মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বেলডাঙায় অশান্তির (Beldanga Violence) ঘটনার তদন্ত করবে এনআইএ ৷ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সূত্রে এই খবর জানা গিয়েছে ৷ ঝাড়খণ্ডে কাজ করতে গিয়ে কয়েক দিন আগে খুন হন মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার এক পরিযায়ী শ্রমিক ৷ তাঁর মৃত্যুর খবর এসে পৌঁছতেই অশান্ত হয়ে ওঠে এলাকা ৷ দীর্ঘ দু’দিন ধরে অশান্তি হয় ৷ এরপর পরিস্থিতি খানিক নিয়ন্ত্রণে আসে ৷ এবার এই ঘটনার তদন্তভার এনআইএ-কে দিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ৷ কেন টানা দু’দিন বেলডাঙায় অশান্তি হল, তা পরিকল্পিত ছিল কি না, কেন্দ্রীয় সংস্থা তা যাচাই করে দেখবে।
এনআইএ-র প্রতিনিধিদলে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ
শনিবার সকালেই কেন্দ্রীয় সংস্থার ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল বেলডাঙা থানায় পৌঁছে গিয়েছে। সূত্রের খবর, ইতিমধ্যে এনআইএ-র কাছে এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা পাঠিয়ে দিয়েছেন অমিত শাহ। তদন্তকারীরা থানায় কেস ডায়েরি এবং অন্যান্য নথি খতিয়ে দেখছেন তাঁরা। এখনও পর্যন্ত বেলডাঙার ঘটনায় চারটি পৃথক মামলা রুজু হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে মূল অভিযুক্ত-সহ ৩৬ জনকে। এনআইএ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে। এনআইএ-র প্রতিনিধিদলে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরাও আছেন। সূত্রের খবর, সাত থেকে আট সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে।
কী ঘটেছিল বেলডাঙায়
ঝাড়খণ্ডে মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুর খবরে অশান্ত হয়ে উঠেছিল বেলডাঙা। গত ১৬ জানুয়ারি আলাউদ্দিনের দেহ সেখানে পৌঁছোতেই সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামেন। ভিন্রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। অভিযোগ, বাঙালি হওয়ায় বাংলাদেশি সন্দেহে হত্যা করা হয়েছে আলাউদ্দিনকে। তার পর তাঁর দেহ ঘরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও ঝাড়খণ্ডের পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে। প্রাথমিক ভাবে ওই যুবক আত্মহত্যা করেছেন বলেই দাবি করা হয়। তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে ১৬ তারিখ জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষোভকারীরা। টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। এমনকি, বিক্ষোভে ব্যাহত হয় শিয়ালদহ-লালগোলা ট্রেন চলাচলও।
পরিকল্পিত ভাবে অশান্তি বেলডাঙায়
বেলডাঙায় (Beldanga Violence) সে দিন আক্রান্ত হয়েছিলেন এক মহিলা সাংবাদিক। প্রথম দিন পুলিশ বিক্ষোভ সরালেও পরের দিন সকাল থেকে বেলডাঙা ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ পরে আদালতে দাবি করেছে, বেলডাঙার প্রথম দিনের বিক্ষোভ কিছুটা হলেও ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু দ্বিতীয় দিন পরিকল্পিত ভাবে সেখানে অশান্তি করা হয়। রাস্তা অবরোধ এবং ট্রেন আটকে দেওয়ায় বহু মানুষ ভোগান্তির শিকার হন। এই সংক্রান্ত মামলায় হাইকোর্ট জানিয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকার যদি চায়, এনআইএ-কে দিয়ে বেলডাঙার ঘটনার তদন্ত করাতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনে কেন্দ্রের কাছ থেকে আরও বাহিনী চাইতে পারবে রাজ্য। তার পরেই তদন্তভার কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে তুলে দিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
পিএফআই আর সিমি-র মতো নিষিদ্ধ সংগঠন জড়িত
এ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন বঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ৷ তাঁরা দুজনেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ৷ এ প্রসঙ্গে শুভেন্দু বলেন, “এর আগেও মুর্শিদাবাদে হিংসার ঘটনা ঘটেছিল ৷ সে সময় আমি কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছিলাম ৷ তাতে আদালত যে নির্দেশ দিয়েছিল তা এখনও বহাল হয়েছে ৷ কিন্তু জেলা প্রশাসন সেই নির্দেশ মানেনি ৷ এরপর আবারও বেলডাঙায় হিংসার ঘটনা ঘটে ৷ এনআইএ এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে ৷ আমি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই ৷ বেলডাঙায় যা হয়েছে সেটা প্রতিবাদ নয়, দেশ বিরোধী আচরণ ৷ পিএফআই আর সিমি-র মতো নিষিদ্ধ সংগঠন এই অশান্তির নেপথ্যে আছে ৷”
খুন নয় আত্মহত্যাই
ঝাড়খণ্ডে গত সপ্তাহে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় যে হিংসাত্মক বিক্ষোভ ছড়িয়েছিল, সেই পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখ আত্মহত্যাই করেছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। মৃত শ্রমিকের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের তদন্তে খুন বা কোনও ধরনের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মেলেনি বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের এক বিবৃতিতে শনিবার জানানো হয়েছে, আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুর পর তদন্তের অংশ হিসেবে এক সাব-ইন্সপেক্টর ঝাড়খণ্ডের পালামুতে গিয়েছিলেন। সেখানে ওই এলাকায় বসবাসকারী ৮ থেকে ১০ জন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের বয়ান নেওয়া হয়। তবে তাঁদের কেউই খুনের কোনও ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেননি বলে জানিয়েছে পুলিশ। বিজেপির দাবি, বেলডাঙার হিংসা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। বিজেপি নেতা অমিত মালব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে অভিযোগ করেন, এই অশান্তি স্বতঃস্ফূর্ত নয় এবং এর নেপথ্যে রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, কারা উপকৃত হল এবং কেন প্রশাসন সময়মতো পদক্ষেপ নিল না।
সঠিক তদন্ত করবে এনআইএ, প্রকাশ্যে আসবে সত্য
কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তথা রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, “আমরা সকলে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই ৷ সেদিন যেভাবে হিংসার ঘটনা ঘটেছিল তার থেকে স্পষ্ট এর নেপথ্যে কোনও বড় চক্রান্ত ছিল ৷ এনআইএ রাজ্য পুলিশের আওতার বাইরে ৷ আমি আশা করি, তারা সঠিক তদন্ত করে লুকিয়ে থাকা সত্যটা প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে পারবে ৷ ” বেলডাঙার অশান্তির ঘটনার তদন্তভার এনআইএ গ্রহণ করতেই রাজ্য পুলিশের কাছেও পৌঁছেছে একটি নির্দেশ। শুক্রবার পুলিশকে বিশেষ এনআইএ আদালতের নির্দেশ, অশান্তির ঘটনা সংক্রান্ত সমস্ত নথি যত দ্রুত সম্ভব কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের হাতে তুলে দিতে হবে।

Leave a Reply