মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং বিশেষভাবে নির্ভরশীল মেয়েদের উপর ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের (Migrants Controversy) একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। কয়েকটি ঘটনায় তদন্ত চলছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে আদালতে বিচারপ্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এসব ঘটনা ঘিরে দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষদের নিরাপত্তা এবং পরিচর্যা ব্যবস্থায় নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ফ্রান্সে প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ
ফ্রান্সের তুলুজের কাছে একটি বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্রে ২৩ বছরের পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ৪০ বছরের এক মরক্কোর নাগরিক পরিচর্যাকারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁর হয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের ১ আগস্ট তুলুজের সরকারি কৌঁসুলির দফতর মামলাটি খারিজ করে দেয় বলে জানা গিয়েছে। তরুণীর মা নাথালি মুয়ে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ঘটনার পর তাঁর মেয়ে ওই পরিচর্যা কেন্দ্রে ফিরতে ভয় পাচ্ছিলেন। অভিযুক্ত পরিচর্যাকারীর বিরুদ্ধে একই প্রতিষ্ঠানে আরও দুই তরুণীর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার কথাও স্থানীয় সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তদন্তের সময় তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
স্পেনে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ
স্পেনের মানাকোরে ২০২০ সালের একটি ঘটনায় ৪০ বছরের এক সেনেগালের নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। প্রসিকিউশনের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে ওই কিশোরীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁর প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি জানতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কিশোরীকে একটি গ্যারাজে ঢুকিয়ে বের হওয়ার পথ আটকে দেন এবং তাঁকে ও তাঁর বোনকে হুমকি দেন। এরপর ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন, তিনি কখনও ওই গ্যারাজে ঢোকেননি। তাঁর বিরুদ্ধে নয় বছরের কারাদণ্ড এবং সাজা শেষে দেশ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
স্ট্রাসবুর্গে ১৫ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ
ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ২০২৩ সালে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে ২৬ বছরের এক আফগান নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কিশোরীকে সামান্য প্রতিবন্ধী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি একটি সুইমিং পুলে ঘটেছিল বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরও দুই কিশোরী এবং চল্লিশের কোঠার এক মহিলাকে যৌন হেনস্থার অভিযোগও রয়েছে। একজন কিশোরী লাইফগার্ডকে বিষয়টি জানানোর পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয় এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্বল ব্যক্তিকে ধর্ষণ এবং একাধিক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়।
ভিয়েনায় ৮২ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণের অভিযোগ
অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ৮২ বছরের এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ২৬ বছরের এক আফগান পরিচর্যাকারীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওই বৃদ্ধার বাড়িতে ঘটেছিল বলে অভিযোগ। পরিবারের তরফে নজরদারি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। পরিবারের এক সদস্য মোবাইল ফোনে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তদন্ত চলাকালীন অভিযোগ ও প্রমাণের আইনি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সে ৮০ বছরের বৃদ্ধার মৃত্যুর ঘটনা
ফ্রান্সের নিয়োরে ৮০ বছরের এক মহিলাকে ধর্ষণের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। ঘটনাটি ২০২৫ সালের ৫ থেকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যবর্তী রাতে ঘটে। প্রায় দুই মাস পরে, ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ এক আফগান নাগরিককে গ্রেফতার করে। পোয়াতিয়ের সরকারি কৌঁসুলির দফতর জানিয়েছিল, অভিযুক্ত আফগানিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ২০০৫ সালে ফ্রান্সে এসেছিলেন। তাঁকে বিচার-পূর্ব হেফাজতে রাখা হয়। প্রবীণ এক মহিলার উপর যৌন সহিংসতার অভিযোগ এবং পরবর্তী মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয় স্তরে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করে।
জার্মানিতে ৯০ বছরের প্রতিবন্ধী মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ
জার্মানির ড্রেসডেনে ৩৩ বছরের এক ইরাকি নাগরিকের বিরুদ্ধে ৯০ বছরের এক প্রতিবন্ধী মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ওই মহিলা একটি হুইলচেয়ারে ছিলেন এবং পড়ে যাওয়ার পর তাঁকে এক্স-রে করাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একটি শৌচাগারে ওই মহিলার উপর যৌন হামলা চালানো হয়। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে শারীরিক ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়।
ফরাসি হাসপাতালে দুই প্রবীণ রোগীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
২০২৩ সালের অক্টোবরে ফ্রান্সের আর্জঁতুইয়ের ভিক্টর দুপুই হাসপাতালের জেরিয়াট্রিক বিভাগে ৯৩ এবং ৯৫ বছরের দুই রোগীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ৪৪ বছরের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়, অভিযুক্তকে ৯৩ বছরের এক মহিলার ঘর থেকে বের হতে দেখা যাওয়ার পর। তদন্তকারীরা তাঁর বিছানার চাদরে বীর্যের নমুনা পেয়েছিলেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়, যদিও সেটি অভিযুক্তেরই ছিল কি না তখনও নিশ্চিত হয়নি। পরে ৯৫ বছরের ওই রোগীও একই দিনে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন। ৯৩ বছরের মহিলা পরে জ্ঞান হারিয়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কারণ এবং যৌন নির্যাতনের সঙ্গে মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক ছিল কি না, তা পৃথক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের বিষয় হয়ে ওঠে।
অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক
এই ঘটনাগুলি ইউরোপে প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং পরিচর্যার উপর নির্ভরশীল মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে অভিবাসন, একীকরণ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি নাগরিকদের দ্বারা সংঘটিত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। জার্মানির অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (AfD)-সহ অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি এই ধরনের ঘটনাকে কঠোর অভিবাসন নীতি (Migrants Controversy) এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও বেড়েছে। তবে কোনও ব্যক্তির অপরাধের অভিযোগের ভিত্তিতে গোটা কোনও ধর্মীয়, জাতীয় বা অভিবাসী সম্প্রদায়কে দায়ী করা যায় না। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, তদন্তের ফল এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ই বিচার্য। একই সঙ্গে পরিচর্যা কেন্দ্র, হাসপাতাল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে দুর্বল মানুষদের সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

Leave a Reply