মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে শিলিগুড়ি করিডরকে (Siliguri Corridor) আরও সুরক্ষিত করার বড়সড় পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। আগামী চার বছরের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পথকে দেশের অন্যতম নিরাপদ প্রতিরক্ষা করিডরে পরিণত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। চিনের সামরিক তৎপরতা, ডোকলাম সংঘাতের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এই উদ্যোগকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা ও একমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সীমান্তে ভারী কামান ও সেনা পৌঁছতে যেখানে বর্তমানে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে তা কমে মাত্র ৩ ঘণ্টা হতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর?
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই ভূখণ্ডটি পরিচিত ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) নামে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের স্থলপথে যোগাযোগের প্রধান সংযোগস্থল এটি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই এই করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। এর দক্ষিণে বাংলাদেশ, পশ্চিমে নেপাল, উত্তরে ভুটান এবং উত্তর-পূর্বে চিনের চুম্বি উপত্যকা (Chumbi Valley)। ফলে চারটি প্রতিবেশী দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের মাঝে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে প্রতিরক্ষা মহলে।
বিশেষ করে চিনের চুম্বি উপত্যকা থেকে এই করিডরের উপর কৌশলগত নজরদারি সম্ভব। ২০১৭ সালের জুন মাসে ডোকলাম সংঘাতের সময় এই আশঙ্কা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই সিকিম ও শিলিগুড়ি করিডর সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা পরিকাঠামো শক্তিশালী করার জন্য একাধিক প্রকল্প হাতে নেয় কেন্দ্র।
৩৬ কিলোমিটারের ভূগর্ভস্থ রেল সুড়ঙ্গ, শত্রুর আকাশপথের হামলাতেও সচল থাকবে যোগাযোগ
এই সামরিক পরিকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ভূগর্ভস্থ রেল সুড়ঙ্গ নির্মাণের পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত সুড়ঙ্গটি মাটির প্রায় ২০ মিটার গভীর দিয়ে তৈরি করা হবে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার তিন মাইল হাট থেকে শিলিগুড়ির কাছে রাঙাপানি পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এই রেলপথ।
ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের সীমান্তের কাছাকাছি এই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হলে সামরিক পরিবহণে বড়সড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শত্রুপক্ষের বিমান বা ড্রোন হামলার কারণে যাতে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়, সেই লক্ষ্যেই ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারী কামান, সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ এবং প্রয়োজনীয় রসদ দ্রুত সীমান্তবর্তী সেনা ছাউনিতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। অর্থাৎ, আকাশপথে হামলার আশঙ্কা থাকলেও সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার বিকল্প তৈরি হবে।
‘অপারেশন ফোর্ট্রেস শিলিগুড়ি’, ৫৩৪ কোটি টাকায় সাত স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়, শিলিগুড়ি করিডরের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা বলয়কেও নতুন করে সাজানো হচ্ছে। ‘অপারেশন ফোর্ট্রেস শিলিগুড়ি’ (Operation Fortress Siliguri) পরিকল্পনার অধীনে প্রায় ৫৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সাত স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
এই পরিকল্পনায় রয়েছে পাঁচটি ভূগর্ভস্থ কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার, ছয়টি যোগাযোগ কেন্দ্র, ১২টি আকাশ প্রতিরক্ষা ও গোলাবারুদ সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং ১২টি বাঙ্কার বা বোমা আশ্রয়স্থল। প্রস্তাবিত পরিকাঠামোর একটি বড় অংশ মাটির ২০ থেকে ২৪ মিটার গভীরে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উত্তর সিকিমের ১৯ হাজার ফুট উচ্চতায় নাথু লা গিরিপথের কাছে চিনা সেনার উপস্থিতি এবং তিব্বত সীমান্ত বরাবর চিনের নতুন পরিকাঠামো ও বসতি নির্মাণের প্রেক্ষিতে এই নিরাপত্তা বলয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা আকাশপথে সম্ভাব্য হামলার মুখেও সেনাবাহিনীর কমান্ড ব্যবস্থা, যোগাযোগ এবং রসদ সরবরাহ যাতে অক্ষত থাকে।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে চিনের ঘনিষ্ঠতা, বাড়ছে কৌশলগত উদ্বেগ
শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিমালয় সিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, নেপাল, বাংলাদেশ, চিন ও ভুটান দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ায় এই করিডর ভারতের অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ‘সফট স্পট’ বা দুর্বল কৌশলগত অবস্থান। বিশেষ করে চিনের চুম্বি উপত্যকা থেকে এই অঞ্চলের উপর নজর রাখা সম্ভব।
তাঁর মতে, বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে চিন ও বাংলাদেশের যৌথ সমীক্ষা এবং লালমনিরহাটের পুরনো বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগও ভারতের নিরাপত্তা মহলে নজরে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শিলিগুড়ি করিডর ও সিকিম সংলগ্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ সামরিক পরিকাঠামো এবং একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
