Artemis-II: পাঁচ দশক পরে চাঁদে মানুষ পাঠাল নাসা! চার মহাকাশচারীকে নিয়ে আর্টেমিস ২-এর সফল উৎক্ষেপণ

Artemis-II

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘ পাঁচ দশক পরে চাঁদে মানুষ পাঠাচ্ছে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা। চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি দিল নাসার মহাকাশ-যান। আমেরিকার তিন এবং কানাডার এক মহাকাশচারীকে নিয়ে রওনা দিল ‘আর্টিমিস ২’। ৫৪ বছর পর আবারও পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে গভীর মহাকাশে পা রাখল মানুষ। ‘ইন্টেগ্রিটি’ ক্যাপসুলে যাত্রা শুরু করেছে নাসার ঐতিহাসিক আর্টেমিস-২ মিশন (Artemis-II)। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ (Apollo 17 mission)-এর পর এটাই প্রথম মানববাহী মিশন যা চাঁদের পথে রওনা দিল। ২ এপ্রিল ভোর ৩:৫৪ মিনিটে (ভারতীয় সময়) ফ্লরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বিশাল এসএলএস রকেটটিকে উৎক্ষেপণ করা হয়। পুরো উৎক্ষেপণের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হয়েছে। যেখানে দেখা গিয়েছে, চারজন মহাকাশচারীই নিরাপদে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছেছেন।

কারা পাড়ি দিলেন?

  • রিড ওয়াইসম্যান (কমান্ডার): প্রাক্তন নৌসেনা পাইলট। ১৬৫ দিন মহাকাশে কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
  • ভিক্টর গ্লোভার (পাইলট): নাসার ক্রু-১ অভিযানে সামিল হয়েছিলেন।
  • ক্রিস্টিনা কচ (অভিযান বিশেষজ্ঞ): মহিলা হিসাবে সবচেয়ে বেশি সময় স্পেসফ্লাইট চালিয়েছেন।
  • জেরেমি হানসেন: কানাডিয়ান মহাকাশ সংস্থার মহাকাশচারী। প্রথম বার মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছেন।

একটি ১০-দিনের পরীক্ষামূলক অভিযান

এই চারজন এখন ওরিয়ন ক্যাপসুলে বসে চাঁদের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এই মহাকাশচারীরা মূলত চাঁদের একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য যাচ্ছেন। আর্টেমিস-২ মিশন কোনও অবতরণ অভিযান নয়। এটি একটি ১০-দিনের পরীক্ষামূলক অভিযান। মহাকাশচারীরা ঘণ্টায় প্রায় ৯৬০০ কিলোমিটার বেগে চাঁদের খুব কাছ দিয়ে ভ্রমণ করবে, চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবে এবং তারপর পৃথিবীতে ফিরে আসবে। ফেরার পথে ওরিয়ন ঘণ্টায় ৪০,০০০ কিলোমিটার গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এই সময়ে ওরিয়ন ক্যাপসুলের গভীর মহাকাশে চলার ক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তাপ নিরোধক ব্যবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে।

চাঁদে মানুষের স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি

এর আগে শেষবার ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ অভিযানের মাধ্যমে চাঁদে নভশ্চরদের পাঠানো হয়। ওই অভিযানের পর এবারই প্রথম নতুন করে মানুষ্যবাহী যান চাঁদের অভিমুখে যাত্রা করল। এই মিশনের সাফল্যের পর, নাসার আর্টেমিস-৩ চাঁদে মানুষ অবতরণ করবে। পাশাপাশি চাঁদে মানুষের স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির যাবতীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। এমনকি পরবর্তীতে মঙ্গল অভিযানের ভিত্তিও তৈরি হচ্ছে এই মিশনের মাধ্যমেই।

৬ লক্ষ ৮৫ হাজার পথ ভ্রমণ

নাসা এই বিষয়টি নিয়ে একটি রিল আপলোড করেছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে। সেখানে একটি গ্রাফিক্স ভিডিওর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে পুরো বিষয়টি। সেখানে দেখা গিয়েছে উৎক্ষেপণের পর প্রথমে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরবে ওরিয়ন স্পেসক্রাফ্ট। তারপর সেটি চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছে ফের ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসবে। ওই রিলের ডেসক্রিপশনে নাসা লিখেছে, “আমাদের আর্টেমিস-২ ক্রু চাঁদের আশপাশে যাচ্ছে…কিন্তু তাঁরা সবসময় ঘরে ফিরে আসার পথ খুঁজবেন।” এরপর একটি পৃথিবীর ইমোজি ব্যবহার করা হয়েছে। নাসা জানিয়েছে, চার জন ক্রু সদস্য ৬ লক্ষ ৮৫ হাজার মাইল ভ্রমণ করবেন।

