মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আজ, সোমবার (২৯ জুন), শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের পবিত্র স্নানযাত্রা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসবকে দেবস্নান পূর্ণিমা বা স্নান পূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়। প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালিত হলেও, এ বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে মলমাস (অধিক মাস) পড়ায় আষাঢ় মাসের পূর্ণিমাতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে মহাপ্রভুর স্নানযাত্রা। ওড়িশার পুরী জগন্নাথধাম থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মাহেশ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আজ ভক্তিভরে পালিত হচ্ছে এই বিশেষ উৎসব। তবে ঐতিহ্য, আচার এবং জাঁকজমকের নিরিখে সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে। ফলে সারা বিশ্বের জগন্নাথভক্তদের নজর এখন পুরীতেই।
স্নান পূর্ণিমার তিথি
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, পূর্ণিমা তিথি শুরু হয়েছে সোমবার ভোর-রাত ৩টা ৮ মিনিটে এবং শেষ হবে মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২৭ মিনিটে। অন্যদিকে, গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুসারে পূর্ণিমা তিথি শুরু হয়েছে সোমবার ভোর-রাত ২টো ৪৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে এবং শেষ হবে মঙ্গলবার ভোর ৪টে ৪৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই তিথি অত্যন্ত পবিত্র। তাই এদিন বহু মানুষ পূজা-পাঠ, দান-ধ্যান, ব্রত পালন এবং বিভিন্ন শুভ কাজ সম্পন্ন করেন।
স্নানযাত্রা থেকেই শুরু রথযাত্রার প্রস্তুতি
জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রাকে রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা বলেই মনে করা হয়। যদিও তারও আগে চন্দনযাত্রার মাধ্যমে শুরু হয় প্রস্তুতি পর্ব, তবুও স্নানযাত্রার পর থেকেই কার্যত শুরু হয়ে যায় রথযাত্রার কাউন্টডাউন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে মানুষের মতোই কষ্ট পান মহাপ্রভু জগন্নাথ। তাই গরমের সময় তাঁর কপালে চন্দনের প্রলেপ দেওয়া হয়, যা চন্দনযাত্রা নামে পরিচিত। বর্ষার সূচনালগ্নে সেই পর্ব শেষ করে পালিত হয় স্নানযাত্রা।
১০৮ কলস সুগন্ধি জলে মহাপ্রভুর মহাস্নান
স্নানযাত্রার দিন শ্রীমন্দিরের স্নানবেদীতে বিশেষ বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র এবং দেবী সুভদ্রাকে ১০৮টি পবিত্র কলসে ভরা সুগন্ধি জল দিয়ে স্নান করানো হয়। প্রথমে শ্রীজগন্নাথ, তারপর বলভদ্র এবং সবশেষে দেবী সুভদ্রার পূজা সম্পন্ন করে তাঁদের মহাস্নানের আয়োজন করা হয়। স্নান সম্পন্ন হওয়ার পর তিন দেবদেবীকে বিশেষ গজবেশে সজ্জিত করা হয়, যা ভক্তদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। স্কন্দপুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠার পর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নই এই স্নানযাত্রা উৎসবের প্রচলন করেন।
কেন জ্বরে আক্রান্ত হন জগন্নাথদেব?
স্নানযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বিশেষ ধর্মীয় বিশ্বাস। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বছরে একবার ১০৮ কলস জল দিয়ে মহাস্নানের পর মহাপ্রভুর জ্বর আসে। সেই কারণেই স্নানযাত্রার পর শুরু হয় ‘অনসর’ বা ‘অনবাসর’ পর্ব। এই সময় প্রায় ১৫ দিন ধরে জগন্নাথদেব, বলভদ্র এবং সুভদ্রা ভক্তদের দর্শনের বাইরে থাকেন। শ্রীমন্দিরের দরজা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ রাখা হয় এবং দেবদেবীদের গোপন কক্ষে বিশ্রাম ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, রাজবৈদ্য আয়ুর্বেদিক ওষুধ ও পাঁচন দিয়ে মহাপ্রভুর চিকিৎসা করেন। এই সময় দেবতাদের বিশেষ খাদ্যও নিবেদন করা হয়।
১৫ দিন পর নবযৌবন দর্শন
অনসর পর্ব শেষ হলে সুস্থ হয়ে ওঠেন মহাপ্রভু। এরপর নতুন রূপে, নতুন সাজে তিনি ভক্তদের দর্শন দেন। এই বিশেষ অনুষ্ঠানকে বলা হয় নেত্রোৎসব বা নবযৌবন দর্শন। এই দিনই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে লক্ষ লক্ষ ভক্তের। নতুন সাজে মহাপ্রভুর প্রথম দর্শনকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
এরপর মহাপ্রভুর রথযাত্রা
নবযৌবন দর্শনের পরই শুরু হয় রথযাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতি। রাজবেশে সজ্জিত হয়ে শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা তিনটি পৃথক রথে চেপে মাসির বাড়ি— গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। বিশ্বাস অনুযায়ী, এই যাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ভগবানের ভক্তদের কাছে স্বয়ং এসে আশীর্বাদ করার প্রতীক। তাই স্নানযাত্রা থেকেই শুরু হয়ে যায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব রথযাত্রার আবহ। এবছর রথযাত্রা ১৬ জুলাই, বৃহস্পতিবার। উল্টোরথ (পুনর্যাত্রা) ২৪ জুলাই, শুক্রবার।
ধর্মীয় গুরুত্ব
স্নানযাত্রা শুধু একটি আচার নয়, এটি ভক্তি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ। দেবতার মানবিক রূপ—গরমে কষ্ট পাওয়া, স্নানের পর অসুস্থ হওয়া, চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা—এই সমস্ত বিশ্বাস জগন্নাথ সংস্কৃতিকে অন্য সব ধর্মীয় পরম্পরা থেকে আলাদা করে তুলেছে। এই কারণেই স্নানযাত্রা থেকে রথযাত্রা পর্যন্ত প্রতিটি পর্বকে ঘিরে লক্ষ লক্ষ ভক্তের আবেগ, অপেক্ষা এবং উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। পুরী হোক বা মাহেশ—আজ দেবস্নান পূর্ণিমার এই পবিত্র দিনে সর্বত্রই ধ্বনিত হচ্ছে, ‘‘জয় জগন্নাথ’’।

Leave a Reply