TCS Nashik Controversy: “সন্তান চাইলে স্ত্রীকে পাঠাও”! টিসিএস নাসিক কাণ্ডে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ কর্মীর, বন্ধ হল বিপিও ইউনিট

tcs nashik controversy employee's explosive allegation send your wife to me if you want a child

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (Tata Consultancy Services) বা টিসিএস-এর নাসিকের বিপিও ইউনিটে যৌন হেনস্থা এবং জোর করে ধর্মান্তকরণের অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে শোরগোল। একাধিক মহিলা কর্মীর অভিযোগের পর এবার এক পুরুষ কর্মীও সামনে এসে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ওই কর্মী অভিযোগ করেন, তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে জোর করে নামাজ পড়তে বাধ্য করতেন, কালমা পাঠ করাতেন এবং মাথায় ফেজ টুপি পরতে বাধ্য করতেন। তিনি আরও দাবি করেন, এক অভিযুক্ত তাঁকে কুরুচিকরভাবে বলেন— “সন্তান চাইলে স্ত্রীকে পাঠাও।” অভিনব কায়দায় মহারাষ্ট্রের নাসিকে টিসিএস-এর মধ্যে এই ধর্মান্তর চক্রের হদিশ পায় পুলিশ।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

ওই কর্মীর অভিযোগ, ২০২২ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তাঁর উপর মানসিক ও ধর্মীয় চাপ তৈরি করা হয়। টিম লিডার তৌসিফ আখতার ও সহকর্মী দানিশ শেখ তাঁর উপর অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দিতেন এবং ধর্মীয় আচরণে বাধ্য করতেন বলে অভিযোগ। উল্লেখ্য, এর আগে ২৩ বছর বয়সি এক মহিলা কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া এফআইআরে দানিশ শেখের বিরুদ্ধে জোর করে চুম্বনের চেষ্টা ও বিয়ের চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এছাড়া অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও ধর্মান্তরের চেষ্টা করার অভিযোগও রয়েছে।

গোপনে তদন্তে মহিলা পুলিশ

ঘটনার তদন্তে পুলিশ আন্ডারকভার মহিলা অফিসার মোতায়েন করে। টিসিএসের এই অফিসে ছদ্মবেশে মহিলা কন্সটেবলদের ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। গোপন অপারেশন চালানো হয়। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মতে, এটি নিছক হয়রানির ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগসূত্র বেরিয়ে এসেছে। যে কারণে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত

পুরো ঘটনাটির সূত্রপাত হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। একজন রাজনৈতিক কর্মী নাসিক পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে দাবি করা হয়, কোম্পানিতে কর্মরত এক হিন্দু মহিলা রমজান মাসে রোজা রাখছিলেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের সন্দেহ হয়। তারা একটি গোপন অভিযান শুরু করে। এই অভিযানটি ধীরে ধীরে একটি বিস্ফোরক রহস্য উন্মোচন করে। পুলিশ সাফাইকর্মীর ছদ্মবেশে মহিলা কনস্টেবলদের কোম্পানির ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়। এরা ক্যাম্পাসের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করেন, যা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে কিছু টিম লিডার তাদের পদের অপব্যবহার করছিলেন। তদন্তে জানা যায়, কর্মীদের টার্গেট করা হচ্ছিল। তাদের মানসিক ও শারীরিক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছিল।

ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিদ্রূপের অভিযোগ

অভিযোগকারী পুরুষ কর্মী জানান, তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং নিয়মিত রুদ্রাক্ষ মালা পরেন। এই কারণেই তাঁকে বারবার বিদ্রূপ করা হত। হিন্দু দেবদেবী সম্পর্কে কটূক্তি করা হতো বলেও অভিযোগ। তিনি আরও দাবি করেন, একাধিকবার তাঁকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে জোর করে আমিষ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। তিনি নিরামিষভোজী হওয়ায় আপত্তি জানালে তাঁকে অপমান করা হয়। ২০২৩ সালের ইদের দিনে তাঁকে এক সহকর্মীর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে জোর করে টুপি পরিয়ে নামাজ পড়ানো হয় এবং সেই ছবি অফিসের গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। অভিযোগকারী বলেন, তাঁর নিঃসন্তান জীবন নিয়ে তাঁকে নিয়মিত অপমান করা হত। স্ত্রীকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করা হতো, যা মানসিকভাবে তাঁকে ভেঙে দেয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারার হুমকি দেওয়া হয়। অফিসে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে চাকরি থেকে সরানোর চেষ্টা করা হয়। এমনকি তাঁর অসুস্থ বাবাকে নিয়েও ধর্মান্তরের প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি।

