Tag: Mahendranath Gupta

  • Ramakrishna 561: “বাগানে আম খেতে এসেছ, কত হাজার ডাল, কত লক্ষ পাতা, এ-সব খপরে কাজ কি? জন্ম-জন্মান্তরের খপর!”

    Ramakrishna 561: “বাগানে আম খেতে এসেছ, কত হাজার ডাল, কত লক্ষ পাতা, এ-সব খপরে কাজ কি? জন্ম-জন্মান্তরের খপর!”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    দশম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১লা সেপ্টেম্বর

    জন্মাষ্টমীদিবসে নরেন্দ্র, রাম, গিরিশ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে

    বলরাম—তিনি বলেছেন যে, নরেন্দ্রের যেমন বুকে পা দিলে (ভাবাবেশ) হয়েছিলো, কই আমার তো তা হয় নাই।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—কি জানো, কামিনী-কাঞ্চনে মন থাকলে ছড়ান মন কুড়ান দায়। ওর সালিসী করতে হয়, বলছে (Kathamrita)। আবার বাড়ির ছেলেদের বিষয় ভাবতে হয়। নরেন্দ্রাদির মন তো ছড়ানো নয়—ওদের ভিতে এখনো কামিনী-কাঞ্চন ঢোকে নাই।

    “কিন্তু (শ্যামাপদ) খুব লোক!”

    কাটোয়ার বৈষ্ণব ঠাকুরকে প্রশ্ন করিতেছেন। বৈষ্ণবটি একটু ট্যারা।

    জন্মান্তরের খপর—ভক্তিলাভের জন্যই মানুষজন্ম

    বৈষ্ণব—মশায়, আবার জন্ম কি হয়?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— গীতায় আছে, মৃত্যুসময় যে যা চিন্তা করে দেহত্যাগ করবে তার সেই ভাব লয়ে জন্মগ্রহণ করতে হয়। হরিণকে চিন্তা করে ভরত রাজার হরিণ-জন্ম হয়েছিল।

    বৈষ্ণব—এটি যে হয়, কেউ চোখে দেখে বলে তো বিশ্বাস হয়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—তা জানি না বাপু। আমি নিজের ব্যামো সারাতে পারছি না—আবার মলে কি হয়!

    “তুমি যা বলছো এ-সব হীনবুদ্ধির কথা। ঈশ্বরে কিসে ভক্তি হয়, এই চেষ্টা করো। ভক্তিলাভের জন্যই মানুষ হয়ে জন্মেছ। বাগানে আম খেতে এসেছ, কত হাজার ডাল, কত লক্ষ পাতা, এ-সব খপরে কাজ কি? জন্ম-জন্মান্তরের খপর!”

    গিরিশ ঘোষ ও অবতারবাদ! কে পবিত্র? যার বিশ্বাস-ভক্তি 

    শ্রীযুক্ত গিরিশ ঘোষ দুই-একটি বন্ধু সঙ্গে গাড়ি করিয়া আসিয়া উপস্থিত। কিছু পান করিয়াছেন। কাঁদিতে কাঁদিতে আসিতেছেন ও ঠাকুরের চরণে মাথা দিয়া কাঁদিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ সস্নেহে তাঁহার গা চাপড়াইতে লাগিলেন। একজন ভক্তকে ডাকিয়া বলিতেছেন — “ওরে একে তামাক খাওয়া।”

    গিরিশ মাথা তুলিয়া হাতজোড় করিয়া বলিতেছেন (Kathamrita), তুমিই পূর্ণব্রহ্ম। তা যদি না হয়, সবই মিথ্যা!

    “বড় খেদ রইল, তোমার সেবা করতে পেলুম না! (এই কথাগুলি এরূপ স্বরে বলিতেছেন যে, দু-একটি ভক্ত কাঁদিতেছেন!)

    “দাও বর ভগবন্‌, এক বৎসর তোমার সেবা করব? মুক্তি ছড়াছড়ি, প্রস্রাব করে দি। বল, তোমার সেবা এক বৎসর করব?”

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এখানকার লোক ভাল নয়—কেউ কিছু বলবে।

    গিরিশ—তা হবে না, বলো —

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— আচ্ছা, তোমার বাড়িতে যখন যাব —

    গিরিশ—না, তা নয়। এইখানে করব।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (জিদ দেখিয়া)—আচ্ছা, সে ঈশ্বরের ইচ্ছা।

    ঠাকুরের গলায় অসুখ। গিরিশ আবার কথা কহিতেছেন, “বল, আরাম হয়ে যাক!—আচ্ছা, আমি ঝাড়িয়ে দেব। কালী! কালী!”

