মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে লালকৃষ্ণ আডবাণীর অবদান ও ভূমিকা অনস্বীকার্য। গণতন্ত্র রক্ষা, সংবিধানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, জনসংঘের ভিত মজবুত করা থেকে শুরু করে বিজেপির উত্থান এবং (LK Advani) রামমন্দির আন্দোলন—দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর নাম। রবিবার, ৮ নভেম্বর, জীবনের শততম বর্ষে পদার্পণ করলেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। ঘটনাচক্রে, এ বছর তাঁর জন্মদিন পড়েছে দীপাবলির সময়েই (PM Modi)। ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শতবর্ষ উদ্যাপনের আবহে আডবাণীর জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তের তাৎপর্য আরও বেড়েছে।
১৯২৭ সালের ৮ নভেম্বর দেব দীপাবলির দিন অধুনা পাকিস্তানের করাচিতে জন্ম আডবাণীর। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় কিশোর বয়সেই সিন্ধের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসতে হয়েছিল তাঁকে। নতুন করে জীবন শুরু করার সেই কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শূন্য থেকে সংগঠন গড়ে তোলার যে মানসিকতা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনেও তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। জনসংঘকে শক্তিশালী করা থেকে শুরু করে বিজেপিকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান (LK Advani)
আডবাণীর নেতৃত্বে বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর দলীয় সভাপতিত্বের সময়ে ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ৪০০-র গণ্ডি থেকে নেমে ২০০-র নীচে চলে আসে। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের জন্য লোকসভায় একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিজেপি। একাধিক প্রজন্মের দলীয় কর্মীকে তৈরি করার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক দর্শনের উপর দলের ভিত গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
নেতা হিসেবে আডবাণীর দু’টি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, তাঁর আদর্শগত স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক বিশ্লেষণক্ষমতা। বক্তৃতা, লেখালেখি এবং সংসদীয় বক্তব্যে বারবার তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। জনসংঘ ও বিজেপির হয়ে তাঁর তৈরি করা একাধিক রাজনৈতিক প্রস্তাব আজও প্রাসঙ্গিক। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় রাজনীতির একটি বড় অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছদ্মধর্মনিরপেক্ষতার প্রবণতাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা।
আরএসএসের প্রচারক আডবাণী
আরএসএসের প্রচারক হিসেবে রাজস্থানের বিভিন্ন এলাকায় কাজের মধ্যে দিয়ে আডবাণীর সাংগঠনিক জীবনের সূচনা। পরে তিনি দিল্লিতে আসেন এবং অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। কয়েক দশক ধরে দুই শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার যে সম্পর্ক বজায় ছিল, ভারতীয় রাজনীতিতে তা বিরল দৃষ্টান্ত। প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁরা একসঙ্গে দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন (LK Advani) এনেছিলেন।
দেশভাগের ক্ষত তখনও দিল্লির সমাজজীবনে গভীরভাবে রয়ে গিয়েছিল। সেই সময় জনসংঘের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন আডবাণী। ১৯৬৭ সালে তিনি দিল্লি মহানগর পরিষদের চেয়ারম্যান হন। সেই দায়িত্বে প্রয়াত বিজয়কুমার মালহোত্রার সঙ্গে কাজ করেছিলেন তিনি।
১৯৭০ সালে রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার মধ্যে দিয়ে তাঁর সংসদীয় জীবনের সূচনা। সংসদে তাঁর বক্তব্য ও ভূমিকা দলমত নির্বিশেষে প্রশংসা পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে লোকসভা ও রাজ্যসভা—উভয় কক্ষেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শাসকপক্ষের আসনে থেকেও নিজের সংসদীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সংসদের কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন তিনি।
স্মরণীয় অধ্যায়
১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচন আডবাণীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। সেই নির্বাচনে গান্ধীনগর-সহ দু’টি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। গুজরাটের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। দেশভাগের পর তাঁর বাবা কচ্ছ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই গুজরাট থেকেই রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আডবাণী। ফলে গান্ধীনগর থেকে নির্বাচনে লড়া ছিল অনেকটা নিজের ঘরে ফিরে আসার মতোই।
সেই সময় বিজেপির সাংগঠনিক কাজে যুক্ত থাকার সুবাদে তাঁর নির্বাচনী মনোনয়নপত্র তৈরি এবং প্রচারের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করার সুযোগ পেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। গান্ধীনগরের মানুষ বারবার তাঁকে সংসদে পাঠিয়েছেন। ওই কেন্দ্রের ভোটার হিসেবে একাধিকবার আডবাণীকে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেছেন মোদি। নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতি আডবাণীর যত্ন ও দায়িত্ববোধকে রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে শিক্ষণীয় বলে মনে করেন তিনি।
