মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আবহে বড় সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্রীয় সরকার। পেট্রোল-ডিজেলে (Petrol-Diesel) কমানো হল অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক বা স্পেশাল অ্যাডিশনাল এক্সাইজ ডিউটি (Special Additional Excise Duty)। অন্য সময়ে এই আবগারি শুল্ক কমানো হলে, পেট্রোল পাম্পগুলিতে ভিড় লেগে যেত। দাম কমে যেত পেট্রোল-ডিজেলের। তবে এবার ব্যতিক্রম। আজ, শুক্রবার (২৭ মার্চ) কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রোলের উপরে স্পেশাল অ্যাডিশনাল এক্সাইজ ডিউটি কমিয়ে প্রতি লিটারে ৩ টাকা করা হয়। ডিজেলের উপরে এই আবগারি শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে। মোট ১০ টাকা করে শুল্ক কমানো হয়েছে। মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর পেট্রলের উপর চাপানো শুল্ক ১৩ টাকা থেকে কমে দাঁড়াল ৩ টাকা।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাগাতার বৃদ্ধি
পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার কারণে বর্তমানে ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৪৯ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। বিশ্ববাজারে গত কয়েক সপ্তাহে তেলের দাম লাগাতার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ভারতের অয়েল মার্কেটিং সংস্থাগুলি পেট্রোল-ডিজেলের দাম বিশেষ একটা বাড়ায়নি। দাম বেড়েছে প্রিমিয়াম জ্বালানির। এছাড়া নায়ারা এনার্জি তাদের পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে। এই আবহে কেন্দ্রের আবগারি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত।
দেশে বাড়বে না জ্বালানির দাম!
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, রিটেল প্রাইজ অর্থাৎ যে দামে সাধারণ মানুষ পেট্রোল-ডিজেল কেনে, তা কমানোর বদলে আবগারি শুল্ক কমানো হয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে অয়েল মার্কেটিং সংস্থাগুলিকে সুরক্ষা দিতেই। এতে জ্বালানির দাম কমার বদলে বরং যে দাম বর্তমানে রয়েছে, তা যাতে আর না বাড়ে, তার চেষ্টাই করা হবে। নায়ারা এনার্জির পেট্রোল-ডিজেলের দাম বৃদ্ধিও সেই কারণেই হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায়, দেশীয় সংস্থাগুলির উপরেও চাপ বাড়ছে। তবে সরকারের এই আবগারি শুল্ক ছাড় দেওয়ায় আপাতত আর জ্বালানির দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই।
কেন এই সিদ্ধান্ত
বিভিন্ন সূত্রে খবর, অন্তঃশুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তে সরাসরি সাধারণ মানুষের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কমই। দেশের তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলি (ওএমসি)-র ক্ষতি লাঘব করতে এই সিদ্ধান্ত। এর ফলে সরকার রাজস্বও হারাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতীয় সংস্থাগুলি যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার উপর সরকার অন্তঃশুল্ক নেয়। গত বছরই সেই শুল্ক বাড়িয়েছিল মোদি সরকার। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। তবে ভারতের বাজারে এখনও পর্যন্ত সাধারণ পেট্রল, ডিজেলের দাম বাড়েনি। এর ফলে ভারতীয় সংস্থাগুলিকে অনেকটাই ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সেই ক্ষতির ধাক্কা সামলে নিতেই অন্তঃশুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
জনগণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত
কেন অন্তঃশুল্ক কমানোর পথে হাঁটল সরকার? কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী জানিয়েছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারে কাছে দু’টি পথ খোলা ছিল। এক, অন্য দেশের মতো ভারতে পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। আর দুই, আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়ে দেশবাসীকে মূল্যবৃদ্ধির থেকে রক্ষা করা। মোদি সরকার দ্বিতীয় পথটা বেছে নিয়েছে বলে জানান পুরী। ইরান-ইজরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধের আবহে আন্তর্জাতিক বাজারে চড়চড় করে বাড়তে পারে পেট্রোল ডিজেলের দাম। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চড়তে পারে দেশের মধ্যেও জ্বালানির দর। তবে এই মুহূর্তে এই কোপ যাতে দেশের মানুষের ঘাড়ে না পড়ে, তার জন্য বড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্র। আর তার জেরে কমে যেতে পারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম! মনে করা হচ্ছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম উত্তুঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্তি মিলবে। না কমলেও থিতু থাকতে পারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম।
কমল বিমানের জ্বালানির দামও
পেট্রোল-ডিজেলের সঙ্গেই এভিয়েশন টার্বাইন ফুয়েলের উপর অন্তঃশুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। প্রতি লিটারে ৫০ টাকা অন্তঃশুল্ক কমে হল ২৯ টাকা ৫০ পয়সা। জ্বালানির দাম বাড়ায় যাতে বিমানের টিকিটের দাম না বাড়ে, সেদিকে তাকিয়ে পদক্ষেপ কেন্দ্রের। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহণ খরচে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে শুল্ক কমিয়ে সরকার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করছে।
গ্যাসের সংকটও হবে না
ইরানের উপর আমেরিকা-ইজরায়েলের হামলা এবং তেহরানের প্রত্যাঘাতের আগে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকেরও বেশি সৌদি আরব ও ইউএই-র মতো পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে আসত। তবে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ রেখেছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। কয়েকটি দেশের জাহাজ পারাপারের ‘অনুমতি’ দিয়েছে ইরান। সেই তালিকায় রয়েছে ভারতের কয়েকটি জাহাজও। তবে উৎকণ্ঠা কাটছে না। এরই মধ্যে মোদি সরকার বার বার আশ্বস্ত করছে, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল বা গ্যাস মজুত রয়েছে। ভারতে কত দিনের তেল এবং গ্যাস মজুত রয়েছে, তার পরিসংখ্যানও দিয়েছে কেন্দ্র। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, দেশে যা অশোধিত তেল মজুত রয়েছে, তা দিয়ে ৬০ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। এই সময়ের মধ্যে বিশ্বে বড় কোনও সঙ্কট হলেও তেলের জোগান ব্যাহত হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে। এ-ও জানানো হয়েছে, আমেরিকা, রাশিয়ার মতো দেশ থেকে গ্যাসবাহী জাহাজ খুব শীঘ্রই ভারতের বন্দরগুলিতে ঢুকবে। ইতিমধ্যেই ৮০০ হাজার মেট্রিক টন গ্যাস আমদানি সুনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। সে ক্ষেত্রে এক মাস পরেও গ্যাসের সঙ্কট হবে না।

Leave a Reply