  • Ramakrishna 560: “ঠাকুর নববস্ত্র পরিধান করিয়াছেন—বৃন্দাবনী কাপড় ও গায়ে লাল চেলী”

    Ramakrishna 560: “ঠাকুর নববস্ত্র পরিধান করিয়াছেন—বৃন্দাবনী কাপড় ও গায়ে লাল চেলী”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    দশম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১লা সেপ্টেম্বর

    জন্মাষ্টমীদিবসে নরেন্দ্র, রাম, গিরিশ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে

    বলরাম, মাস্টার, গোপালের মা, রাখাল, লাটু, ছোট নরেন, পাঞ্জাবী সাধু, নবগোপাল, কাটোয়ার বৈষ্ণব, রাখাল ডাক্তার

    আজ জন্মাষ্টমী, মঙ্গলবার। ১৭ই ভাদ্র; ১লা সেপ্টেম্বর, ১৮৮৫। ঠাকুর স্নান করিবেন। একটি ভক্ত তেল মাখাইয়া দিতেছেন। ঠাকুর দক্ষিণের বারান্দায় বসিয়া তেল মাখিতেছেন। মাস্টার গঙ্গাস্নান করিয়া আসিয়া ঠাকুরকে (Ramakrishna) প্রণাম করিলেন।

    স্নানান্তে ঠাকুর গামছা পরিয়া দক্ষিণাস্য হইয়া সেই বারান্দা হইতেই ঠাকুরদের উদ্দেশ করিয়া প্রণাম করিতেছেন। শরীর অসুস্থ বলিয়া কালীঘরে বা বিষ্ণুঘরে যাইতে পারিলেন না।

    আজ জন্মাষ্টমী—রামাদি ভক্তেরা ঠাকুরের জন্য নববস্ত্র আনিয়াছেন। ঠাকুর নববস্ত্র পরিধান করিয়াছেন—বৃন্দাবনী কাপড় ও গায়ে লাল চেলী। তাঁহার শুদ্ধ অপাপবিদ্ধ দেহ নববস্ত্রে শোভা পাইতে লাগিল। বস্ত্র পরিধান করিয়াই তিনি ঠাকুরদের প্রণাম করিলেন (Kathamrita)।

    আজ জন্মাষ্টমী। গোপালের মা গোপালের জন্য কিছু খাবার করিয়া কামারহাটি হইতে আনিয়াছেন। তিনি আসিয়া ঠাকুরকে দুঃখ করিতে করিতে বলিতেছেন, “তুমি তো খাবে না।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—এই দেখো, অসুখ হয়েছে।

    গোপালের মা—আমার অদৃষ্ট!—একটু হাতে করো!

    শ্রীরামকৃষ্ণ—তুমি আশীর্বাদ করো।

    গোপালের মা ঠাকুরকেই গোপাল বলিয়া সেবা করিতেন।

    ভক্তেরা মিছরি আনিয়াছেন। গোপালের মা বলিতেছেন (Kathamrita), “এ মিছরি নবতে নিয়ে যাই।” শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেছেন, “এখানে ভক্তদের দিতে হয়। কে একশ বার চাইবে, এখানেই থাক।”

    বেলা এগারটা। কলিকাতা হইতে ভক্তেরা ক্রমে ক্রমে আসিতেছেন। শ্রীযুক্ত বলরাম, নরেন্দ্র, ছোট নরেন, নবগোপাল, কাটোয়া হইতে একটি বৈষ্ণব, ক্রমে ক্রমে আসিয়া জুটিলেন। রাখাল, লাটু আজকাল থাকেন। একটি পাঞ্জাবী সাধু পঞ্চবটীতে কয়দিন রহিয়াছেন।

    ছোট নরেনের কপালে একটি আব আছে। ঠাকুর পঞ্চবটীতে বেড়াইতে বেড়াইতে বলিতেছেন, ‘তুই আবটা কাট না, ও তো গলায় নয়—মাথায়। ওতে আর কি হবে—লোকে একশিরা-কাটাচ্ছে।” (হাস্য)

    পাঞ্জাবী সাধুটি উদ্যানের পথ দিয়া যাইতেছেন। ঠাকুর (Ramakrishna) বলিতেছেন, “আমি ওকে টানি না। জ্ঞানীর ভাব। দেখি যেন শুকনো কাঠ!”

    ঘরে ঠাকুর ফিরিয়াছেন। শ্যামাপদ ভট্টাচার্যের কথা হইতেছে।

  • Ramakrishna 559: “দয়া করে তাঁকে দেখবেন চলুন, এখানকার কথা কিছু শুনে নাই?”

    Ramakrishna 559: “দয়া করে তাঁকে দেখবেন চলুন, এখানকার কথা কিছু শুনে নাই?”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    নবম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৩১শে অগস্ট
    দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে জন্মাষ্টমীদিবসে ভক্তসঙ্গে
    সুবোধের আগমন—পূর্ণ মাস্টার, গঙ্গাধর, ক্ষীরোদ, নিতাই

    পত্রখানি হাতে করে মুড়ে টিপে বলিতেছেন, “অন্যের চিঠি ছুঁতে পারি না; এর বেশ ভাল চিঠি।”

    সেই রাত্রে একটু শুইয়াছেন। হঠাৎ গায়ে ঘাম শয্যা হইতে উঠিয়া বলিতেছেন (Kathamrita), “আমার বোধ হচ্ছে, এ-অসুখ সারবে না।”

    এই কথা শুনিয়া ভক্তেরা সকলেই চিন্তিত হইয়াছেন।

    শ্রীশ্রীমা (Ramakrishna) ঠাকুরের সেবা করিবার জন্য আসিয়াছেন ও অতি নিভৃতে নবতে বাস করেন। নবতে তিনি যে আছেন, ভক্তেরা প্রায় কেহ জানিতেন না। একটি ভক্ত স্ত্রীলোক (গোলাপ মা)-ও কয়দিন নবতে আছেন। তিনি ঠাকুরের ঘরে প্রায় আসেন ও দর্শন করেন।