আ টেল অব টু ইমার্জেন্সিস’
আডবাণীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা। গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। জরুরি অবস্থার সময়কার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর লেখা বই ‘আ প্রিজনার্স স্ক্র্যাপ-বুক’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওই বইয়ের ‘আ টেল অব টু ইমার্জেন্সিস’ শীর্ষক অংশে ১৯৭৫ সালের জুন মাস থেকে ভারতে শুরু হওয়া জরুরি অবস্থার সঙ্গে ১৯৩৩ সালে নাৎসি জার্মানিতে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাবলির তুলনা তুলে ধরেছিলেন (PM Modi) তিনি।
আডবাণী যেমন ছিলেন তেজস্বী বিরোধী নেতা, তেমনই প্রশাসক হিসেবেও তাঁর দক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৭ সালে জনতা সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের দায়িত্ব পান। ওই মন্ত্রকে তাঁর কাজ প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়। পরবর্তী সময়ে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কাজের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার উন্নতিতেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের ফলেই দেশে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়নের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।
তবে আডবাণীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম ১৯৯০ সালের সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত রথযাত্রা। এই যাত্রা ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজজীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। রথযাত্রার পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন—প্রতিটি পর্যায়ে যুক্ত থাকার সুযোগকে বিশেষ সৌভাগ্যের বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। সোমনাথে যাত্রার সূচনাপর্বে উপস্থিত থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে বিশেষ স্মরণীয়।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, প্রতিদিনের ব্যস্ত কর্মসূচি, শারীরিক ধকল এবং ক্লান্তির মধ্যেও লক্ষ্য স্থির রাখার জন্য অসাধারণ সহনশীলতার প্রয়োজন হয়। রথযাত্রার সময় আডবাণী সেই ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন।
বিহারে আডবাণীর গ্রেফতারি
বিহারে আডবাণীর গ্রেফতারির ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ওই ঘটনার পর গুজরাটে চিমনভাই পটেল সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় বিজেপি। এর মাধ্যমে দলের আদর্শ এবং রামমন্দিরের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের বার্তা দেওয়া হয়েছিল। দলের প্রবীণ নেতা থেকে সাধারণ কর্মী—অনেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতি এলেও অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের শপথ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর দেশবাসীর আশীর্বাদে অযোধ্যায় ভগবান শ্রীরামের মন্দির নির্মাণ বাস্তবায়িত হয়েছে।
রাজনৈতিক জীবনের বাইরেও আডবাণীর ব্যক্তিত্বের নানা দিক রয়েছে। তাঁর সরল জীবনযাপন, অধ্যয়ন এবং ইতিহাসের প্রতি গভীর আগ্রহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নবনির্মাণ আন্দোলনের পর তিনি জুনাগড়ে গিয়ে প্রায় এক মাস সাধারণ দলীয় কর্মীর মতো থেকেছিলেন। সেই সময় বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতিতে সংগঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয়েছিল।
জনজীবনে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে আডবাণী বরাবরই নিজের অবস্থানে অনড় থেকেছেন। তিনি নিয়মিত সংবাদপত্র পড়েন এবং বিভিন্ন বিষয় গভীরভাবে খুঁটিয়ে দেখেন। চলচ্চিত্র ও নাটকের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে (LK Advani)। চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে ‘মাই কান্ট্রি মাই লাইফ’ বইয়ে।
সিন্ধু দর্শন পূজার প্রচার
সিন্ধি সংস্কৃতির সঙ্গেও বরাবর যোগাযোগ বজায় রেখেছেন আডবাণী। লেহর কাছে সিন্ধু দর্শন পূজার প্রচার ও প্রসারেও উদ্যোগী হয়েছিলেন তিনি। এই অনুষ্ঠানে আডবাণীর সঙ্গে জর্জ ফার্নান্ডেজের উপস্থিতির স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
আডবাণীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের আলোচনা করতে গেলে তাঁর স্ত্রী কমলা আডবাণীর অবদানের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। প্রকাশ্য জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি ছিলেন আডবাণীর নিরন্তর শক্তি ও ভরসার জায়গা।
করাচিতে বেড়ে ওঠা কিশোর লালকৃষ্ণ আডবাণী জীবনের পরবর্তী সময়ে কোন পথে এগোবেন, তা হয়তো তখন কল্পনাও করতে পারেননি। দেশভাগের যন্ত্রণা থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছনো—তাঁর জীবনযাত্রা একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। দেশের প্রতি তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে তাঁকে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করা হয়।
জীবনের শততম বর্ষে পদার্পণের এই বিশেষ দিনে আডবাণীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী (PM Modi)। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং আদর্শ আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি (LK Advani)।









