মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আগামী ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরতে চান, সে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)। মুজিব কন্যা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হলেও আদালতের মুখোমুখি হতে তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন ৭৮ বছর বয়সি আওয়ামি লিগ নেত্রী। তবে একইসঙ্গে শেখ হাসিনার দাবি, বিচারপ্রক্রিয়া অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। কোনও পূর্বনির্ধারিত রায়ের ভিত্তিতে বিচার হলে তা ন্যায়বিচার হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
‘বাংলাদেশ আমার দেশ, দায়িত্বও আমার’
বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা (Hasina on Returning Bangladesh) বলেন, বাংলাদেশই তাঁর দেশ এবং রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরোটাই তিনি দেশের মানুষের সঙ্গে কাটিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘বাংলাদেশ আমার দেশ। আমার রাজনৈতিক জীবনের পুরোটা আমি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে কাটিয়েছি। আমার মা, ভাই এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে বাংলাদেশের মাটিতেই হত্যা করা হয়েছিল। আমার শিকড় সেখানে, আমার মানুষ সেখানে, আমার দায়িত্বও সেখানে।’’ দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটজনক বলে উল্লেখ করে হাসিনা বলেন, এমন সময়ে দেশের বাইরে থেকে তিনি রাজনীতি করতে চান না। মানুষের পাশে দাঁড়াতেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। হাসিনা বলেন, ‘‘আমি ফিরতে চাই। এই কঠিন সময়ে আমি আমার মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। আমি আদালতের মুখোমুখি হতে এবং নিজের পক্ষে সওয়াল করতে প্রস্তুত। কিন্তু বিচার মানে পূর্বনির্ধারিত রায় নয়।’’
ক্ষমতা দখল নয়, রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার দাবি
দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ক্ষমতা পুনর্দখলের উদ্দেশ্যে নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, আওয়ামি লিগের সমর্থকদের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত দেশের মানুষকেই নিতে দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, ভারতের বন্ধুত্বকে তিনি সবসময়ই মূল্য দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর নিজের রাজনৈতিক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত। ভারত তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি। হাসিনার বক্তব্য, ভারত একটি সার্বভৌম দেশ এবং প্রত্যর্পণের বিষয়টি তাদের নিজস্ব আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঠিক হবে।
মৃত্যুদণ্ড নিয়েও ‘ভয় নেই’
নিজের বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গেও সরব হয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেওয়া কোনও মৃত্যুদণ্ডকে সত্যের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে স্বাভাবিক, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ায় নিজের বক্তব্য পেশ করার যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়নি। হাসিনার কথায়, ‘‘আদালতে আমাকে হাজির হতে দিন। আমাকে প্রমাণ পেশ করতে দিন। আমার আইনজীবীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিন। সাক্ষীদের জেরা করতে দিন। প্রমাণকেই কথা বলতে দিন।’’ তাঁর আরও অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য আদালত, আইন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
‘আমার বিরুদ্ধে ১৯ বার প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা’
বাংলাদেশে ফেরার ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অবগত বলেও জানিয়েছেন। শেখ হাসিনার দাবি, তাঁর জীবনে ১৯ বার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের হত্যার কথাও স্মরণ করেন তিনি। ২০০৪ সালের আগস্টে গ্রেনেড হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন হাসিনা। তাঁর দাবি, সেই হামলার লক্ষ্য ছিল তাঁকে এবং আওয়ামি লিগের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা। তিনি বলেন, ‘‘আমি কারাবাস, সামরিক শাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং বারবার হুমকির মুখোমুখি হয়েছি। তাই ঝুঁকি সম্পর্কে আমি জানি। কিন্তু রাজনৈতিক জীবনে শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই সবকিছু হতে পারে না। মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকার চেয়ে দেশে ফিরে যা আসবে, তার মুখোমুখি হওয়াই আমি বেছে নেব।’’
নিজের সরকারের কাজের সাফাই
নিজের দীর্ঘ শাসনকালের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের কল্যাণই তাঁর সরকারের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বিদ্যুৎ পরিষেবা সম্প্রসারণ, গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, ভূমিহীনদের জন্য ঘর ও জীবিকার ব্যবস্থা, শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। হাসিনার দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাঁর সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল।
আওয়ামি লিগের বিরুদ্ধে ‘দমন-পীড়নের’ অভিযোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামি লিগের নেতা, কর্মী এবং সাধারণ সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং হামলা ও ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। হাসিনার অভিযোগ, আওয়ামি লিগের লক্ষ লক্ষ সমর্থক এবং সাধারণ নাগরিককে এমনভাবে দেখা হচ্ছে যেন নিজেদের দেশেই তাঁদের কোনও রাজনৈতিক অধিকার নেই। তবে আওয়ামি লিগ বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি। হাসিনার কথায়, ‘‘আমরা গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ছেড়ে যাব না। আওয়ামি লিগ মানুষের কাছে ফিরে আসবে, কারণ আমাদের রাজনীতি মানুষের জন্যই।’’ ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েও আদালতে নিজের বক্তব্য রাখার প্রস্তুতির কথা জানিয়ে শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে তাৎপর্য তৈরি করেছে।

Leave a Reply