মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ঘূর্ণিঝড় দিটওয়ার (Cyclone Ditwah) তাণ্ডবে লন্ডভন্ড শ্রীলঙ্কা। প্রবল বর্ষণ, ভূমিধসের কারণে ভয়াবহ পরিস্থিত দ্বীপরাষ্ট্রে। ইতিমধ্যেই ঘূর্ণিঝড় প্রাণ কেড়েছে ৬৯ জনের। নিখোঁজ অন্তত ৩৪। প্রতিবেশী দেশের সংকটে পাশে দাঁড়িয়ে ‘অপারেশন সাগর বন্ধু’ (Operation Sagarbandhu ) শুরু করেছে ভারত (India Sri Lanka) । এবার ঘূর্ণিঝড় ভারতের উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। রবিবার ভোরে ঘূর্ণিঝড়টি তামিলনাড়ু–পুদুচেরি–দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশের কাছে আছড়ে পড়তে পারে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে সতর্কতা জারি করে দিয়েছে মৌসম ভবন। ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে ঝড়বৃষ্টিও। তামিলনাড়ুর কয়েকটি জেলায় লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
দিটওয়ায় বিধ্বস্ত শ্রীলঙ্কা
গত সপ্তাহ থেকে প্রতিকূল পরিবেশের ধাক্কায় বিধ্বস্ত হতে শুরু করে প্রতিবেশী দেশটি। কিন্তু পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে বৃহস্পতিবার থেকে। একটানা ভারী বর্ষণে পথঘাট জলের তলায় চলে যায়। ঘরবাড়ি, খেত, রাস্তা সবই ডুবে যায়। সেই সঙ্গে ভূমিধসেও প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের আকাশে ঘূর্ণিঝড় দিটওয়া পুঞ্জীভূত হতে শুরু করে। শুক্রবার শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। যার জেরে ব্যাপক ভূমিধস হয় গোটা দেশজুড়ে। গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের পূর্ব ও মধ্য অংশ। সাম্প্রতিককালে প্রকৃতির এমন ভয়াল রোষ দেখেনি সিংহলিরা।
প্রতিবেশীর পাশে ভারত
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দিকে ইতিমধ্যেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শ্রীলঙ্কায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে এত মানুষের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করে এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, “ঘূর্ণিঝড় দিটওয়ার প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় যাঁরা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা জানাই। দুর্যোগের জেরে আহত, ঘরছাড়া মানুষদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। ‘অপারেশন সাগর বন্ধু’ অভিযানে নেমেছে ভারত। জলসীমার সব চেয়ে কাছে থাকা প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে ভারত। আমরা আরও ত্রাণ ও সহযোগিতা পাঠাতে প্রস্তুত। শ্রীলঙ্কার বিপদে ভারত সর্বক্ষণ পাশে আছে।” বিদেশমন্ত্রী এস জয় জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আইএনএস বিক্রান্ত এবং আইএনএস উদয়গিরি শ্রীলঙ্কার উপকূলে পৌঁছে গিয়েছে। আগামী দিনে আরও ত্রাণসামগ্রী ভারতের তরফে পাঠানো হবে।
বহুদিন পর এমন দুর্যোগ দ্বীপরাষ্ট্রে
শ্রীলঙ্কার (India Sri Lanka) বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর জানিয়েছে, প্রায় ৪৩,৯৯১ জনকে উদ্ধার করে স্কুল-কলেজে এনে রাখা হয়েছে। এখনও বেড়ে চলেছে জলের স্তর। রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমারা দিশানায়েকে প্রশাসনিক আধিকারিকদের তৎপরতার সঙ্গে উদ্ধার ও ত্রাণ কাজ চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের বাজেটের অধীনে ১.২ বিলিয়ন টাকা তাৎক্ষণিক তহবিল প্রদান এবং ৩০ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ করেছেন। প্রশাসনিক বিলম্ব এড়াতে একটি নতুন সার্কুলার জারি করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা সদর দফতরে একটি নির্দিষ্ট ইউনিট এবং দশটি জরুরি হটলাইন চালু করা হয়েছে। এদিকে, ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। রাজধানী কলম্বোর প্রধান রাস্তাগুলিও জলমগ্ন। সাউথ এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশে চলাচল বন্ধ রয়েছে। দৃশ্যমানতা কম থাকার কারণে একাধিক উড়ান তিরুঅনন্তপুরম, কোচিন এবং মাত্তালায় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতির রোষে ইতিমধ্যেই বিধ্বস্ত ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের মতো দক্ষিণপূর্ব এশীয় দেশগুলি। মালয়েশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৯৪ জন। থাইল্যান্ডের দক্ষিণাংশে হারিয়েছেন ১৪৫ জন।
ভারতের দিকে দিটওয়া
মৌসম ভবন জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝ়ড় দিটওয়া (Cyclone Ditwah) শ্রীলঙ্কার উপকূল ধরে উত্তর-উত্তর পশ্চিম দিকে এগোচ্ছে। গত ছ’ঘণ্টায় তার গতি কিছুটা বেড়েছে। ঘণ্টায় আট কিলোমিটার বেগে ভারতের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড়। দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করার পর ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি আরও খানিকটা বাড়তে পারে। মৌসম ভবনের আধিকারিক মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, শনিবার থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত তামিলনাড়ু ও পুদুচেরীর উপকূলে ঝড়ের গতি হতে পারে সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার। দমকা হাওয়ার বেগ পৌঁছে যেতে পারে ৯০ কিলোমিটারেও। এর ফলে প্রবল বৃষ্টি হবে দক্ষিণ ভারতের উপকূলে। নিচু এলাকায় প্লাবনের আশঙ্কাও রয়েছে। ইতিমধ্যে তামিলনাড়ু, পুদুচেরী এবং অন্ধ্রপ্রদেশে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মোতায়েন রয়েছে রাজ্য ও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। ১ ডিসেম্বর থেকে ঝ়ড়বৃষ্টি কিছুটা কমবে।
বাংলায় দিটওয়ার প্রভাব
দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়ের (Bay of Bengal) কোনও প্রভাব সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের উপর পড়ছে না। তবে তাপমাত্রা বেশ খানিকটা বেড়েছে। কিছু দিন আগে কলকাতার তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। শনিবার শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৭.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, স্বাভাবিকের চেয়ে ০.২ ডিগ্রি কম। শুক্রবারের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৮.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি কম। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী চার দিন উত্তর বা দক্ষিণবঙ্গের তাপমাত্রায় খুব একটা হেরফের হবে না। সর্বত্র শুকনো আবহাওয়া থাকবে। ঘূর্ণিঝড়ের রেশ কাটলে আবার দুই থেকে তিন ডিগ্রি নামতে পারে পারদ।

Leave a Reply