    আজ সোমবার। ঠাকুর অসুস্থ রহিয়াছেন। রাত প্রায় আটটা হইয়াছে। ঠাকুর ছোট খাটটিতে পেছন ফিরিয়া দক্ষিণদিকে শিয়র করিয়া শুইয়া আছেন। গঙ্গাধর সন্ধ্যার পর কলিকাতা হইতে মাস্টারের সহিত আসিয়াছেন। তিনি তাঁহার চরণপ্রান্তে বসিয়া আছেন। ঠাকুর মাস্টারের সহিত কথা কহিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—দুটি ছেলে এসেছিল। শঙ্কর ঘোষের নাতির ছেলে (সুবোধ) আর একটি তাদের পাড়ার ছেলে (ক্ষীরোদ)। বেশ ছেলে দুটি। তাদের বললাম, আমার এখন অসুখ, তোমার কাছে গিয়ে উপদেশ নিতে। তুমি একটু যত্ন করো।

    মাস্টার—আজ্ঞা, হাঁ, আমাদের পাড়ায় তাদের বাড়ি।

    অসুখের সূত্রপাত—ভগবান ডাক্তার—নিতাই ডাক্তার 

    শ্রীরামকৃষ্ণ—সেদিন আবার গায়ে দিয়ে ঘুম ভেঙে গিছল। এ অসুখটা কি হল!

    মাস্টার—আজ্ঞা, আমরা একবার ভগবান রুদ্রকে দেখাব, ঠিক করেছি। এম. ডি. পাশ করা। খুব ভাল ডাক্তার।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—কত নেবে? মাস্টার—অন্য জায়গা হলে কুড়ি-পঁচিশ টাকা নিত।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— তবে থাক।

    মাস্টার—আজ্ঞা, আমরা হদ্দ চার-পাঁচ টাকা দেব।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আচ্ছা, এইরকম করে যদি একবার বলো, ‘দয়া করে তাঁকে দেখবেন চলুন।’ এখানকার কথা কিছু শুনে নাই?

    মাস্টার — বোধ হয় শুনেছে। একরকম কিছু নেবে না বলেছে তবে আমরা দেব; কেন না, তাহলে আবার আসবে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—নিতাইকে (ডাক্তার) আনো তো সে বরং ভাল। আর ডাক্তাররা এসেই বা কি করছে? কেবল টিপে বাড়িয়ে দেয়।

    রাত নয়টা — ঠাকুর একটু সুজির পায়স খাইতে বসিলেন।

    খাইতে কোন কষ্ট হইল না। তাই আনন্দ করিতে করিতে মাস্টারকে বলিতেছেন, “একটু খেতে পারলাম, মনটায় বেশ আনন্দ হল।”

  • Ramakrishna 558: “আমার গায়ে রোমাঞ্চ হচ্ছে! ওই আনন্দের অবস্থা ওর পরে থেকে যাবে; দেখি চিঠিখানা”

    Ramakrishna 558: “আমার গায়ে রোমাঞ্চ হচ্ছে! ওই আনন্দের অবস্থা ওর পরে থেকে যাবে; দেখি চিঠিখানা”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    নবম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৩১শে অগস্ট
    দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে জন্মাষ্টমীদিবসে ভক্তসঙ্গে
    সুবোধের আগমন — পূর্ণ মাস্টার, গঙ্গাধর, ক্ষীরোদ, নিতাই

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) সেই পূর্বপরিচিত ঘরে বিশ্রাম করিতেছেন। রাত আটটা। সোমবার ১৬ই ভাদ্র, শ্রাবণ-কৃষ্ণা-ষষ্ঠী, ৩১শে অগস্ট ১৮৮৫।

    ঠাকুর অসুস্থ—গলায় অসুখের সূত্রপাত হইয়াছে। কিন্তু নিশিদিন এক চিন্তা, কিসে ভক্তদের মঙ্গল হয়। এক-একবার বালকের ন্যায় অসুখের জন্য কাতর। পরক্ষণেই সব ভুলিয়া গিয়া ঈশ্বরের প্রেমে মাতোয়ারা। আর ভক্তদের প্রতি স্নেহ ও বাৎসল্যে উন্মত্তপ্রায় (Kathamrita)।

    দুইদিন হইল—গত শনিবার রাত্রে—শ্রীযুক্ত পূর্ণ পত্র লিখিয়াছেন—‘আমার খুব আনন্দ হয়। মাঝে মাঝে রাত্রে আনন্দে ঘুম হয় না!’

