মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আরব সাগরে সশস্ত্র জলদস্যুদের কবলে পড়া একটি ইরানি মাছ ধরার জাহাজ থেকে ২০ জন নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করল ভারতীয় নৌসেনা। ২ নভেম্বর, সোমবার, টানা ৪৮ ঘণ্টার এক জটিল অভিযানের পর এই সাফল্য আসে। মুম্বই উপকূল থেকে প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে এই অভিযান চালানো হয়। জলদস্যুদের হাতে থাকা জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করা থেকে শুরু করে সেটিকে আটকানো এবং সমস্ত নাবিককে নিরাপদে মুক্ত করা—প্রতিটি পর্যায়েই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ভারতীয় নৌসেনা। অভিযানে ভারতীয় বায়ুসেনার (IAF) সহযোগিতাও ছিল।
৪৮ ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার ২০ নাবিক, সক্রিয় ভূমিকা বায়ুসেনারও
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতীয় নৌসেনার এই সাফল্যের কথা প্রকাশ্যে জানান। একইসঙ্গে অভিযানে যুক্ত নৌসেনার সমস্ত কর্মীকে অভিনন্দন জানান তিনি। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ রাজনাথ লেখেন, ২ নভেম্বর আরব সাগরে মুম্বই থেকে ৩,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে ছিনতাই হওয়া মাছ ধরার জাহাজ ‘আজ়িনি’ (Azini)-র ২০ জন নাবিককে উদ্ধারে ভারতীয় নৌসেনা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ৪৮ ঘণ্টার অভিযান চালিয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানটি কয়েকটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথমে জলদস্যুদের দখলে থাকা জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করে ভারতীয় নৌসেনা। এরপর সেটিকে মাঝসমুদ্রে আটকানো হয়। শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র জলদস্যুদের কবল থেকে জাহাজের ২০ জন নাবিককে নিরাপদে মুক্ত করা সম্ভব হয়।
এই অভিযানে ভারতীয় বায়ুসেনার সময়োপযোগী সহযোগিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজনাথ সিং জানান, জলদস্যুদের হাতে থাকা জাহাজটির দ্রুত অবস্থান নির্ণয়, সেটিকে আটকানো এবং নাবিক ও জাহাজকে নিরাপদে মুক্ত করার ক্ষেত্রে নৌসেনার দক্ষতার পাশাপাশি বায়ুসেনার সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তাঁর মতে, এই অভিযান আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলির সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার পরিচয়।
সোমালিয়ার উপকূলের কাছে ছিনতাই হয়েছিল ‘আজ়িনি’
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, উত্তর-পূর্ব সোমালিয়ার উপকূলবর্তী বান্দর বায়লা (Bandar Bayla) এবং হাফুন (Hafun) শহরের মধ্যবর্তী এলাকায় জাহাজটি জলদস্যুদের কবলে পড়ে। পুন্তল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্সের এক সামুদ্রিক নিরাপত্তা আধিকারিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (AP) এই তথ্য জানিয়েছিলেন।
সোমালিয়ার উপকূল দীর্ঘদিন ধরেই জলদস্যুদের তৎপরতার কারণে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগের জায়গা। বিশেষত, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং মাছ ধরার ট্রলারগুলিকে লক্ষ্য করে ছিনতাইয়ের ঘটনা আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তার প্রশ্নকে বারবার সামনে এনেছে।
সেই প্রেক্ষাপটে ‘আজ়িনি’ উদ্ধারের অভিযান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ঘটনাস্থল ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে অনেক দূরে হলেও দ্রুত পদক্ষেপ করে ভারতীয় নৌসেনা ২০ জনের প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের বার্তা
অভিযানের সাফল্যকে শুধু একটি উদ্ধার অভিযান হিসেবে দেখছে না প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৃহত্তর কৌশলগত অবস্থানও। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এই ভারত মহাসাগর। এই অঞ্চলে জলদস্যুতা, জাহাজ ছিনতাই এবং অন্যান্য সামুদ্রিক নিরাপত্তার হুমকি মোকাবিলা করা ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনাথ সিং স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানবজীবন রক্ষা এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রশ্নে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর কথায়, অবাধ, উন্মুক্ত ও নিরাপদ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করতে ভারত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ‘সেফ সিজ’ (SAFE SEAS) বা নিরাপদ সমুদ্রের বার্তাও পুনরায় তুলে ধরেছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এই অভিযানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রথমত, ভারতের উপকূল থেকে ৩,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অভিযান চালানোর সক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, নৌসেনা ও বায়ুসেনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক জলপথে বিপদে পড়া নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের দ্রুত হস্তক্ষেপ।
সব মিলিয়ে, ‘আজ়িনি’ উদ্ধারের অভিযান ভারতীয় নৌসেনার দূরপাল্লার অভিযান পরিচালনা, সামুদ্রিক নজরদারি এবং জলদস্যুতা মোকাবিলার সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপদ জলপথ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভারতের সক্রিয় ভূমিকার বার্তাও পৌঁছে দিল এই অভিযান।

Leave a Reply