মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারত সফরে আসছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা (Luiz Inácio Lula da Silva)। আগামী ১৮ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (President Lula PM Modi Meet) সঙ্গে দেখা করার জন্য দিল্লি আসছেন লুলা। তাঁর সঙ্গে থাকছে ব্রাসিলিয়ার ২৬০টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির প্রতিনিধিদল ও ১৪ জন মন্ত্রিসভার সদস্য। ভারত সফরে এটাই হবে ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রতিনিধিদল, যা এই সফরের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিকটি তুলে ধরছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, ২১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং প্রেসিডেন্ট লুলার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি এই সফরের মূল আকর্ষণ হতে চলেছে। দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের (President Lula in India) সমস্ত দিক পর্যালোচনা করবেন এবং ভারত-ব্রাজিল কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার উপায় খুঁজবেন। সঙ্গে থাকা মন্ত্রীরা তাঁদের ভারতীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রাজিল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কী নিয়ে আলোচনা
২১ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রেসিডেন্ট লুলার মধ্যে শীর্ষ বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। সেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হবে। আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, শক্তি (নবায়নযোগ্য সহ), কৃষি, স্বাস্থ্য ও ওষুধ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, বিরল খনিজ পদার্থ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) ও এআই-এর ক্ষেত্রে সহযোগিতা, মহাকাশ এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। দুই নেতা পারস্পরিক স্বার্থের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়, বহুপাক্ষিক ফোরামে সহযোগিতা, সংস্কারকৃত বহুপাক্ষিকতা, বিশ্বব্যাপী শাসন এবং গ্লোবাল সাউথের সমস্যা নিয়েও মতবিনিময় করবেন। রাষ্ট্রসংঘ সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুই দেশের মতামত একই।
কূটনৈতিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট
এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গত জুলাই ২০২৫-এ ব্রাসিলিয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র সঙ্গে প্রেসিডেন্ট লুলার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় দিল্লি সফরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে ব্রাজিল সরকার। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, এই সফরে প্রেসিডেন্ট লুলা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেবেন। প্রসঙ্গত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শীর্ষ বৈঠকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, নীতিনির্ধারক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন। বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার, তথ্য সুরক্ষা, উদ্ভাবন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। ভারত এই ক্ষেত্রকে ভবিষ্যতের বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে। দিল্লিতে নিরাপত্তা ও প্রোটোকল সংক্রান্ত প্রস্তুতিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে অংশগ্রহণ
সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ১৯–২০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় “এআই ইমপ্যাক্ট সামিট”-এ প্রেসিডেন্ট লুলার অংশগ্রহণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল উন্নয়নে দুই গণতান্ত্রিক দেশের অভিন্ন আগ্রহ এই অংশগ্রহণে প্রতিফলিত হবে। ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় সংস্থাগুলির সিইও-রা এই সফরে আয়োজিত একটি বিজনেস ফোরামে অংশ নেবেন, যা ভারত ও ব্রাজিলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে। বর্তমানে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ব্রাজিল ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও রেয়ার আর্থ, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, ওষুধশিল্প এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিপুল সম্ভাবনা দেখছেন দুই দেশের নীতিনির্ধারকরা।
দ্রৌপদী মুর্মু-র সঙ্গেও সাক্ষাৎ লুলার
এটি হবে প্রেসিডেন্ট লুলার ষষ্ঠ ভারত সফর এটি। তিনি প্রথমবার ২০০৪ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভারত সফর করেন এবং শেষবার ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য ভারতে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রেসিডেন্ট লুলা প্রায়শই সাক্ষাৎ করেছেন। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০২৫ সালের ৭-৮ জুলাই ব্রাসিলিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়েছিলেন, যা ছিল ৫৭ বছরের মধ্যে কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। দুই নেতা ২০২৫ সালের নভেম্বরে জোহানেসবার্গে জি২০ সম্মেলনের সময়ও দেখা করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট লুলা ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু-র সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। তাঁর সম্মানে রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হবে।
কাছে আসছে ভারত ও ব্রাজিল
আমেরিকার শুল্ক বসানোর পর থেকেই পৃথিবীতে নতুন অক্ষ তৈরি হতে শুরু করেছে। আর এমন পরিস্থিতিতেই কাছে এসেছে ভারত এবং ব্রাজিল। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা জানান, ভারত এবং ব্রাজিলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান রয়েছে। ব্রাজিলিয়ানরা ভালোবাসে ভারতীয়দের। আর ভারতীয়রা ভালোবাসে ব্রাজিলকে। তাই একটা শক্ত পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠতেই পারে বলে তিনি মনে করেন। গত বছরে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকায় দুই রাষ্ট্রপ্রধানের সাক্ষাতের পরে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষার পাশাপাশি কৃষি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও দুই দেশের জনগণের মধ্যে সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার। সেই সমস্ত ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হবে লুলা ও মোদির। বিদেশ মন্ত্রকের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘ভারত ও ব্রাজিলের সম্পর্ক বহু দশকের। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি গবেষণা, স্বাস্থ্য এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে। এই সফর সেই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।’

Leave a Reply