Ganga Underwater Road Tunnel: গঙ্গার নীচে ট্রাক টানেল তৈরিতে আগ্রহী আদানি! ১১ হাজার কোটির প্রকল্প ঘিরে বড় সম্ভাবনা

adani-group-taratala-sankrail-tunnel-interest

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলায় ১ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন গৌতম আদানি। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে রোপওয়ে নির্মাণ থেকে নিউটাউনে হাসপাতাল, বাংলায় বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে আদানি গোষ্ঠী। এবার কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে গঙ্গার নীচ দিয়ে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলের জন্য প্রস্তাবিত সড়ক টানেল প্রকল্পেও আগ্রহ দেখাল শিল্পগোষ্ঠীটি। নবান্ন সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে এই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হলে তাতে অংশ নিতে প্রস্তুত গোষ্ঠী। তবে এখনও নির্মাণের বরাত বা বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে টানেল প্রকল্প নিয়ে আলোচনা

সূত্রের দাবি, কলকাতা সফরে এসে ‘সৌজন্য’ ভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করেন গৌতম আদানি ও তাঁর প্রতিনিধিরা। সেখানে কলকাতা বন্দর থেকে হাওড়ার দিকে পণ্য পরিবহণের বিকল্প পথ হিসেবে প্রস্তাবিত তারাতলা–সাঁকরাইল আন্ডারওয়াটার সড়ক টানেল প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রকল্পের পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরে আদানি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা দরপত্রে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।

সূত্রের আরও দাবি, এই প্রকল্প নিয়ে আগাম প্রস্তুতি নিয়েই বৈঠকে এসেছিলেন আদানি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। যদিও সম্ভাব্য বিনিয়োগের অঙ্ক, প্রকল্পে অংশগ্রহণের ধরন কিংবা নির্মাণের সময়সীমা নিয়ে এখনও নির্দিষ্ট কোনও তথ্য সামনে আসেনি।

২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলায় এক লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের পরিকল্পনা

আদানিদের এই আগ্রহের পিছনে রয়েছে বাংলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বৃহত্তর পরিকল্পনা। গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউটাউনে আদানি আরোগ্য মন্দিরের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে গৌতম আদানি জানিয়েছিলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করতে চায় তাঁর গোষ্ঠী।

সেই ঘোষণায় বন্দর, পণ্য পরিবহণ, সড়ক, সেতু-সহ একাধিক পরিকাঠামো ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টন, সিমেন্ট, রোপওয়ে এবং হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের মতো ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য বিনিয়োগের কথা উঠে এসেছিল।

নিউটাউনে হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি মহাকরণ সংস্কার ও দার্জিলিংয়ে রোপওয়ে তৈরির সম্ভাবনা নিয়েও আদানি গোষ্ঠীর আগ্রহের কথা সামনে এসেছে। এবার সেই তালিকায় গঙ্গার নীচ দিয়ে সড়ক যোগাযোগের প্রস্তাব যুক্ত হওয়ায় রাজ্যে গোষ্ঠীটির সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কেন প্রয়োজন গঙ্গার নীচে সড়ক টানেল?

কলকাতা বন্দরের পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করাই প্রস্তাবিত টানেল প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। বর্তমানে বন্দরে আসা এবং বন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়া ট্রাক ও কন্টেনারবাহী গাড়িকে শহরের একাধিক ব্যস্ত রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। গার্ডেনরিচ, খিদিরপুর, হেস্টিংস এবং বিদ্যাসাগর সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে চলাচলের ফলে অনেক সময় যানজটের মুখে পড়ে পণ্যবাহী গাড়ি।

এর সঙ্গে রয়েছে ভারী যানবাহন চলাচলের সময়সীমা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ। ফলে বন্দরের পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতিতে গঙ্গার নীচ দিয়ে বিকল্প সড়কপথ তৈরি করা গেলে কলকাতা বন্দরের সঙ্গে হাওড়ার দিকের জাতীয় সড়ক ব্যবস্থার যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। শহরের ব্যস্ত রাস্তার উপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি ভারী যানবাহনের চলাচলও আরও মসৃণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যানজট কতটা কমবে এবং প্রকল্পটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত নকশা ও পরিবহণ পরিকল্পনার উপর।

১১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, কী ছিল প্রাথমিক পরিকল্পনা?