    ঠাকুর (Ramakrishna) পত্রপাঠ শুনিয়া বলিয়াছিলেন, “আমার গায়ে রোমাঞ্চ হচ্ছে! ওই আনন্দের অবস্থা ওর পরে থেকে যাবে; দেখি চিঠিখানা।”

    পত্রখানি হাতে করে মুড়ে টিপে বলিতেছেন, “অন্যের চিঠি ছুঁতে পারি না; এর বেশ ভাল চিঠি।”

    সেই রাত্রে একটু শুইয়াছেন। হঠাৎ গায়ে ঘাম শয্যা হইতে উঠিয়া বলিতেছেন (Kathamrita), “আমার বোধ হচ্ছে, এ-অসুখ সারবে না।”

    এই কথা শুনিয়া ভক্তেরা সকলেই চিন্তিত হইয়াছেন।

    শ্রীশ্রীমা (Ramakrishna) ঠাকুরের সেবা করিবার জন্য আসিয়াছেন ও অতি নিভৃতে নবতে বাস করেন। নবতে তিনি যে আছেন, ভক্তেরা প্রায় কেহ জানিতেন না। একটি ভক্ত স্ত্রীলোক (গোলাপ মা)-ও কয়দিন নবতে আছেন। তিনি ঠাকুরের ঘরে প্রায় আসেন ও দর্শন করেন।

    আজ সোমবার। ঠাকুর অসুস্থ রহিয়াছেন। রাত প্রায় আটটা হইয়াছে। ঠাকুর ছোট খাটটিতে পেছন ফিরিয়া দক্ষিণদিকে শিয়র করিয়া শুইয়া আছেন। গঙ্গাধর সন্ধ্যার পর কলিকাতা হইতে মাস্টারের সহিত আসিয়াছেন। তিনি তাঁহার চরণপ্রান্তে বসিয়া আছেন। ঠাকুর মাস্টারের সহিত কথা কহিতেছেন।

  • Ramakrishna 557: “ব্যাকুল হয়ে ডাকলে তিনি শুনবেনই শুনবেন, ব্যাকুল হয়ে দোরে ঘা মারো দোর খোলা পাবে”

    Ramakrishna 557: “ব্যাকুল হয়ে ডাকলে তিনি শুনবেনই শুনবেন, ব্যাকুল হয়ে দোরে ঘা মারো দোর খোলা পাবে”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    অষ্টম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে অগস্ট

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও যীশুখ্রীষ্ট (Jesus Christ)

    শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) — আর কিছু মেলে?

    মণি—আজ্ঞা, আপনি যেমন বলেন—‘ছোকরাদের ভিতর কামিনী-কাঞ্চন ঢুকে নাই; ওরা উপদেশ ধারণা করতে পারবে,—যেমন নূতন হাঁড়িতে দুধ রাখা যায়। দই পাতা হাঁড়িতে রাখলে নষ্ট হতে পারে’; তিনিও সেইরূপ বলতেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ(Ramakrishna)— কি বলতেন?

    মণি—‘পুরানো বোতলে নূতন মদ রাখলে বোতল ফেটে যেতে পারে।’ আর ‘পুরানো কাপড়ে নূতন তালি দিলে শীঘ্র ছিঁড়ে যায়।’

    “আপনি যেমন বলেন(Kathamrita), ‘মা আর আপনি এক’ তিনিও তেমনি বলতেন, ‘বাবা আর আমি এক’।” (I and my father are one.)

    মণি—আপনি যেমন বলেন, ‘ব্যাকুল হয়ে ডাকলে তিনি শুনবেনই শুনবেন (Kathamrita)।” তিনিও বলতেন, ‘ব্যাকুল হয়ে দোরে ঘা মারো দোর খোলা পাবে!’ (Knock and it shall be opened unto you.)

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আচ্ছা, অবতার যদি হয়, তা পূর্ণ, না অংশ, না কলা? কেউ কেউ বলে পূর্ণ।

    মণি — আজ্ঞা, পূর্ণ, অংশ, কলা, ও-সব ভাল বুঝতে পারি না। তবে যেমন বলেছিলেন ওইটে বেশ বুঝেছি। পাঁচিলের মধ্যে গোল ফাঁক।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— কি বল দেখি?

    মণি—প্রাচীরের ভিতর একটি গোল ফাঁক—সেই ফাঁকের ভিতর দিয়ে প্রাচিরের ওধারের মাঠ খানিকটা দেখা যাচ্ছে। সেইরূপ আপনার ভিতর দিয়ে সেই অনন্ত ঈশ্বর খানিকটা দেখা যায়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—হাঁ, দুই-তিন ক্রোশ একেবারে দেখা যাচ্ছে।

    মণি চাঁদনির ঘাটে গঙ্গাস্নান করিয়া ঠাকুরের কাছে ঘরে উপনীত হইলেন। বেলা আটটা হইয়াছে।

    মণি লাটুর কাছে আটকে চাইছেন—শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের আটকে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) কাছে আসিয়া মণিকে বলিতেছেন, “তুমি ওটা (প্রসাদ খাওয়া) করো—যারা ভক্ত হয়, প্রসাদ না হলে খেতে পারে না।”

    মণি—আজ্ঞা, আমি কাল অবধি বলরামবাবুর বাড়ি থেকে জগন্নাথের আটকে এনেছি — তাই রোজ একটি দুটি খাই।

    মণি ভূমিষ্ঠ হইয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিতেছেন (Kathamrita) ও বিদায় গ্রহণ করিতেছেন। ঠাকুর সস্নেহে বলিতেছেন, তবে তুমি সকাল সকাল এসো—আবার ভাদ্র মাসের রৌদ্র—বড় খারাপ।

  • Ramakrishna 556: “নূতন হাঁড়িতে দুধ রাখা যায়, দই পাতা হাঁড়িতে রাখলে নষ্ট হতে পারে”

    Ramakrishna 556: “নূতন হাঁড়িতে দুধ রাখা যায়, দই পাতা হাঁড়িতে রাখলে নষ্ট হতে পারে”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    অষ্টম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে অগস্ট

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও যীশুখ্রীষ্ট (Jesus Christ)

    মণি—সে আপনি করেন না—ইচ্ছা করে। ও-সব সিদ্ধাই, Miracle তাই আপনি করেন না। ও-সব করলে লোকদের দেহেতেই মন যাবে—শুদ্ধাভক্তির (Ramakrishna) দিকে মন যাবে না। তাই আপনি করেন না।

    “আপনার সঙ্গে যীশুখ্রীষ্টের অনেক মেলে!”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) সহাস্যে-আর কি কি মেলে?

