মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: জম্মু-কাশ্মীরে নিহত ব্যক্তিদের শেষকৃত্য ও তাঁদের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল পাকিস্তান। রাষ্ট্রসংঘে সেই অভিযোগের কড়া জবাব দিল ভারত। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে নয়াদিল্লি মনে করিয়ে দিল, নিজেদের সেনাদের মৃত্যুর ঘটনাও একসময় স্বীকার করতে চায়নি ইসলামাবাদ। অথচ আজ তারাই ধর্মীয় স্বাধীনতা, বিশ্বাস ও শেষকৃত্যের অধিকার নিয়ে সরব হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রসংঘে বিশেষ পরিস্থিতিতে শেষকৃত্যের অধিকার সংক্রান্ত এক আলোচনায় ভারতের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ভাবিকা মঙ্গলানন্দন।
শেষকৃত্যের অধিকার খর্ব করার অভিযোগ
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিশ্বাসের অধিকার সংক্রান্ত রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ দূত নাজিলা ঘানিয়ার একটি অন্তর্বর্তী রিপোর্টকে কেন্দ্র করেই এই বিতর্কের সূত্রপাত। ওই রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়, জম্মু-কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত ব্যক্তিদের শেষকৃত্যের অধিকার পদ্ধতিগতভাবে খর্ব করা হয়েছে। পরিবারের হাতে মৃতদেহ তুলে না দেওয়া এবং দূরবর্তী স্থানে গোপনে দেহ সমাধিস্থ করার মতো ঘটনাও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে এই ধরনের ঘটনার অসঙ্গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
পাকিস্তানকে নিশানা ভারতের
এর জবাবে পাকিস্তানকে নিশানা করে ভাবিকা মঙ্গলানন্দন বলেন, “যে রাষ্ট্র ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধে নিহত নিজেদের সেনাদের মৃতদেহ পর্যন্ত গ্রহণ করেনি, সেই রাষ্ট্রই আজ ধর্মবিশ্বাস, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমাধিস্থ করার অধিকার নিয়ে জোরালো বক্তব্য রাখছে—এ এক গভীর পরিহাস।” উল্লেখ্য, কার্গিল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান তাদের সেনা সদস্যদের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। সেই পরিস্থিতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিহত পাকিস্তানি সেনাদের দেহ উদ্ধার করে সামরিক মর্যাদায় এবং ইসলামি রীতি মেনে তাঁদের সমাধিস্থ করেছিল বলে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়। জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের লাগাতার মন্তব্যেরও কড়া সমালোচনা করেন ভারতের প্রতিনিধি। তিনি বলেন, ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অতিরিক্ত আগ্রহ না দেখিয়ে তাদের উচিত পাকিস্তানের অবৈধ দখলে থাকা জম্মু-কাশ্মীরের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি রাওয়ালকোটের কথাও উল্লেখ করেন।
সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়েও পাকিস্তানকে আক্রমণ
রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মঙ্গলানন্দন। তাঁর অভিযোগ, দেশটিতে সংখ্যালঘুদের জনসংখ্যা ক্রমশ কমছে এবং তাঁদের অধিকার বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “যে রাষ্ট্র নিজের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, ভারতকে উপদেশ দেওয়ার কোনও নৈতিক অধিকার তার নেই।” পাকিস্তানে হিন্দু, খ্রিস্টান ও শিখ-সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি এই মন্তব্য করেন। এদিকে, হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের প্রকাশিত সপ্তম বার্ষিক রিপোর্টেও (Sanctuary Denied: Freedom of Religion or Belief in 2025/26) দেশটির সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। রিপোর্টে ধর্মনিন্দা সংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার, জোরপূর্বক বিয়ে ও ধর্মান্তর এবং বৈষম্যমূলক আচরণের মতো বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদীদের শেষকৃত্য নিয়ে প্রশ্ন ভারতের
রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টে সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শেষকৃত্যের অধিকার নিয়েও আপত্তি জানান ভারতের প্রতিনিধি। তাঁর বক্তব্য, রিপোর্টে রাষ্ট্রের তরফে সন্ত্রাসবাদীদের শেষকৃত্যের অধিকার সীমিত করার সুযোগ স্বীকার করা হলেও সেই ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। মঙ্গলানন্দনের মতে, এই আইনি সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকারের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদীরা নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি একটি গোটা জাতির মানসিকতার উপর গভীর আঘাত হানে। ভারতের প্রতিনিধির অভিযোগ, রিপোর্টে সন্ত্রাসবাদীদের অধিকারের উপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সন্ত্রাসের শিকার হওয়া মানুষদের অধিকারের ক্ষেত্রে ততটা গুরুত্ব দেখা যায়নি। তিনি আরও দাবি করেন, রিপোর্টে ভারতের প্রসঙ্গ টানতে প্রায় পাঁচ বছর আগের ঘটনাগুলির উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে এবং উন্নত দেশগুলিতে ঘটে যাওয়া গুরুতর লঙ্ঘনের ঘটনাগুলিকে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
কোভিড পরিস্থিতি নিয়েও রিপোর্টকে নিশানা
কোভিড-১৯ মহামারির সময় মৃতদেহের শেষকৃত্য ও ধর্মীয় আচরণ নিয়ে বৈষম্যের প্রসঙ্গেও রিপোর্টের সমালোচনা করেন মঙ্গলানন্দন। তাঁর বক্তব্য, রিপোর্টে এমনভাবে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যেন এই ধরনের ঘটনা মূলত গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলিতেই ঘটেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, উন্নত দেশগুলিতে একই ধরনের মর্মান্তিক পরিস্থিতির উল্লেখ করা হয়নি কেন। মানুষের যন্ত্রণা ও মৃত্যুকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন ভারতের প্রতিনিধি। রাষ্ট্রসংঘে এই বক্তব্যের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অভিযোগের পাল্টা জবাব দেওয়ার পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের অধিকার, সন্ত্রাসবাদ এবং আন্তর্জাতিক রিপোর্টের নিরপেক্ষতা নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করল নয়াদিল্লি।

Leave a Reply