মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাজস্থানে প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে আইপিএস কর্তা প্রশাখা মাথুরকে আপাতত নতুন পদে নিয়োগের নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। প্রশাখা রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় আইএএস কর্তা শিখর আগরওয়ালের স্ত্রী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শিখরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের অনুমোদন দেওয়ার ঠিক এক দিন পরেই তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা (IPS Officer Prashakha Mathur) হল।
৩০ অক্টোবর রাজস্থান সরকার শিখরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন শাখাকে তদন্তের অনুমতি দেয়। একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশ এবং সরকারি পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই সংস্থাকে অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
১৯৯৫ সালের ব্যাচের আইপিএস আধিকারিক প্রশাখা পুলিশের অতিরিক্ত ডিজি পদে কর্মরত ছিলেন। পরিকল্পনা, আধুনিকীকরণ ও কল্যাণ বিভাগের দায়িত্বও তাঁর হাতে ছিল। তাঁকে অপেক্ষায় রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশাসনিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ, অনন্ত ব্র্যান্ডের অধীনে হোটেল ও রিসর্ট পরিচালনাকারী একটি বেসরকারি সংস্থাকে শিখর বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন।
শিখরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন শাখার তদন্তে অনুমোদন (Rajasthan)
গত ৩০ অক্টোবর রাজস্থান সরকার শিখরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন শাখার তদন্তে অনুমোদন দেয়। তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক অনুসন্ধানে ওই আধিকারিক এবং বেসরকারি সংস্থাটির মধ্যে যোগসাজশের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজস্থান সরকারের কর্মিবর্গ দফতর প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে শিখরকেও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখার নির্দেশ জারি করেছে।
দুর্নীতি দমন শাখার অভিযোগ, নিজের সরকারি পদমর্যাদা ও প্রভাব খাটিয়ে শিখর নিজে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন। এর ফলে রাজ্য সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি তদন্তকারী সংস্থার।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে রিসর্ট নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মে ছাড় দেওয়া, প্রয়োজনীয় শংসাপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করেই অনুমোদন দেওয়া এবং সংস্থাটিকে বিশেষ আর্থিক ছাড়ের সুযোগ করে দেওয়া।
৪০টি ভিলা-কটেজ কেনা নিয়েও প্রশ্ন
দুর্নীতি দমন শাখার প্রাথমিক অনুসন্ধানে উদয়পুরের বুঝড়া এবং আলওয়ারের আজবগড় এলাকায় সংস্থাটির রিসর্টে ৪০টি ভিলা ও কটেজ কেনার বিষয়েও একাধিক অসঙ্গতির ইঙ্গিত মিলেছে।
অভিযোগ, ওই সম্পত্তিগুলি শিখর, তাঁর স্ত্রী প্রশাখা, তাঁদের দুই পুত্র এবং মাথুরের বাবা-মায়ের নামে নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
দুর্নীতি দমন শাখার ডিজি গোবিন্দ গুপ্ত জানিয়েছেন, অভিযোগ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদন, শিল্প দফতরের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট এবং গোপন সূত্রে সংগৃহীত তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে (Rajasthan)।
গোবিন্দের বক্তব্য, অভিযোগ রয়েছে, গত ২৭ মার্চ শিখরের নামে ২০টি ভিলা নথিভুক্ত করা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, ওই একই দিনে অর্থ দফতর সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থাটিকে বিশেষ আর্থিক ছাড়ের প্যাকেজ দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছিল।
সম্পত্তি কিনে ফের ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ
শিখর ও তাঁর পরিবারের সম্পত্তি কেনাবেচার বিষয়টিও এখন তদন্তের আওতায়। এর আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, আইএএস-আইপিএস আধিকারিকের পরিবার একটি বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ৪০টি ভিলা ও কটেজ কিনেছিল। পরে সেই সম্পত্তিগুলিই আবার সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বার্ষিক ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়া দেওয়া হয়।
সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনন্ত ব্র্যান্ডের অধীনে হোটেল ও রিসর্ট পরিচালনাকারী গোয়েল ফ্যাশনস প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে এই সম্পত্তিগুলি কেনা হয়েছিল। ৪০টি সম্পত্তি কেনার জন্য পরিবারটির মোট খরচ হয়েছিল ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে উদয়পুরের বুঝড়া রিসর্টে ছিল ২০টি কটেজ এবং আলওয়ারের আজবগড়ের সম্পত্তিতে ছিল ২০টি ভিলা।
সম্পত্তিগুলি কেনার পর পরিবারের সদস্যরা ৪০টি ইউনিটই ফের গোয়েল ফ্যাশনসকে ভাড়া দেন বলে অভিযোগ। বুঝড়ার প্রতিটি কটেজের বার্ষিক ভাড়া নির্ধারিত হয়েছিল ৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে, আজবগড়ের প্রতিটি ভিলার বার্ষিক ভাড়া ছিল ৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এই সম্পত্তি থেকে বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ভাড়া পাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সম্পত্তি বিক্রি এবং পুনরায় ভাড়া দেওয়ার নথিগুলি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার দফতরে একই দিনে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। শিখর, প্রশাখা, তাঁদের দুই পুত্র এবং মাথুরের বাবা-মায়ের নামে এই নথিভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
বার্ষিক সম্পত্তির বিবরণ জমা দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন
এই সম্পত্তি কেনার ঘটনায় সরকারি আধিকারিকদের বার্ষিক স্থাবর সম্পত্তির বিবরণ জমা দেওয়ার নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মোট ৪০টি সম্পত্তির মধ্যে ২৮টি নথিভুক্ত হয়েছিল শিখর ও প্রশাখার নামে। দু’জনের নামেই ১৪টি করে সম্পত্তি ছিল।
শিখর তাঁর বার্ষিক সম্পত্তির বিবরণীতে নিজের নামে থাকা ১৪টি সম্পত্তির তথ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাখার জমা দেওয়া বিবরণীতে তাঁর নামে নথিভুক্ত ১৪টি সম্পত্তির উল্লেখ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।
এই বিষয়টিও নজরে রয়েছে তদন্তকারী সংস্থার।
প্রশাসনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন শিখর
রাজস্থান প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব সামলেছেন শিখর। উদয়পুরের জেলাশাসক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি রাজস্থান রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং শিল্প দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিবের দায়িত্বও পালন করেছেন।
এছাড়াও শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, দিল্লি-মুম্বই শিল্প করিডর, বিনিয়োগ এবং দেশ-বিদেশে বসবাসকারী রাজস্থানিদের বিষয়ক দফতরের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
রাজস্থান রাজ্য শিল্পোন্নয়ন ও বিনিয়োগ নিগমের চেয়ারম্যান, রাজস্থান ক্ষুদ্র শিল্প নিগমের চেয়ারম্যান তথা ব্যবস্থাপনা অধিকর্তা এবং ভিওয়াড়ি সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিশেষ কর্তব্যরত আধিকারিক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন (IPS Officer Prashakha Mathur) শিখর।
সব মিলিয়ে, একটি বেসরকারি সংস্থাকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ থেকে শুরু করে পরিবারের নামে বিপুল সম্পত্তি কেনা, পুনরায় সেই সংস্থাকেই ভাড়া দেওয়া এবং সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশ না করার অভিযোগ—সব কিছুই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে। তদন্তের অগ্রগতিতে এই (Rajasthan) অভিযোগগুলির প্রকৃত সত্য কতটা সামনে আসে, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply