Madan Mitra: মমতার ‘ভাঙা হাট’! ক্ষমতা টলতেই ছায়াসঙ্গীদের প্রস্থান, সঙ্গ ছাড়লেন মদনও?

mamatas-bhanga-haat-shadow-companions-leave-as-power-falters-has-madan-also-left-the-party

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ২০১১ সাল, বিশ্বস্ত সৈনিকদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। মুখ্যমন্ত্রী পদে মমতার শপথের সঙ্গেই শপথ নেন তাঁর বিশ্বস্ত সৈনিকরাও। কিন্তু আজ সেই সব সৈনিকরাই সঙ্গ নিলেন অন্য ‘রাজার’। তাসের ঘরের মতো ভাঙছে কালীঘাটের দুর্গ। ২০১১ সালে যে সমস্ত বিশ্বস্ত, লড়াকু সৈনিকদের কাঁধে ভর করে বাংলায় পরিবর্তনের ইতিহাস লিখেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ক্ষমতা টলমল করতেই আজ একে একে তাঁরাই সঙ্গ ছাড়ছেন দলনেত্রীর। তৃণমূলে এখন শুধুই ভাঙা-গড়ার খেলা। আর এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছাড়লেন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র (Madan Mitra)। মদনের হাত ছাড়ার সঙ্গেই এবার চূড়ান্ত রূপ নিল কালীঘাট তৃণমূলের ভাঙন। বিধানসভায় ‘ঋতব্রত তৃণমূলে’ যোগ দিলেন মদন। স্পষ্ট করে দিলেন- দলের এই ভরাডুবি এবং ভাঙনের জন্য দায়ী আর কেউ নন, খোদ ভাইপো।

ক্ষমতা যেতেই সঙ্গত্যাগ (Madan Mitra Leaves TMC)!

যুব কংগ্রেসের আমল থেকে মমতার ছায়ার মতো পাশে থাকা মদন মিত্রও আর কালীঘাটের প্রতি আস্থা রাখতে পারলেন না। তৃণমূলের চরম সঙ্কটের দিনগুলোতেও তিনি কালীঘাটের পথ ছাড়েননি, বিশ্বস্ত সেনাপতির মতো আগলে রেখেছিলেন নেত্রীকে। কিন্তু সেই মদন মিত্রের সঙ্গত্যাগই প্রমাণ করে দিল, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের অন্দরের ফাটল এখন কতটা চওড়া। বুধবার দুপুরে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর হাত ছাড়লেন মদন মিত্র (Madan Mitra Leaves TMC)। সরাসরি বিধানসভায় গিয়ে যোগ দিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ শিবিরে। সম্প্রতি মদন মিত্রের (Madan Mitra) স্ত্রী ও দুই ছেলেকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি (ED) তলব করে। ইডি-র তলবের পরপরই সন্দীপন সাহার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন মদন মিত্র। এই দুই ঘটনার পর থেকেই জল্পনা তুঙ্গে ওঠে, যা বুধবার দুপুরে কামারহাটির বিধায়কের সঙ্গ বদলের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হলো। মমতার সঙ্গ ছাড়ার পর মদন মিত্রের গলায় ঝরে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ আর হতাশা। তাঁর সাফ কথা- ‘‘দল যখন ডুবছে, তখন সংগঠন টানার মতো মহাবলী কাউকে দরকার ছিল। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অহঙ্কার, একনায়কতন্ত্র এবং ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আজ দল ও দলের কর্মীদের এই চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছেন অভিষেকই।’’

মদনের অভিযোগ

মদন মিত্রের (Madan Mitra) অভিযোগ, ‘‘আমি তো চুনোপুঁটি, অভিষেক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয় না। দল এখন চলছে হিটলারি কায়দায়। ‘ক্যামাক স্ট্রিট’ যা বলবে, তা না শুনলেই পুলিশের ভয় দেখানো হয়।’’ ভোটের ভরাডুবির পুরো দায় অভিষেকের উপর চাপিয়ে মদনের দাবি, “একটা লোকের জন্য গোটা দল, যারা ২১৩টি আসন পেয়েছিল, সর্বনাশ হয়ে গেল”। দলের ডুবন্ত সংগঠনকে টেনে তুলতে অভিষেককে সরানোর জন্য তিনি একাধিকবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুনয়-বিনয় করেছিলেন, কিন্তু নেত্রী সেই পরামর্শে কান দেননি বলেও অভিযোগ উঠছে। তিনি আরও বলেন, ‘‘ইডি-র চেয়ে বেশি ভয় ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ইডি ধরলে তবু কথা বলে জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু অভিষেক কখন কোথায় তাড়িয়ে দেবে কে জানে!’’