বিদেশি সংযোগ

তদন্ত চলাকালীন হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট থেকে মালয়েশিয়ায় সন্দেহভাজন ধর্মপ্রচারক ইরমানের নামও প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ ওঠে, ভিডিও কলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এর থেকেই বোঝা যায়, মামলাটি শুধু স্থানীয় নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখন এই বিদেশি সংযোগও খতিয়ে দেখছে। বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) অনুসারে, এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই সংখ্যা ছিল ৯, কিন্তু তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেকে এগিয়ে এসেছেন। এখনও পর্যন্ত আটজন মহিলা কর্মী ও একজন পুরুষ কর্মী মোট নয়টি এফআইআর দায়ের করেছেন। এই সমস্ত অভিযোগে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এবং ধর্মীয় জবরদস্তির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের বয়স আনুমানিক ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এই ঘটনাগুলো ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলেছিল। এর থেকেই স্পষ্ট যে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী ধারা ছিল।

এফআইআর-এ কী বলা হয়েছে

প্রথম এফআইআর-এ দানিশ শেখ, তৌসিফ আত্তার এবং নিদা খানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, তারা হিন্দু দেব-দেবী সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক মহিলার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হন। দ্বিতীয় এফআইআর-এ রাজা মেমন এবং শাহরুখ কুরেশির বিরুদ্ধে অশালীন আচরণ ও মানসিক হয়রানির অভিযোগ আনা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ এফআইআর-এও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। শাফি শেখ ও তৌসিফ আখতারের বিরুদ্ধে মহিলা কর্মীদের পিছু নেওয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগও রয়েছে, যা বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। পঞ্চম এফআইআর-এ অভিযোগ করা হয়েছে, কর্মীদের নামাজ পড়তে ও মাংস খেতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতেও বাধ্য করা হয়েছিল।

এফআইআর-এ কাদের নাম

ষষ্ঠ ও সপ্তম এফআইআর-এও অভিযুক্তদের দ্বারা হয়রানি, পিছু ধাওয়া এবং অশ্লীল মন্তব্যের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলাগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় একাধিক ব্যক্তি এই নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করছিল। অষ্টম ও নবম এফআইআর-এও ক্রমাগত হয়রানি, বিয়ের জন্য চাপ এবং মানসিক চাপের অভিযোগ আনা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলেন, অভিযুক্তরা তাদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাত এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করত। এতে অনেক কর্মচারী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এই মামলায় এখনও পর্যন্ত অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন দানিশ শেখ, তৌসিফ আত্তার, শফি শেখ, রাজা মেমন, শাহরুখ কুরেশি, আসিফ আনসারি, অশ্বিনী চেইনানি এবং নিদা খান। পুলিশ অশ্বিনী চেইনানিকে আটক করেছে, তবে নিদা খান এখনও পলাতক। তাকে খুঁজে বের করার জন্য অভিযান চলছে।

সাময়িক বন্ধ টিসিএস নাসিকের বিপিও ইউনিট

তদন্তকারী সংস্থাগুলি বর্তমানে এই মামলায় বিদেশি অর্থ দেওয়া, ব্যাঙ্কে লেনদেন, কল রেকর্ড এবং ডিজিটাল প্রমাণের ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে এই ধরনের হয়রানি বা জবরদস্তির কোনও স্থান নেই, বলে জানিয়েছে টিসিএস কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনা সামনে আসার পর টিসিএস নাসিকের বিপিও ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্মীদের ওয়ার্ক-ফ্রম-হোমে পাঠানো হয়েছে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share