Vishwakarma Puja: বিশ্বকর্মা পুজোয় কেন ওড়ে ঘুড়ি? ‘ভোক্কাট্টা’র নেপথ্যে রয়েছে চমকপ্রদ ইতিহাস

vishwakarma-puja-kites-bhokatta-kolkata-history

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আজ বিশ্বকর্মা পুজো (Vishwakarma Puja)। আর বিশ্বকর্মা তথা দেবশিল্পীর পুজো মানেই দুর্গাপুজোর ফাইনাল কাউন্টডাউন শুরু। এই দিনটির আরও এক বিশেষ আকর্ষণ ঘুড়ি ওড়ানো (Kite Flying)। নীল আকাশের বুকে রং-বেরঙের ঘুড়ির মেলা—একসময় বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে যা ছিল অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

একটা সময় ছিল, যখন মানুষের ব্যস্ততা এত বিরামহীন ছিল না। সেই সময় কলকাতা তথা বাংলার আকাশে বিশ্বকর্মা পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই দখল নিতে শুরু করত ঘুড়ি। পুজোর দিন ভোর থেকেই বাচ্চা থেকে বয়স্ক—নাটাই, মাঞ্জাসুতো হাতে সকলে মেতে উঠতেন ঘুড়ির প্যাঁচের প্রতিযোগিতায়। সকাল থেকে বিকেল আকাশজুড়ে দেখা যেত ঘয়লা, পেটকাটি, চাপরাস, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, ময়ূরপঙ্খী, বগ্গা-সহ নানা ধরনের ঘুড়ি। বাতাস মুখরিত হত একটাই শব্দে—‘ভোক্কাট্টা!’

এখন অবশ্য সেই দিন অনেকটাই অতীত। ব্যস্ততার আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে সেই উন্মাদনা ও আমেজ। শহরের আকাশে আগের মতো ঘুড়ির মেলাও আর দেখা যায় না। ইতিউতি কোথাও, এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুড়ি ওড়ে (Kite Flying)। তবু বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্য আজও বাঙালির নস্টালজিয়ার অন্যতম অংশ।

পুরাণ মতে কেন বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো হয়?

পুরাণ মতে, বিশ্বকর্মা হলেন দেবতাদের শিল্পী। স্বর্গে দেবতাদের যে কোনও ধরনের কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন পড়লেই মুশকিল আসান একমাত্র বিশ্বকর্মা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশ্বকর্মাই দেবতাদের জন্য উড়ন্ত রথ তৈরি করেছিলেন। সেই উড়ন্ত রথের স্মৃতিকে ঘিরেই বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর রীতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

ঋগ্বেদের সঙ্গে যুক্ত ব্যাখ্যায় বিশ্বকর্মাকে সৃষ্টিশীলতা, নির্মাণ ও কারিগরি বিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পুরাণের কাহিনিতে কৃষ্ণের বাসস্থান দ্বারকা নগরী নির্মাণের সঙ্গেও বিশ্বকর্মার নাম জড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণেই শ্রমিক থেকে ইঞ্জিনিয়ার—কারিগরি ও নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে বিশ্বকর্মা পুজোর গুরুত্ব বরাবরই বিশেষ।

বাংলায় কবে থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর চল?

ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, বাংলায় ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে জোরালো হয়ে ওঠে। প্রায় ১৮৫০ সাল নাগাদ কলকাতা ও গ্রাম বাংলার কিছু বিত্তশালী জমিদার ঘুড়িতে টাকা বেঁধে ওড়াতেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানোর চল ততটা জনপ্রিয় ছিল না; মূলত ধনী ও অভিজাতদের মধ্যেই এই শখ সীমাবদ্ধ ছিল।

তবে কলকাতায় ঘুড়ি ওড়ানোর সংস্কৃতির বিস্তারের সঙ্গে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের নামও জড়িয়ে রয়েছে। ১৮৫৬ সালে অওধের সিংহাসন হারিয়ে কলকাতায় আসেন তিনি। পরে মেটিয়াবুরুজে নিজের আবাস গড়ে তোলেন। তাঁর সঙ্গে কলকাতায় আসে লখনউয়ের নানা সাংস্কৃতিক রীতি ও বিনোদনের ধারা। তারই অন্যতম ছিল ঘুড়ি ওড়ানো ও ঘুড়ির লড়াই।

ওয়াজেদ আলি শাহের মেটিয়াবুরুজের ‘ছোটা লখনউ’-এ ঘুড়ি ওড়ানো ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে সেই সংস্কৃতি কলকাতার রাজা, জমিদার ও অভিজাত সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক সূত্রে এমনও উল্লেখ রয়েছে যে, সেই সময় ঘুড়ি ওড়ানো শুধু বিনোদন ছিল না, বরং আভিজাত্য ও ঐশ্বর্য প্রদর্শনেরও একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

আজ অবশ্য শহরের আকাশে সেই পুরনো দিনের মতো ঘুড়ির ভিড় নেই। উঁচু বহুতল, খোলা জায়গার অভাব, মানুষের ব্যস্ততা এবং মোবাইল-নির্ভর বিনোদনের কারণে কলকাতায় ঘুড়ি ওড়ানোর ঐতিহ্য অনেকটাই ফিকে হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলিতেও উঠে এসেছে।

তবু বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে নীল আকাশে হঠাৎ কোনও রঙিন ঘুড়ি ভেসে উঠলে আজও যেন ফিরে আসে পুরনো কলকাতার সেই দিনগুলি। নাটাই হাতে ছাদে দাঁড়ানো ছোট-বড় সকলের চোখে তখন একটাই অপেক্ষা—কখন প্রতিপক্ষের ঘুড়ি কাটা যাবে, আর চারপাশে শোনা যাবে সেই চেনা ডাক—‘ভোক্কাট্টা!’

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share