মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: সোমবারই ভারতে এসে পৌঁছেছিল শিবালিক নামক এলপিজি ট্যাঙ্কার (LPG Tanker Reached India)। গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দরে সেই জাহাজটি এসে পৌঁছায়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে এটি ভারতের উপকূলে এসে পৌঁছেছে। আর মঙ্গলবার ‘নন্দাদেবী’ নামক আরও একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে ভারতে এসে পৌঁছল। এই জাহাজটিও এলপিজি বহন করছে বলে জানা গিয়েছে। জানা গিয়েছে, এই দুটি জাহাজকে এসকর্ট করে নিয়ে এসেছে ভারতীয় নৌবাহিনী। পেট্রোলিয়ম মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা সংকটের মধ্যেও দুই ভারতীয় এলপিজি ট্যাঙ্কার সফলভাবে প্রণালী অতিক্রম করেছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতির ফলে এই যাত্রা সম্ভব হয়েছে।
বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তায় ভারতীয় যুদ্ধ জাহাজ
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালীতে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় নৌবাহিনী তিনটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে অত্যাধুনিক গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার আইএনএস সুরাটসহ দুটি জাহাজ আগে থেকেই ওই অঞ্চলে ছিল। তৃতীয় একটি যুদ্ধজাহাজ বিশেষভাবে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে ভারতমুখী পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় নৌজাহাজগুলি ওমান উপসাগর এবং আরব সাগর জুড়ে টহল দিচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য সম্ভাব্য হুমকিকে প্রতিরোধ করা এবং জ্বালানি বহনকারী জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আসছে আরও একটি জাহাজ
শিবালিক এবং নন্দাদেবী নামক দুটি ট্যাঙ্কারই ভাড়া করেছিল ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন। এবং এই দুটি জাহাজই ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা শিপিং কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার মালিকানাধীন। এদিকে ‘জগ লড়কি’ নামক আরও একটি ট্যাঙ্কার শীঘ্রই ভারতে এসে পৌঁছানোর কথা। এটিও হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতে আসছে। গুজরাটের মুন্দ্রা বন্দরে যাওয়ার কথা এই ট্যাঙ্কারের। এই জাহাজটি ৮১ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বহন করছে।
কূটনৈতিক আলোচনার ফলেই কাজ
জানা গিয়েছে, ভারত ও ইরানের মধ্যে নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনার ফলেই এই দুই জাহাজের নিরাপদ যাত্রা সম্ভব হয়েছে। তবে সব জাহাজের জন্য একযোগে কোনও ছাড় দেওয়া হয়নি। প্রতিটি জাহাজের যাত্রা আলাদাভাবে আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, “এটি কোনও বিনিময়ের বিষয় নয়। ভারত ও ইরানের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে। কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবে প্রতিটি জাহাজের বিষয় আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে।” এই সংকটকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক স্তরেও তৎপরতা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন।
আমেরিকার অদ্ভুত দাবি
হরমুজ প্রণালীতে এখনও আটকে শ’য়ে শ’য়ে ট্যাঙ্কার এবং জাহাজ। ইরান বলছে, আমেরিকা এবং ইজরায়েলের সঙ্গে যোগ না থাকা কোনও জাহাজ তারা আটকাবে না। এদিকে আমেরিকা আবার এর ফাঁকেও ব্যবসার ফন্দি এঁটেছিল। মিত্র দেশগুলির কাছে আমেরিকার প্রস্তাব ছিল, টাকা দিলেই মার্কিন নৌসেনা এসকর্ট করে তাদের দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার করিয়ে দেবে। এরই সঙ্গে সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়, হরমুজ প্রণালী থেকে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে যেতে দিচ্ছে ইরান। এই আবহে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট দাবি করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে ভারতের নিশ্চয় কোনও চুক্তি হয়েছে এবং বিনিময়ে ইরান ‘কিছু পাবে।’ যদিও মার্কিন কর্মকর্তার এহেন দাবিকে উড়িয়ে দেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিজে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী এখনও অধিকাংশ দেশের জন্য খোলা রয়েছে। তবে চলমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও তাদের মিত্রদের জাহাজের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর অবস্থান
পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালী। তার ফলে ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো পারস্য উপসাগর লাগোয়া বিশ্বের অন্যতম তৈল উৎপাদনকারী দেশগুলি তেল সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালীর উপরে নির্ভর করে। হরমুজ প্রণালী খুব চওড়া নয়। সংকীর্ণতম বিন্দুতে মাত্র ৩৩ কিমি চওড়া। ফলে সেই প্রণালী আটকে রাখা সহজ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহণ হয়। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা বিশ্ববাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ থাকায় ভারতীয় নৌবাহিনীর এই নিরাপত্তা অভিযান আগামী দিনেও চলবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতের কাছে জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের নিরাপত্তা এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কী বললেন বিদেশমন্ত্রী
হরমুজ প্রণালীতে ভারতের তেল এবং পণ্যবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলে সম্পূর্ণ ছাড় দেয়নি ইরান। প্রত্যেক জাহাজ ভিত্তিক আলাদা করে আলোচনা চলছে ইরানের সঙ্গে। এমনটাই জানালেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে ভারতের। প্রতিটি জাহাজ নিয়ে আলাদা করে আলোচনা হচ্ছে। তবে ট্রাম্পের আবেদন মেনে হরমুজ প্রণালীকে ইরানের দখলমুক্ত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না ভারত। এ বিষয়ে আমেরিকার সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি বলেও জানিয়েছে নয়াদিল্লি। পরিস্থিতি আপাতত স্বাভাবিক করতে ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার উপরই জোর দেবে ভারত। দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক। জানা গিয়েছে, গ্যাস সংকটে বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই পিএনজি বা পাইপ দ্বারা সরবরাহ প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহারে জোর দিচ্ছে কেন্দ্র। মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, দেশের যে সকল এলাকায় পাইপের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে, সেই সকল এলাকার বাসিন্দাদের কাছে এলপিজির পরিবর্তে পিএনজি ব্যবহার করতে হবে।

Leave a Reply