মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে (West Bengal CM) এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হতে চলেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির অভাবনীয় সাফল্যের পর, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের অন্যতম কারিগর হিসেবে তাঁর এই উত্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আগামীকাল ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্র জয়ন্তীর দিনে শপথ নেবেন।
সূচনা ও তৃণমূল পর্ব (Suvendu Adhikari)
শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে জাতীয় কংগ্রেসের হাত ধরে। পরবর্তীতে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। কিন্তু এরপর ২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচনের আগে নিজের মন্ত্রীসভার পদ আর দায়িত্ব ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেছিলেন। এরপর নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিরোধী দলনেতার ভূমিকায় কাজ করেন। অবশেষে দুই বার মমতাকে হারিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথ নেবেন বিজেপির এই বিধায়ক (West Bengal CM)।
সাংসদ থেকে মন্ত্রী
আসুন এক নজরে দেখে নিই তাঁর রাজনৈতিক জীবন –
১৯৯৫: রাজনৈতিক সূচনা
পারিবারিক ঐতিহ্যের হাত ধরে রাজনীতিতে অভিষেক। কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় প্রথম পদার্পণ করেন।
১৯৯৯: তৃণমূলের সংগঠক হিসেবে উত্থান
কংগ্রেস ত্যাগ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান। সে বছর লোকসভা নির্বাচনে তমলুক কেন্দ্রে দলের জয়ের নেপথ্য কারিগরের ভূমিকা পালন করেন শুভেন্দু।
২০০১ – ২০০৪: প্রাথমিক চড়াই-উতরাই
২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুগবেড়িয়া এবং ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তমলুক কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বামফ্রন্ট প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হন।
২০০৬: প্রথম বিধানসভা জয়
দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০৭ – ২০০৮: নন্দীগ্রাম আন্দোলন ও সাংগঠনিক ম্যাজিক
২০০৭ সালে নন্দীগ্রামের ভূমি রক্ষা আন্দোলনে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব তাঁকে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। এর সুফল মেলে ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ বামমুক্ত হয়। ওই বছরই তিনি যুব তৃণমূলের সভাপতির দায়িত্ব পান।
২০০৯: লোকসভায় জয় ও দিল্লি যাত্রা
তমলুক লোকসভা কেন্দ্রে বাম দুর্গ ধসিয়ে দিয়ে বিপুল ভোটে সাংসদ নির্বাচিত হন। পাশাপাশি কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যান পদের দায়িত্বও গ্রহণ করেন।
২০১১ – ২০১৪: ক্ষমতার কেন্দ্রে পদার্পণ
রাজ্যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর মেদিনীপুর অঞ্চলে তাঁর রাজনৈতিক আধিপত্য আরও বৃদ্ধি পায়। ২০১৪ সালে পুনরায় তমলুক থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। তবে এই সময়েই দলের মধ্যে সাংগঠনিক রদবদল নিয়ে তাঁর কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হয়।
২০১৬: মন্ত্রী হিসেবে অভিষেক
নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। পরিবহণ এবং সেচ দফতরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বের দায়িত্বভার সফলভাবে সামলান।
২০১৯ – ২০২০: দূরত্ব ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
দলের অভ্যন্তরীণ রদবদল এবং পর্যবেক্ষকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। অবশেষে ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর মেদিনীপুরে অমিত শাহের উপস্থিতিতে তৃণমূল ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (BJP) যোগদান করেন।
২০২১: নন্দীগ্রামের যুদ্ধ ও বিরোধী দলনেতা
বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে এক অভাবনীয় জয় হাসিল করেন। ফলস্বরূপ, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে বর্তায়।
২০২৬: বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হন।
২০২৬-এর ঐতিহাসিক জয়
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু নিজের কেন্দ্র নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েন। জিতেছিলেন ১৯৫৬ ভোটে। নিজের ঘরের মাঠে মমতাকে হারানোর পর এ বার মমতার পাড়ায় এসে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, দু’টি কেন্দ্র থেকে তিনি ভোটে (West Bengal CM) লড়েছেন। মমতার বিরুদ্ধে শুধু জয়ই পাননি, আগের চেয়ে সেই জয়ের ব্যবধানও অনেক বাড়িয়েছেন। ভবানীপুরে মমতাকে তিনি হারিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি ভোটে।
বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে লক্ষ্য
শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) বলেন, “আমাদের সরকারের মূল মন্ত্র হবে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ এবং সবকা বিশ্বাস’। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং বাংলাকে পুনরায় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করাই প্রশাসনের অগ্রাধিকার হবে। বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি যারা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কমিশন গঠন করা হবে। যারা সরকারি অর্থ নয়ছয় করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব। আগামী দিনে সংকল্পপত্রের প্রত্যেকটা সংকল্প সময়ের মধ্যে পূরণ করা হবে।”
তৃণমূল নেত্রীর একসময়ের প্রধান সহযোগী থেকে আজ তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যের মসনদে আসীন হওয়া— শুভেন্দু অধিকারীর এই রাজনৈতিক বিবর্তন বাংলার ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।