    মণি—আপনি ভক্তদের উপবাস করতে কি অন্য কোন কঠোর করতে বলেন না—খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধেও কোন কঠিন নাই। যীশুখ্রীষ্টের শিষ্যেরা রবিবারে নিয়ম না করে খেয়েছিল, তাই যারা শাস্ত্র মেনে চলত তারা তিরস্কার করেছিল। যীশু বললেন, ‘ওরা খাবে, খুব করবে; যতদিন বরের সঙ্গে আছে, বরযাত্রীরা আনন্দই করবে।’

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Kathamrita) — এর মানে কি?

    মণি—অর্থাৎ যতদিন অবতারের সঙ্গে সঙ্গে আছে, সাঙ্গোপাঙ্গগণ কেবল আনন্দই করবে—কেন নিরানন্দ হবে? তিনি যখন স্বধামে চলে যাবেন, তখন তাদের নিরানন্দের দিন আসবে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) — আর কিছু মেলে?

    মণি — আজ্ঞা, আপনি যেমন বলেন — ‘ছোকরাদের ভিতর কামিনী-কাঞ্চন ঢুকে নাই; ওরা উপদেশ ধারণা করতে পারবে, — যেমন নূতন হাঁড়িতে দুধ রাখা যায়। দই পাতা হাঁড়িতে রাখলে নষ্ট হতে পারে’; তিনিও সেইরূপ বলতেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ(Ramakrishna)— কি বলতেন?

    মণি—‘পুরানো বোতলে নূতন মদ রাখলে বোতল ফেটে যেতে পারে।’ আর ‘পুরানো কাপড়ে নূতন তালি দিলে শীঘ্র ছিঁড়ে যায়।’

    “আপনি যেমন বলেন(Kathamrita), ‘মা আর আপনি এক’ তিনিও তেমনি বলতেন, ‘বাবা আর আমি এক’।” (I and my father are one.)

    মণি—আপনি যেমন বলেন, ‘ব্যাকুল হয়ে ডাকলে তিনি শুনবেনই শুনবেন।” তিনিও বলতেন, ‘ব্যাকুল হয়ে দোরে ঘা মারো দোর খোলা পাবে!’ (Knock and it shall be opened unto you.)

  • Ramakrishna 555: “সীতার শোকে রাম ধনুক তুলতে না পারাতে লক্ষ্মণ আশ্চর্য হয়ে গেল, কিন্তু পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পরে কাঁদে”

    Ramakrishna 555: “সীতার শোকে রাম ধনুক তুলতে না পারাতে লক্ষ্মণ আশ্চর্য হয়ে গেল, কিন্তু পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পরে কাঁদে”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    অষ্টম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে অগস্ট

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও যীশুখ্রীষ্ট (Jesus Christ)

    প্রত্যূষ (২৮শে অগস্ট) হইল। ঠাকুর (Ramakrishna) গাত্রোত্থান করিয়া মার চিন্তা করিতেছেন। অসুস্থ হওয়াতে ভক্তেরা শ্রীমুখ হইতে সেই মধুর নাম শুনিতে পাইলেন না। ঠাকুর প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া নিজের আসনে আসিয়া বসিয়াছেন। মণিকে বলিতেছেন (Kathamrita), আচ্ছা, রোগ কেন হল?

    মণি—আজ্ঞা, মানুষের মতন সব না হলে জীবের সাহস হবে না। তারা দেখেছে যে, এই দেহের এত অসুখ, তবুও আপনি ঈশ্বর বই আর কিছুই জানেন না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে)—বলরামও (Ramakrishna) বললে, ‘আপনারই এই, তাহলে আমাদের আর হবে না কেন?’

    “সীতার শোকে রাম ধনুক তুলতে না পারাতে লক্ষ্মণ আশ্চর্য হয়ে গেল। কিন্তু পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পরে কাঁদে।

    মণি—ভক্তের দুঃখ দেখে যীশুখ্রীষ্টও অন্য লোকের মতো কেঁদেছিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — কি হয়েছিল?