অভিষেককে তীব্র খোঁচা মদনের

মমতার সঙ্গ ছেড়েই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও রণকৌশল নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুললেন মদন মিত্র (Madan Mitra)। তাঁর মতে, ‘‘জনসংযোগহীন এই চটকদার রাজনীতি দিয়ে আর যাই হোক, বিজেপিকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। এখনই হাল ধরা না গেলে, ভবিষ্যতে কখনও বিজেপি-কে হারানো যাবে না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে বিজেপি-কে হারানো যাবে না। হিটলারি কায়দায়, প্লেন থেকে নেমে, কোমরে হাত দিয়ে চার তারিখ দেখে নেব, হুইসল বাজবে- এসবে দল চলে না। রাজনীতি করতে গেলে মানুষের কাছে যেতে হবে।’’

‘আদালত তৃণমূলের সম্মান বাঁচিয়েছে’

ভোটের ফলাফল ও আদালতের সাম্প্রতিক কিছু হস্তক্ষেপের প্রতি ইঙ্গিত করে মদন মিত্রর দাবি, “আদালতের জন্যই অন্তত দলের সম্মানটুকু রক্ষা পেয়েছে। বাদাম-মুড়িওয়ালাই ৩-৪ হাজার লোক থাকে। সম্মানটাতো বাঁচল”।

দুর্নীতির অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ

উত্তর ২৪ পরগনার সাতজন মন্ত্রীর দুর্নীতি এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা চাকরি বিক্রির অভিযোগের প্রসঙ্গেও সরব হন মদন মিত্র। তিনি সাফ জানান, যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে যে তিনি টাকা বা গয়না নিয়ে চাকরি দিয়েছেন, তবে মাথা পেতে নেবেন। এই বিষয়ে তিনি সরাসরি গণভোট করানোর চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দেন।

কোণঠাসা কালীঘাট

তৃণমূলে এই ভাঙা-গড়ার খেলা অবশ্য মদন মিত্রকে দিয়ে শুরু হয়নি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের উপর অনাস্থা প্রকাশ করে এই বিদ্রোহের সূত্রপাত করেছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর একে একে সেই বিক্ষুব্ধ শিবিরেই নাম লিখিয়েছেন উত্তরবঙ্গের দাপুটে নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ থেকে শুরু করে বীরভূমের অনুব্রত মণ্ডলের মতো পুরনো ও শীর্ষ নেতৃত্ব। অন্যদিকে মঙ্গলবারই শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘‘ক্যামাক স্ট্রিটই দলটাকে শেষ করে দিল।’’ আর আজ মদন মিত্রের সঙ্গত্যাগ। আবারও প্রমাণ করে দিল যে, পুরনো নেতাদের এই ক্ষোভ কতটা গভীর।

বিপন্ন তৃণমূল কর্মীরা

কালীঘাট তৃণমূলের হাত ছাড়ার পাশাপাশি দলের বর্তমান শোচনীয় অবস্থার কথাও তুলে ধরে মদন মিত্র। তিনি জানান, ‘‘আজ দলের লক্ষ লক্ষ ছেলে ঘরছাড়া, মারপিট চলছে, ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, নেতাদের মূল কাজ হবে এই অসহায় কর্মীদের জন্য লঙ্গরখানা খোলা।’’ দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা মদন মিত্রের এই সঙ্গত্যাগ ও সরাসরি বিদ্রোহ প্রকাশ কালীঘাট শিবিরের জন্য যে এক বিরাট বড় ধাক্কা, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০১১ সালের সেই সোনালী অধ্যায়ের কাণ্ডারীদের এভাবে একে একে বিদায় নেওয়া এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা বিশ্বস্ত দুর্গে ফাটল, এটাই প্রমাণ করে- কালীঘাটপন্থী তৃণমূল আজ অস্তিত্বের সঙ্কটে। আর এই ভাঙনের খেলায় লাভ কার হবে, তা সময়ই বলবে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share