মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: সমুদ্রপথে ভারতে হামলার ছক কষছে পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবা (LeT)। পর্যটকের ছদ্মবেশে পাকিস্তানের করাচির কাছে চারনা দ্বীপে স্কুবা ডাইভিং এবং ডুবসাঁতারের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে লস্কর জঙ্গিরা। সমুদ্রপথে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর। সোশ্যাল মিডিয়ায় জম্মু ও কাশ্মীরের যুবকদের মগজ ধোলাই করে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবায় (Lashkar-e-Taiba) শামিল করার চেষ্টা চলছে। সেই সূত্রে খোঁজখবর নিতে গিয়েই এই বিষয়টি গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে।
চারনা দ্বীপে লস্করের ‘দাওয়া মেরিন উইং’-এর প্রশিক্ষণ
সূত্রের খবর, করাচি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চারনা দ্বীপে লস্করের ‘দাওয়া মেরিন উইং’ অথবা ‘সাদা-ই-হুরিয়ত’ নামে একটি শাখার সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে। পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এই দ্বীপে রয়েছে একাধিক ডাইভিং স্পট। সেই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে জঙ্গিরা। সাধারণ পর্যটক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে সেখানে স্কুবা ডাইভিং, কমব্যাট সুইমিং এবং জলের তলায় বিভিন্ন ধরনের অভিযান চালানোর কৌশল শিখছে তারা। প্রশিক্ষকদের সঙ্গে পাকিস্তানের মার্কাজি মুসলিম লিগের (PMML) যোগ রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে দাবি। এই সংগঠনটিকেও লস্করের শাখা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সংগঠনের কট্টর সদস্যরাই সরাসরি এই প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করছে।
লস্কর জঙ্গিদের সামুদ্রিক অভিযানের প্রশিক্ষণ
এর আগেও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের (পিওকে) মঙ্গল বাঁধে জঙ্গিদের সামুদ্রিক অভিযানের প্রশিক্ষণ নিতে দেখা গিয়েছে। এমনকী, জঙ্গি লঞ্চপ্যাডগুলিতে বিশেষ ধরনের সুইমিং পুল তৈরি করেও চলত প্রশিক্ষণ। গত কয়েক বছরে একাধিক সামরিক অভিযানে ক্রুজ মিসাইল ও নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম বোমা ব্যবহার করে সেই পরিকাঠামো ধ্বংস করেছে ভারত। এর মধ্যে ছিল অপারেশন সিঁদুরও। গোয়েন্দাদের দাবি, ২০০৮ সাল থেকেই লস্করের একটি ছোট মেরিন উইং সক্রিয় রয়েছে। তবে বর্তমানে সমুদ্রপথে আরও বড় মাপের হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনটি।
মুম্বই হামলার পুনরাবৃত্তির চেষ্টা
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বইয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার সময় সমুদ্রপথেই শহরে ঢুকেছিল লস্কর জঙ্গিরা। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। সমুদ্রপথে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। পূর্বের ২৬/১১ হামলার রুট অনুসরণ করেই এবার আরও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ভারতীয় উপকূলে নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
কাশ্মীরে লস্করের জঙ্গি মডিউলের হদিস
এদিকে, কাশ্মীরে লস্কর-ই-তৈবার একটি জঙ্গি মডিউলের সন্ধান পেয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমকে হাতিয়ার করে উপত্যকার তরুণদের নিয়োগ এবং মৌলবাদে উদ্বুদ্ধ করার কাজ চালাচ্ছিল ওই মডিউল। শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, এই ঘটনায় জম্মু ও কাশ্মীরের ছ’টি জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালায় কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স কাশ্মীর (CIK)। পুলওয়ামার একটি গ্রাম ছাড়াও বাডগাম, শ্রীনগর, বিজবেহারা এবং অনন্তনাগের মাত্তানে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশির সময় উপস্থিত ছিলেন এগজিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটরাও। তদন্তকারীদের দাবি, অভিযানে বেশ কিছু নথি এবং ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার হয়েছে। সেগুলি থেকে জঙ্গি কার্যকলাপের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মহম্মদ ইয়াসিন মীরের বাড়িতে তল্লাশি
তল্লাশি চালানো হয় ২২ বছর বয়সি স্নাতক যুবক মহম্মদ ইয়াসিন মীরের বাড়িতেও। তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে তাঁর মা তাবাসসুম শাহিন। তিনি পাকিস্তানের নাগরিক। গত বছরের ২৯ এপ্রিল তিনি কাশ্মীর ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান। তার পর থেকে আর ফিরে আসেননি। ভিসা সংক্রান্ত কোনও সমস্যার কারণে তিনি ফিরতে পারেননি, নাকি স্বেচ্ছায় আর ফেরেননি, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে তদন্তকারীদের দাবি, পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরেও ছেলের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সেই যোগাযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খোঁজ-খবর নেওয়া হয় পীরজাদা আনাায়ত উল্লাহ শাহ-র বাড়িতেও।
কাশ্মীরের তরুণদের প্রভাবিত করার চেষ্টা
এক তদন্তকারী আধিকারিকের বক্তব্য, পাকিস্তানে বসে লস্করের হ্যান্ডলার এবং সংশ্লিষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলি সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে কাশ্মীরের তরুণদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে বলে খবর পাওয়ার পরই তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ, ভারতের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে তরুণদের উস্কানি দেওয়া এবং জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত করার উদ্দেশ্যেই এই প্রচেষ্টা। গোটা ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স কাশ্মীর। তদন্তকারীদের দাবি, প্রায় তিন বছর আগে দায়ের হওয়া একটি মামলার সূত্র ধরেই এই অভিযান। সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণদের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করছিল অভিযুক্তেরা। লস্কর-ই-তৈবা-সহ একাধিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগসাজশ করে তারা কাশ্মীরের তরুণদের জঙ্গি কার্যকলাপের দিকে টানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জঙ্গিদের গোপনে আর্থিক সাহায্য
সম্প্রতি, জম্মু ও কাশ্মীরে নাশকতার ছক ও জঙ্গিদের অর্থ সাহায্যের অভিযোগে উপত্যকার সোপিয়ান জেলা থেকে ১০ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবা (LeT) এবং তার শাখা সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (TRF)-কে আর্থিকভাবে সহায়তা করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের হদিশ পেতে বেশ কিছু সন্দেহজনক অনলাইন লেনদেন ও আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস খতিয়ে দেখেছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃত ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নানা অজুহাতে টাকা তুলত। সেই সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ নিজেদের কাছে রেখে বাকি টাকা বিভিন্ন অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য মাধ্যমের সাহায্যে সরাসরি লস্কর-ই-তৈবা ও টিআরএফ-এর হাতে তুলে দিত। প্রাথমিক তদন্তে এও জানা গিয়েছে যে, এই অবৈধ উপায়ে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে জঙ্গিদের জন্য স্মার্টফোন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হতো। একাধিক সন্দেহজনক অনলাইন পেমেন্ট ও ট্রানজ্যাকশনের ইতিহাস খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের খোঁজ মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Leave a Reply