    মণি — মার্থা, মেরী দুই ভগ্নী, আর ল্যাজেরাস ভাই — তিনজনই যীশুখ্রীষ্টের ভক্ত। ল্যাজেরাসের মৃত্যু হয়। যীশু তাদের বাড়িতে আসছিলেন। পথে একজন ভগ্নী (মেরী), দৌড়ে গিয়ে পদতলে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললে, ‘প্রভু, তুমি যদি আসতে, তাহলে সে মরতো না।’ যীশু তার কান্না দেখে কেঁদেছিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ ও সিদ্ধাই — Miracles

    “তারপর তিনি গোরের কাছে গিয়ে নাম ধরে ডাকতে লাগলেন (Kathamrita), অমনি ল্যাজেরাস প্রাণ পেয়ে উঠে এল।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — আমার কিন্তু উগোনো হয় না।

    মণি— সে আপনি করেন না— ইচ্ছা করে। ও-সব সিদ্ধাই, Miracle তাই আপনি করেন না। ও-সব করলে লোকদের দেহেতেই মন যাবে—শুদ্ধাভক্তির দিকে মন যাবে না। তাই আপনি করেন না।

    “আপনার সঙ্গে যীশুখ্রীষ্টের অনেক মেলে!”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Kathamrita) সহাস্যে— আর কি কি মেলে?

  • Ramakrishna 554: “মাস্টার ঠাকুরকে বলিতেছেন, ‘উনি বহুদর্শী লোক, উনি রোজ দেখলে ভাল হয়”

    Ramakrishna 554: “মাস্টার ঠাকুরকে বলিতেছেন, ‘উনি বহুদর্শী লোক, উনি রোজ দেখলে ভাল হয়”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৭শে অগস্ট
    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে রাখাল, মাস্টার, পণ্ডিত শ্যামাপদ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
    সমাধিমন্দিরে—পণ্ডিত শ্যামাপদের প্রতি কৃপা

    “শুধু শাস্ত্র পড়লে কি হবে? পণ্ডিতেরা কেবল বিচার করে।”

    পণ্ডিত — আমায় কেউ পণ্ডিত বললে ঘৃণা করে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— ওইটি তাঁর কৃপা! পণ্ডিতেরা কেবল বিচার করে। কিন্তু কেউ দুধ শুনেছে, কেউ দুধ দেখেছে। সাক্ষাৎকারের পর সব নারায়ণ দেখবে — নারায়ণই সব হয়েছেন।

    পণ্ডিত নারায়ণের স্তব শুনাইতেছেন। ঠাকুর আনন্দে বিভোর।

    পণ্ডিত—সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি।
    ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ ॥

    শ্রীরামকৃষ্ণ—আপনার অধ্যাত্ম (রামায়ণ) দেখা আছে?

    পণ্ডিত—আজ্ঞে হাঁ, একটু দেখা আছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— ওতে জ্ঞান-ভক্তি পরিপূর্ণ। শবরীর উপাখ্যান, অহল্যার স্তব, সব ভক্তিতে পরিপূর্ণ।

    “তবে একটি কথা আছে। তিনি বিষয়বুদ্ধি থেকে অনেক দূর।”

    পণ্ডিত—যেখানে বিষয়বুদ্ধি, তিনি ‘সুদূরম্‌’,—আর যেখানে তা নাই, সেখানে তিনি ‘অদূরম্‌’। উত্তরপাড়ার এক জমিদার মুখুজ্জেকে দেখে এলাম বয়স হয়েছে—কেবল নভেলের গল্প শুনছেন!

    শ্রীরামকৃষ্ণ—অধ্যাত্মে আর একটি বলেছে যে, তিনিই জীবজগৎ!

    পণ্ডিত আনন্দিত হইয়া যমলার্জ্জুনের এই ভাবের স্তব শ্রীমদ্‌ভাগবত দশম স্কন্ধ হইতে আবৃত্তি করিতেছেন —

    কৃষ্ণ কৃষ্ণ মহাযোগিংস্ত্বমাদ্যঃ পুরুষঃ পরঃ।
    ব্যক্তাব্যক্তমিদং বিশ্বং রূপং তে ব্রাহ্মণা বিদুঃ  ॥
    ত্বমেকঃ সর্বভূতানাং দেহস্বাত্মেনিদ্রয়েশ্বরঃ।
    ত্বমেব কালো ভগবান্‌ বিষ্ণুরব্যয় ঈশ্বরঃ ॥
    ত্বং মহান্‌ প্রকৃতিঃ সূক্ষ্মা রজঃসত্ত্বতমোময়ী।
    ত্বমেব পুরুষোঽধ্যক্ষঃ সর্বক্ষেত্রবিকারবিৎ  ॥

    শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধিস্থ — ‘আন্তরিক ধ্যান-জপ করলে আসতেই হবে’ 

    ঠাকুর স্তব শুনিয়া সমাধিস্থ! দাঁড়াইয়াছেন। পণ্ডিত বসিয়া। পণ্ডিতের কোলে ও বক্ষে একটি চরণ রাখিয়া ঠাকুর (Kathamrita) হাসিতেছেন।

    পণ্ডিত চরণ ধারণ করিয়া বলিতেছেন, ‘গুরো চৈতন্যং দেহি।’ ঠাকুর ছোট তক্তার কাছে পূর্বাস্য হইয়া দাঁড়াইয়াছেন।

    পণ্ডিত ঘর হইতে চলিয়া গেলে ঠাকুর মাস্টারকে বলিতেছেন, আমি যা বলি মিলছে? যারা আন্তরিক ধ্যান-জপ করেছে তাদের এখানে আসতেই হবে।

    রাত দশটা হইল। ঠাকুর একটু সামান্য সুজির পায়স খাইয়া শয়ন করিয়াছেন।

    মণিকে বলিতেছেন, “পায়ে হাতটা বুলিয়ে দাও তো।”