মহাকাশচারীরা কী কী খাবেন

মহাকাশচারীরা কী কী খাবেন তাও জানিয়েছে নাসা (NASA)৷ তাঁদের সঙ্গে থাকবে, কফি, গ্রিন-টি, ম্যাঙ্গো-পিচ স্মুদি, ভ্যানিলা ব্রেকফাস্ট ড্রিঙ্ক, গমের রুটি, ব্রেকফাস্ট সসেজ, ম্যাঙ্গো স্যালাড, আমন্ড, ফুলকপি ইত্যাদি৷

মহাকাশচারীদের কমলা রঙের পোশাক কেন

কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি (সিএসএ) থেকে পাওয়া নভশ্চরদের ছবিতে অনেকের কাছেই প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়েছে তা হলো তাদের উজ্জ্বল কমলা রঙের পোশাক। এই রঙটির আনুষ্ঠানিক নাম ইন্টারন্যাশনাল অরেঞ্জ – যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ডেন গেট ব্রিজের কুয়াশারোধী আবরণের রঙের মতোই। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিখুঁত দৃষ্টি তৈরি করা। বিশাল, অন্ধকার সমুদ্রে, ক্যাপসুলটি অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিফলক কমলা রঙ উদ্ধারকারী বাহিনীকে মুহূর্তের মধ্যেমহাকাশচারীদের সহজে খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। নাসার মতে, এর আলোকীয় কার্যকারিতা ছাড়াও, এই অভিযানে নভোচারীদের পরিহিত কমলা রঙের পোশাকটি ওরিয়ন ক্রু সারভাইভাল সিস্টেম (OCSS) নামেও পরিচিত। এই স্পেসস্যুটটি প্রত্যেক মহাকাশচারীর শরীরে নিখুঁতভাবে ফিট হওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং এটি এমন সব প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যে সজ্জিত যা উৎক্ষেপণের দিনে, জরুরি পরিস্থিতিতে, চাঁদের কাছাকাছি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের সময় নভশ্চরদের সুরক্ষা দেয় এবং পৃথিবীতে দ্রুত প্রত্যাবর্তনে সহায়তা করে। এছাড়াও, নাসার মতে, যদি গভীর মহাকাশে কোনো ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাতে ওরিয়ন মহাকাশযানের ক্যাপসুলটি হঠাৎ ছিদ্র হয়ে যায় এবং এর ভেতরের চাপ সম্পূর্ণ চলে যায়, তাহলে ওসিএসএস স্যুটটি সঙ্গে সঙ্গে স্ফীত হয়ে একটি ব্যক্তিগত জীবনরক্ষাকারী ক্যাপসুলে পরিণত হবে। এতে একটি স্বাধীন অক্সিজেন সরবরাহ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে, যা মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফিরে না আসা পর্যন্ত শূন্যস্থানে টানা ছয় দিন নভোচারীদের জীবন টিকিয়ে রাখতে সক্ষম।

চাঁদের সব থেকে দূরবর্তী অংশে মহাকাশচারীরা

চার জনের মহাকাশচারী দলটি এখন বেশ কয়েকদিন ধরে চাঁদের দিকে নিজেদের যাত্রা অব্যাহত রাখবে। তারা চাঁদের সব থেকে দূরবর্তী অংশের উপর দিয়েও যাবে, যেখানে পৃথিবীর সঙ্গে রেডিও কানেকশন সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এই যাত্রাপথে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। প্রায় ১০ দিন পর, ওরিয়ন ক্যাপসুলটি প্যারাসুটের সাহায্যে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে। এর আগে একাধিকবার আর্টেমিস ২ (Artemis II) মিশন বাতিল হয়ে যায় ৷ মূলত প্রতিকূল আবহাওয়া তারমধ্যে অন্যতম কারণ ছিল ৷ লঞ্চ প্যাডের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল ৷ সেই কারণে বাতিল হয় এই অভিযান ৷ এর সঙ্গে যান্ত্রিক গোলযোগও ছিল ৷ তবে এবার উৎক্ষেপণ সফল হয়েছে৷

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share