মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতজুড়ে ঐক্য, আত্মনির্ভরতা ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার বার্তা নিয়ে পালিত হচ্ছে ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস। প্রজাতন্ত্র দিবসে এক্স হ্যান্ডলে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, ‘প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের সম্মিলিতভাবে একটি বিকশিত ভারত গড়ে তোলার সংকল্পে নতুন উদ্যম ও উৎসাহ যোগ করুক।’ প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের দিশা তুলে ধরেন।
শান্তি, আত্মনির্ভরতা ও উন্নয়নের উপর জোর
জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বলেন, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত চললেও ভারত বিশ্বশান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, ‘আত্মনির্ভরতা’ ও ‘স্বদেশি’-র নীতিই দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের পথ সুগম করছে। রাষ্ট্রপতি ২০৪৭ সালের মধ্যে—স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে—ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। ভাষণে তিনি নারী উন্নয়নে অগ্রগতি, বিভিন্ন কল্যাণমূলক সরকারি প্রকল্প এবং সাম্প্রতিক শ্রম সংস্কারের মাধ্যমে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
জ্ঞান ভারতম মিশন
রাষ্ট্রপতি ভারতের জ্ঞান, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের কথা তুলে ধরেন। ভারতীয় দর্শন, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, সাহিত্য ও শিল্প বিশ্বজুড়ে সমাদৃত বলে তিনি উল্লেখ করেন। “জ্ঞান ভারতম মিশন”-এর মতো উদ্যোগ ভারতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। একই সঙ্গে সাংবিধানিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্রের শক্তি এবং নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ঐক্য, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ বজায় রেখেই বহুমুখী উন্নয়নের পথে এগোতে হবে, আর সেই দায়িত্বের বড় অংশ আজ দেশের যুবসমাজের কাঁধেই।
নারী শক্তির বিকাশ
সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু (Droupadi Murmu) দেশের অগ্রগতিতে নারীশক্তি ও যুবসমাজের ভূমিকার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেন। তাঁর ভাষণে উঠে আসে নারী ক্ষমতায়নের সাফল্য, যুবকদের অগ্রণী ভূমিকা এবং ভারতের সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক শক্তির কথা। রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে মহিলাদের সক্রিয় ও স্বাবলম্বী হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যুবসমাজ দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে তোলে। রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে বলেন, দেশের অগ্রগতির পথে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আজ দেশের মা ও বোনেরা সামাজিক অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে আসছেন এবং অর্থনীতি থেকে সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। উন্নত ভারত গঠনে নারীশক্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য বলেই মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর কথায়, নারীদের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি দেশের লিঙ্গসমতা, সামাজিক ন্যায় এবং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।
বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও
নারী উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি জানান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় প্রচেষ্টার সুফল ইতিমধ্যেই মিলছে। “বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও” কর্মসূচি শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার আওতায় খোলা ৫৭ কোটিরও বেশি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের প্রায় ৫৬ শতাংশই মহিলাদের নামে। পাশাপাশি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ১০ কোটিরও বেশি নারী, যা গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি ক্রীড়া, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, মহাকাশ, স্টার্ট-আপ এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মেয়েরা ক্রীড়াক্ষেত্রে একের পর এক সাফল্য এনে দিচ্ছে। গত বছরের নভেম্বরে আইসিসি মহিলা বিশ্বকাপ এবং দৃষ্টিহীনদের মহিলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয় দেশের গর্ব বাড়িয়েছে। দাবা বিশ্বকাপের ফাইনালে দুই ভারতীয় নারীর মুখোমুখি হওয়া ঐতিহাসিক ঘটনা। পাশাপাশি পঞ্চায়েত স্তরে প্রায় ৪৬ শতাংশ মহিলা প্রতিনিধিত্ব রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত খুলেছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রজাতন্ত্র দিবসের বার্তা
প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি লেখেন, “আমার সমস্ত সহনাগরিককে প্রজাতন্ত্র দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা। ভারতের সম্মান, গৌরব ও মর্যাদার প্রতীক এই জাতীয় উৎসব আপনাদের জীবনে নতুন শক্তি ও উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলুক। উন্নত ভারতের সংকল্প আরও দৃঢ় হোক—এই আমার আন্তরিক কামনা।” সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল অনুষ্ঠান ও কুচকাওয়াজ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে শুরু হবে। এর মাধ্যমে কুচকাওয়াজে ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সামরিক শক্তি ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে তুলে ধরা হবে।
প্রজাতন্ত্র দিবসের গুরুত্ব
১৯৫০ সালের এই দিনেই ভারতের সংবিধান কার্যকর হয়েছিল এবং ভারত নিজেকে একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। প্রজাতন্ত্র দিবসের গুরুত্ব কেবল অতীত স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভারতের প্রকৃত শক্তি তার সংবিধান। সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে, একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও নাগরিকের দায়িত্ব নির্ধারণ করে। একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন সংবিধান অনুযায়ী। যা রাজতন্ত্রের ধারণা থেকে দেশকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করেছে। প্রতিবছর ২৬ জানুয়ারি দিল্লির কর্তব্য পথে আয়োজিত হয় বর্ণাঢ্য প্রজাতন্ত্র দিবস প্যারেড। এই প্যারেডে ভারতীয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বায়ুসেনা এবং আধাসামরিক বাহিনীর শক্তি ও শৃঙ্খলা প্রদর্শিত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের ট্যাবলো ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য এবং উন্নয়নের গল্প তুলে ধরে। এই দৃশ্য শুধু দেশবাসীকেই নয়, গোটা বিশ্বকে ভারতের ঐক্য ও সক্ষমতার বার্তা দেয়।

Leave a Reply