    কিয়ৎক্ষণ পরে গায়ে ও বক্ষঃস্থলে হাত বুলাইয়া দিতে বলিতেছেন।

    সামান্য নিদ্রার পর মণিকে বলিতেছেন, “তুমি শোওগে; — দেখি একলা থাকলে যদি ঘুম হয়।” ঠাকুর রামলালকে বলিতেছেন (Kathamrita), “ঘরের ভিতরে ইনি (মণি) আর রাখাল শুলে হয়।”

  • Ramakrishna 553: “মাস্টার ঠাকুরকে বলিতেছেন, ‘উনি বহুদর্শী লোক, উনি রোজ দেখলে ভাল হয়”

    Ramakrishna 553: “মাস্টার ঠাকুরকে বলিতেছেন, ‘উনি বহুদর্শী লোক, উনি রোজ দেখলে ভাল হয়”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৭শে অগস্ট
    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে রাখাল, মাস্টার, পণ্ডিত শ্যামাপদ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
    সমাধিমন্দিরে—পণ্ডিত শ্যামাপদের প্রতি কৃপা

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) দু-একটি ভক্তসঙ্গে ঘরে বসিয়া আছেন। অপরাহ্ন, পাঁচটা; বৃসস্পতিবার, ২৭শে অগস্ট ১৮৮৫; ১২ই ভাদ্র, শ্রাবণ কৃষ্ণা দ্বিতীয়া।

    ঠাকুরের অসুখের সূত্রপাত হইয়াছে। তথাপি ভক্তেরা কেহ আসিলে শরীরকে শরীর জ্ঞান করেন না। হয়তো সমস্ত দিন তাঁহাদের লইয়া কথা কহিতেছেন—কখনও বা গান করিতেছেন।

    শ্রীযুক্ত মধু ডাক্তার প্রায় নৌকা করিয়া আসেন—ঠাকুরের চিকিৎসার জন্য ভক্তেরা বড়ই চিন্তিত হইয়াছেন। মধু ডাক্তার যাহাতে প্রত্যহ আসিয়া দেখেন (Kathamrita), এই তাঁহাদের ইচ্ছা। মাস্টার ঠাকুরকে বলিতেছেন, ‘উনি বহুদর্শী লোক, উনি রোজ দেখলে ভাল হয়।’

    পণ্ডিত শ্যামাপদ ভট্টাচার্য আসিয়া ঠাকুরকে দর্শন করিলেন। ইঁহার নিবাস আঁটপুর গ্রামে। সন্ধ্যা আগতপ্রায় দেখিয়া পণ্ডিত ‘সন্ধ্যা করিতে যাই’, বলিয়া গঙ্গাতীরে চাঁদনীর ঘাটে গমন করিলেন।

    সন্ধ্যা করিতে করিতে পণ্ডিত কি আশ্চর্য দর্শন করিলেন। সন্ধ্যা সমাপ্ত হইলে ঠাকুরের ঘরে আসিয়া মেঝেতে বসিলেন। ঠাকুর মার নাম ও চিন্তার পর নিজের আসনেই বসিয়া আছেন। পাপোশের উপর মাস্টার। রাখাল, লাটু প্রভৃতি ঘরে যাতায়াত করিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) মাস্টারের প্রতি, পণ্ডিতকে দেখাইয়া— ইনি একজন বেশ লোক। (পণ্ডিতের প্রতি) ‘নেতি’ ‘নেতি’ করে যেখানে মনের শান্তি হয়, সেইখানেই তিনি।

    ঈশ্বরদর্শনের লক্ষণ ও পণ্ডিত শ্যামাপদ—‘সমাধিমন্দিরে’

    “সাত দেউড়ির পর রাজা আছেন (Kathamrita)। প্রথম দেউড়িতে গিয়ে দেখে যে একজন ঐশ্বর্যবান পুরুষ অনেক লোকজন নিয়ে বসে আছেন; খুব জাঁকজমক। রাজাকে যে দেখতে গিয়েছে, সে সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করলে, ‘এই কি রাজা?’ সঙ্গী ঈষৎ হেসে বললে, ‘না’।

    “দ্বিতীয় দেউড়ি আর অন্যান্য দেউড়িতেও ওইরূপ বললে। দেখে, যত এগিয়ে যায়, ততই ঐশ্বর্য! আর জাঁকজমক! সাত দেউড়ি পার হয়ে যখন দেখলে তখন আর সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করলে না! রাজার অতুল ঐশ্বর্য দর্শন করে অবাক্‌ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।—বুঝলে এই রাজা। — এ-বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নাই।”

    ঈশ্বর, মায়া, জীবজগৎ—অধ্যাত্ম রামায়ণ—যমলার্জ্জুনের স্তব

    পণ্ডিত—মায়ার রাজ্য ছাড়িয়ে গেলে তাঁকে দেখা যায়।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—তাঁর সাক্ষাৎকারের পর আবার দেখে, এই মায়া-জীবজগৎ তিনিই হয়েছেন। এই সংসার ধোকার টাটি—স্বপ্নবৎ,—এই বোধ হয়, যখন ‘নেতি’, ‘নেতি’ বিচার করে। তাঁর দর্শনের পর আবার ‘এই সংসার মজার কুটি।’

