মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আরব দুনিয়ায় (Middle East) চলমান অশান্তির আবহে ওমান উপকূলে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা। ভয়াবহ ওই হামলায় প্রাণ হারালেন এক ভারতীয় নাবিক (Indian Sailor Death)। আক্রান্ত ‘আল ইউসুফি’ (Al Jusufi) নামের পণ্যবাহী ওই জাহাজটিতে ঘটনার সময় জাহাজটিতে মোট ১৪ জন ভারতীয় নাবিক উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও একজনের মৃত্যু হয়েছে। কেন্দ্রীয় জাহাজ চলাচল মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবর নিশ্চিত করেছেন। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে হামলার তীব্র নিন্দা করেছে ভারত। বিদেশমন্ত্রক (MEA) জানিয়েছে, গত ২ নভেম্বর ওমানের উপকূলের কাছে লিমাহ (Limah) এলাকায় ভারতীয় জাহাজ ‘এমএসভি আল জুসুফি’ (MSV AL JUSUFI)-তে ড্রোন হামলা হয়।
হামলায় মৃত গুজরাটের নাবিক
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিদেশমন্ত্রকের তরফে একটি বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনার কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাহাজে থাকা ১৪ জন ভারতীয়ের মধ্যে ১৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ওমানের কোস্ট গার্ড তাঁদের উদ্ধার করে। আহত অবস্থায় এক ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছে বিদেশমন্ত্রক। পাশাপাশি, ওমানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং উদ্ধার হওয়া ভারতীয়দের পাশাপাশি মৃত নাবিকের দেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ওমান প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বিদেশমন্ত্রক। এই ঘটনায় গুজরাটের বাসিন্দা নাবিক গন্ধর নাহিম আজিজ (Gandhar Nahim Ajij)-এর মৃত্যু হয়েছে বলে জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।
হামলার নিন্দা ভারতের, উত্তেজনা প্রশমনের বার্তা
এই হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে নিশানা করে একের পর এক হামলার ঘটনা অত্যন্ত চিন্তার। অবিলম্বে এই উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে চলতি কূটনৈতিক আলোচনা দ্রুত শেষ করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজার বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিদেশমন্ত্রকের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং অসামরিক পরিকাঠামোর উপর হামলা বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে ওই অঞ্চলের জলপথে অবাধ ও নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল এবং বাণিজ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কারা এই হামলা চালিয়েছে
কে বা কারা এই হামলা চালিয়েছে, কী ধরণের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা প্রাথমিক ভাবে স্পষ্ট নয়। তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা পণ্যবাহী জাহাজগুলি ওমান উপকূল হয়েই চলাচল করে। আন্তর্জাতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ গত কয়েক মাস ধরেই অশান্ত হয়ে রয়েছে। আমেরিকা-ইরান সংঘাতের মাঝে এই জলপথ দিয়ে চলাচল করা একাধিক জাহাজে হামলা হয়েছে। তবে সেগুলি ছিল অন্য দেশের জাহাজ। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে শুরুর দিকে ভারতের পতাকাবাহী জাহাজগুলি মোটের উপর নিরাপদেই হরমুজ এবং সংলগ্ন জলপথ পেরিয়ে আসতে পারছিল। তবে গত কয়েক মাসে বার বার ভারত-সহ বিভিন্ন দেশের পণ্যবাহী জাহাজে হামলা হয়েছে। সোমবারের হামলার পর পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগও দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
পরপর হামলা ভারতীয় জাহাজে
কেন্দ্রীয় জাহাজমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়াল সমাজমাধ্যমে জানান, গান্ধার নাহিম আজিজ নামে ওই নিহত নাবিক গুজরাতের বাসিন্দা। গোলার আঘাতে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। বাকি ১৩ জন নাবিককে নিরাপদে ওই ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ থেকে উদ্ধার করেছে ওমানের উপকূলরক্ষী বাহিনী। মন্ত্রী জানান, নাহিমের দেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ওমানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় দূতাবাস যোগাযোগ রাখছে। বাকি নাবিকদেরও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে দূতাবাস। উল্লেখ্য, গত মে মাসে গোলার আঘাতে ওমান উপকূলের কাছে ডুবে যায় একটি ভারতীয় জাহাজ। ওই হামলারও নিন্দা জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। তার পরে গত জুনেও ওমান উপকূলে ভারতীয় জাহাজের উপরে হামলা হয়েছিল।
ওই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ফেরানোর দাবি
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীকে (Strait of Hormuz) কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে বার বার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। পণ্যবাহী অসামরিক জাহাজে হামলা যাতে কোনও ভাবেই কাম্য নয়, তা স্পষ্ট করেছে নয়াদিল্লি। এই পরিস্থিতির জন্য পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনাকেই দায়ী করে ভারত বিভিন্ন সময়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, কূটনৈতিক পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধানেরই পক্ষপাতী নয়াদিল্লি। ওই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ফেরানো যে জরুরি, তা-ও স্পষ্ট করেছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আরব দুনিয়ার এই সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও পারস্য উপসাগরে জাহাজে হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ২২ জন ভারতীয় নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ১৪ জনই নাবিক। গত মাসে এক সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সমুদ্রপথে নাবিকদের সম্মিলিত নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছিলেন। নয়াদিল্লির বক্তব্য, সমুদ্রপথে নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই জলপথে অস্থিরতা বাড়লে শুধু নাবিকদের জীবন নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহও বিপর্যস্ত হতে পারে।

Leave a Reply