগত প্রতিশ্রুতি বিরোধীদের কাছে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকার গঠনের পর দলটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে।
-
● ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ, ২০১৯: জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহার করা হয় এবং রাজ্যটিকে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ—এই দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পুনর্গঠন করা হয়। বিজেপি একে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পূর্ণ একীকরণের দাবির বাস্তবায়ন হিসেবে তুলে ধরে।
-
● রামমন্দির, ২০২৪: অযোধ্যায় রামমন্দিরের উদ্বোধন দীর্ঘদিনের রাম জন্মভূমি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে এটি বিজেপির রাজনৈতিক বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
-
● নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA): পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, আইন নির্ধারিত শর্তপূরণকারী ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ সহজ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইনটি নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কও রয়েছে।
-
● পরিকাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তা: মহাসড়ক, বিমানবন্দর, রেল যোগাযোগ এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর উন্নয়নকে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
-
● বিদেশনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান: জি২০ সভাপতিত্ব, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারের পদক্ষেপকে ভারতের বিশ্বমঞ্চে প্রভাব বৃদ্ধির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বিজেপি।
এই কর্মসূচিগুলি দলের মূল সমর্থকদের কাছে আদর্শগত ধারাবাহিকতার প্রতীক। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলি এর বিভিন্ন দিক নিয়ে সাংবিধানিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছে। ফলে এই পদক্ষেপগুলির তাৎপর্য বুঝতে হলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও তার বাস্তব প্রভাব—দুই দিকই বিচার করা প্রয়োজন।
বিজেপির সামনে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ কী?
উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো অঞ্চলে সংগঠন বিস্তার, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি) এবং দলিত ভোটারদের মধ্যে সমর্থন বৃদ্ধির চেষ্টা বিজেপিকে জাতীয় স্তরে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক ভিত্তি গড়তে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বিরোধী দলগুলিও বৃহত্তর জোট গঠনের পথে হেঁটেছে। ‘ইন্ডিয়া’ (I.N.D.I.A.) জোট তার অন্যতম উদাহরণ।
তবে রাজনৈতিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি শাসনগত সাফল্যে পরিণত করার জন্য কর্মসংস্থান, কৃষকের আয়, মূল্যবৃদ্ধি, বৈষম্য, ক্ষুদ্র ব্যবসার সমস্যা এবং সরকারি পরিষেবার গুণমানের মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কল্যাণমূলক প্রকল্পের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি তার কার্যকারিতা ও আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯০১ সালের ৬ জুলাই। ২০২৬ সালে তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী এবং জনসংঘের প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপট এই রাজনৈতিক যাত্রাকে নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, জনসংঘ থেকে বিজেপির যাত্রা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের উত্থানের ইতিহাস নয়। এটি জাতীয়তাবাদী আদর্শ, অর্থনৈতিক চিন্তা, সাংগঠনিক কৌশল এবং কল্যাণমূলক শাসনের পরিবর্তিত রূপেরও ইতিহাস। ১৯৫১ সালে যে ‘নেশন ফার্স্ট’ ভাবনাকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজকের বিজেপির কাছে তার পরবর্তী পরীক্ষা হল—জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যকে কর্মসংস্থান, সমৃদ্ধি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং নাগরিক পরিষেবার বাস্তব ফলাফলে কতটা রূপান্তরিত করা যায়।