  • Ramakrishna 552: “সাপ এঁকে বেঁকে চললেও সাপ; আবার চুপ করে কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকলেও সাপ”

    Ramakrishna 552: “সাপ এঁকে বেঁকে চললেও সাপ; আবার চুপ করে কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকলেও সাপ”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৬ই অগস্ট

     শ্রীরামকৃষ্ণ, গিরিশ, শশধর পণ্ডিত প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে

    ঠাকুরের অসুখ সংবাদ কলিকাতার ভক্তেরা জানিতে পারিলেন। আলজিভে অসুখ হইয়াছে সকলে বলিতেছেন।

    রবিবার, ১৬ই অগস্ট, ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দ; (১লা ভাদ্র, ১২৯২)। শুক্লা ষষ্ঠী। অনেক ভক্ত তাঁহাকে দর্শন করিতে আসিয়াছেন—গিরিশ, রাম, নিত্যগোপাল, মহিমা চক্রবর্তী, কিশোরী (গুপ্ত), পণ্ডিত শশধর তর্কচুড়ামণি প্রভৃতি।

    ঠাকুর পূর্বের ন্যায় আনন্দময়, ভক্তদের সঙ্গে কথা কহিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—রোগের কথা মাকে বলতে পারি না। বলতে লজ্জা হয়।

    গিরিশ—আমার নারায়ণ ভাল করবেন।

    রাম—ভাল হয়ে যাবে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—(সহাস্যে)—হাঁ, ওই আশীর্বাদ কর। (সকলের হাস্য)

    গিরিশ নূতন নূতন আসিতেছেন, ঠাকুর তাঁহাকে বলিতেছেন, “তোমার অনেক গোলের ভিতর থাকতে হয়, অনেক কাজ; তুমি আর তিনবার এসো।” এইবার শশধরের সঙ্গে কথা কহিতেছেন।

    শশধর পণ্ডিতকে উপোদেশ — ব্রহ্ম ও আদ্যাশক্তি অভেদ 

    শ্রীরামকৃষ্ণ (শশধরের প্রতি) — তুমি আদ্যাশক্তির কথা কিছু বল।

    শশধর (Kathamrita)— আমি কি জানি।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) — একজনকে একটি লোক খুব ভক্তি করে। সেই ভক্তকে তামাক সাজার আগুন আনতে বললে; তা সে বললে, আমি কি আপনার আগুন আনবার যোগ্য? আর আগুন আনলেও না! (সকলের হাস্য)

    শশধর—আজ্ঞা, তিনিই নিমিত্ত কারণ, তিনিই উপাদান কারণ। তিনিই জীব জগৎ সৃষ্টি করেছেন, আবার তিনিই জীবজগৎ হয়ে রয়েছেন; যেমন মাকড়সা, নিজে জাল তৈয়ার করলে (নিমিত্ত কারণ); আর সেই জাল নিজের ভিতর থেকে বার করলে (উপাদান কারণ)।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আর আছে যিনিই পুরুষ তিনিই প্রকৃতি, যিনিই ব্রহ্ম তিনিই শক্তি। যখন নিষ্ক্রিয়, সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করছেন না, তখন তাঁকে ব্রহ্ম বলি, পুরুষ বলি; আর যখন ওই সব কাজ করেন তখন তাঁকে শক্তি বলি, প্রকৃতি বলি। কিন্তু যিনিই ব্রহ্ম তিনিই শক্তি, যিনিই পুরুষ তিনিই প্রকৃতি হয়ে রয়েছেন। জল স্থির থাকলেও জল, আর হেললে দুললেও জল। সাপ এঁকে বেঁকে চললেও সাপ; আবার চুপ করে কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকলেও সাপ।

    শ্রীরামকৃষ্ণ ব্রহ্মজ্ঞানের কথায় সমাধি — ভোগ ও কর্ম 

    “ব্রহ্ম কি তা মুখে বলা যায় না, মুখ বন্ধ হয়ে যায়। নিতাই আমার মাতা হাতি! নিতাই আমার মাতা হাতি! এই কথা বলতে বলতে শেষে আর কিছুই বলতে পারে না; কেবল বলে হাতি! আবার হাতি হাতি বলতে বলতে ‘হা’। শেষে তাও বলতে পারে না! বাহ্যশূন্য।”

    এই কথা বলিতে (Kathamrita) বলিতে ঠাকুর সমাধিস্থ! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সমাধিস্থ।

    সমাধিভঙ্গের পর কিয়ৎকাল পরে বলিতেছেন, ‘ক্ষর’ ‘অক্ষরের’ পারে কি আছে মুখে বলা যায় না। সকলে চুপ করিয়া আছেন, ঠাকুর আবার বলিতেছেন, “যতক্ষণ কিছু ভোগ বাকি থাকে কি কর্ম বাকি থাকে, ততক্ষণ সমাধি হয় না।

    (শশধরের প্রতি)—“এখন ঈশ্বর (Ramakrishna) তোমায় কর্ম করাচ্ছেন, লেকচার দেওয়া ইত্যাদি; এখন তোমায় ওই সব করতে হবে।

    “কর্মটুকু শেষ হয় গেলে আর না। গৃহিণী বাড়ির কাজকর্ম সব সেরে নাইতে গেলে ডাকাডাকি করলেও আর ফেরে না।”

LinkedIn
Share