‘চিকেনস নেক’ থেকে ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’, বদলাচ্ছে সেনার প্রতিরক্ষা কৌশল
শিলিগুড়ি করিডরকে ঘিরে ভারতীয় সেনার প্রতিরক্ষা কৌশলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সামরিক মহলের একাংশের আলোচনায় ‘চিকেনস নেক’-এর পরিবর্তে ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’ (Elephant’s Trunk) নামটিও উঠে আসছে। এর পিছনে রয়েছে করিডর সংলগ্ন এলাকায় একাধিক নতুন সামরিক ঘাঁটি এবং নজরদারি পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
অসমের লাচিত বোরফুকন মিলিটারি স্টেশন পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক পরিকাঠামোর রসদ ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিহারের কিশানগঞ্জে নতুন সামরিক উপস্থিতি পশ্চিম দিকের যোগাযোগপথের উপর নজরদারি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় সেনার উপস্থিতি করিডরের নিরাপত্তা বলয়কে আরও শক্তিশালী করার কৌশলের অংশ।
এর পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (BSF) বিদ্যমান নজরদারি ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে আগে যেখানে করিডরের নিরাপত্তা অনেকটাই একটি সরু ভূখণ্ডের উপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে এখন একাধিক দিক থেকে নজরদারি ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
এস-৪০০, ব্রহ্মস ও রাফাল, চিনের চুম্বি উপত্যকাকে নিশানায় রেখে প্রস্তুতি
শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা শুধু স্থলপথে সেনা মোতায়েনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। পূর্বাঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের রেজিমেন্ট এবং হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে রাফাল যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সামরিক সক্ষমতার অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য চিনের চুম্বি উপত্যকা সংলগ্ন অঞ্চল। ২০১৭ সালের ডোকলাম সংঘাতের সময় যে ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ভারত ও চিনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, সেই অঞ্চলকে মাথায় রেখেই প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনও সড়ক বা রেলপথ অবরুদ্ধ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও উন্নত রেডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমানের সমন্বিত উপস্থিতি প্রতিপক্ষের সামরিক পরিকল্পনাকে অনেক বেশি জটিল করে তুলতে পারে।
বিকল্প যোগাযোগপথ হিসেবে কালাদান প্রকল্প, গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটার কমান্ড
শিলিগুড়ি করিডরের উপর নির্ভরতা কমানোর জন্য বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকেও নজর দিচ্ছে ভারত। মায়ানমারের মধ্য দিয়ে কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প (Kaladan Multi-Modal Transit Transport Project) এবং নতুন রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এর ফলে কোনও সংঘাতের পরিস্থিতিতে শিলিগুড়ি করিডর সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হলেও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহের বিকল্প পথ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও কালাদান প্রকল্পের সম্পূর্ণ কার্যকর হয়ে ওঠার বিষয়টি এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, ভারতের প্রস্তাবিত থিয়েটার কমান্ড ব্যবস্থা কার্যকর হলে এই অঞ্চলের সামরিক পরিচালনাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে করিডরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের নিরাপত্তা এবং সামরিক পরিচালনার দায়িত্ব পৃথক কমান্ড কাঠামোর অধীনে রয়েছে। ভবিষ্যতে চিনকে সামনে রেখে একটি সমন্বিত উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ড গঠিত হলে সেনা, বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় সম্ভব হবে। তবে এই থিয়েটার কমান্ড সংস্কারের জন্য এখনও কেন্দ্রীয় স্তরে চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন।
কেন ২০২৯ ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
সব মিলিয়ে, শিলিগুড়ি করিডরকে ঘিরে ভারতের পরিকল্পনা শুধুমাত্র একটি রেল সুড়ঙ্গ বা কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হল উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রায় চার কোটি মানুষের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সুরক্ষিত রাখা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা মোতায়েনের সক্ষমতা তৈরি করা।
৩৬ কিলোমিটারের ভূগর্ভস্থ রেলপথ, সাত স্তরের প্রতিরক্ষা বলয়, নতুন সামরিক ঘাঁটি, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিকল্প যোগাযোগপথ—সব মিলিয়ে পূর্ব সীমান্তে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
তবে এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার কার্যকারিতার উপর। ২০২৯ সালের মধ্যে লক্ষ্য পূরণ হলে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের সামরিক প্রস্তুতিতে তা নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

Leave a Reply