গঙ্গার নীচ দিয়ে সড়ক টানেল তৈরির ভাবনা নতুন নয়। কয়েক বছর ধরেই কলকাতা বন্দরকে নদীর পশ্চিম পাড়ের জাতীয় সড়ক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পিএম গতিশক্তি পরিকল্পনার আওতায় এই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল।

প্রায় দু’বছর আগে করা সমীক্ষায় প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। সেই সময়ে রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়াল জানিয়েছিলেন, সম্ভাব্য রুটের খসড়া রিপোর্ট বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা পড়েছে। প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শুরু করার পরিকল্পনা ছিল।

প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী, টানেল এবং তার সঙ্গে যুক্ত সড়ক মিলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব ছিল। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ ১৫ কিলোমিটার পথ নদীর তলা দিয়ে যাওয়ার কথা নয়। কলকাতার দিকে মেটিয়াবুরুজ এবং হাওড়ার দিকে বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন এলাকায় সংযোগ তৈরির সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছিল।

তবে বর্তমানে আলোচনায় থাকা তারাতলা–সাঁকরাইল প্রকল্পের চূড়ান্ত রুট, প্রবেশ ও প্রস্থানপথ এবং মোট দৈর্ঘ্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। অনুমোদিত নকশা ও বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট তৈরি হলে এই বিষয়গুলি স্পষ্ট হবে। একইভাবে, আগের সমীক্ষায় উল্লেখ করা ১১ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ই চূড়ান্ত প্রকল্পমূল্য হবে কি না, তা-ও এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

আদানির বিনিয়োগ পরিকল্পনায় কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প?

গৌতম আদানির ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু পরিকাঠামো। উন্নত বন্দর, সড়ক ও সেতুর সঙ্গে পণ্য পরিবহণ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটানোই এই পরিকল্পনার মূল ভাবনা।

নিউটাউনের অনুষ্ঠানে গৌতম আদানি বলেছিলেন, “পরিকাঠামো লক্ষ লক্ষ মানুষের সম্ভাবনাকে বদলে দিতে পারে। আদানি গোষ্ঠীতে আমরা যা করি, তার কেন্দ্রেই রয়েছে পরিকাঠামো।”

তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা ছিল, উন্নত বন্দর পণ্য পরিবহণকে শক্তিশালী করে। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা শিল্পকে আকর্ষণ করে এবং শিল্পের বিকাশের সঙ্গে বাড়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং উন্নত ডিজিটাল পরিকাঠামোও।

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন আদানি। তাঁর মতে, ভারতের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে পৌঁছনোর সুযোগ রাজ্যকে বাড়তি সুবিধা দেয়।

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কলকাতা বন্দর ও হাওড়ার দিকের জাতীয় সড়কের মধ্যে দ্রুত পণ্য পরিবহণের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তা বন্দরনির্ভর শিল্প, লজিস্টিক পরিষেবা এবং বাণিজ্যিক পরিবহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থের জোগান এবং নির্মাণের অগ্রগতির উপর।

আগ্রহ প্রকাশ, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি

নবান্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, আপাতত গঙ্গার নীচে প্রস্তাবিত সড়ক টানেলের দরপত্রে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে আদানি গোষ্ঠী। কিন্তু এই আগ্রহকে প্রকল্পের বরাত পাওয়া বা নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সম্ভাব্যতা, সরকারি অনুমোদন এবং দরপত্রের শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার পরেই পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। আদানি গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত দরপত্রে অংশ নেয় কি না, অংশ নিলে কী ধরনের প্রস্তাব দেয়, সেদিকেও নজর থাকবে।

একদিকে নিউটাউনে হাসপাতাল, অন্যদিকে দার্জিলিংয়ে রোপওয়ে এবং এবার গঙ্গার নীচে সড়ক টানেল—পরিকাঠামো ক্ষেত্রে আদানি গোষ্ঠীর আগ্রহের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলায় এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের ঘোষণার পর এখন বড় প্রশ্ন, এই সম্ভাব্য প্রকল্পগুলির মধ্যে কোনগুলি বাস্তবে রূপ পায় এবং রাজ্যের পরিকাঠামো ও কর্মসংস্থানে কতটা প্রভাব ফেলে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share