মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে (Commonwealth Games 2026) ভারতের বিজয়রথ এগিয়ে চলেছে। বুধবার, চলতি গেমসের তৃতীয় সোনা এল ভারতের ঝুলিতে। প্যারা অ্যাথলেটিক্সে নজির গড়ে সোনা জিতলেন দিলীপ মহাদু গাভিত। মহম্মদ বাসিল রুপোর পদক জিতলেন। অন্যদিকে, লং জাম্পে মুরলি শ্রীশঙ্কর টানা দ্বিতীয় কমনওয়েলথ গেমসে রুপোর পদক জিতেছেন। এখানেই শেষ নয়, কমনওয়েলথ গেমসে ভারতীয় বক্সারেরা বুধবার পাঁচটি পদক নিশ্চিত করলেন। সব মিলিয়ে বক্সিংয়ে ভারতের ন’টি পদক নিশ্চিত হল। বুধবার বক্সিংয়ের পাঁচটি কোয়ার্টার ফাইনালেই জয় পেলেন ভারতীয়েরা। পদকজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
গাভিত ও বাসিলের ঐতিহাসিক সাফল্য
বুধবার প্যারা অ্যাথলেটিক্সে ভারতের অন্যতম সেরা সাফল্য আসে। পুরুষদের ১০০ মিটার টি৪৭ বিভাগে দিলীপ মহাদু গাভিত সোনা জিতে নিয়েছেন। আবার তাঁরই সতীর্থ মহম্মদ বাসিল মোরসিংগানাকাথ রুপোর পদক জিতে ভারতের ঐতিহাসিক ১-২ ফিনিশ নিশ্চিত করেন। গাভিত ১০.৭১ সেকেন্ড সময় নিয়ে নতুন কমনওয়েলথ গেমস রেকর্ড গড়েন। একইসঙ্গে এটি ছিল তাঁর মরসুমের সেরা পারফরম্যান্স। অন্যদিকে বাসিল ১০.৮৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে নিজের মরসুমের সেরা টাইমিং করে রুপো জেতেন। এই সোনার পদকের মাধ্যমে গ্লাসগো গেমসে ভারতের তৃতীয় সোনা এল। এর আগে মহিলাদের ৪৮ কেজি ভারোত্তোলনে মীরাবাই চানু এবং মহিলাদের এফ৫৭ শট পুটে শর্মিলা ধানকর সোনা জিতেছিলেন।
গুরু পূর্মিমায় কোচকে পদক উৎসর্গ গাভিতের
গুরু পূর্ণিমার দিন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোচকে উৎসর্গ করলেন ভারতের প্যারা স্প্রিন্টার দিলীপ মাহাদু গাভিত। কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এ পুরুষদের টি৪৭ বিভাগের ১০০ মিটার দৌড়ে সোনা জয়ের পর তিনি এই পদক তাঁর কোচ বৈজনাথ কালের হাতে উৎসর্গ করেন। গ্রামের খামারে কাজ করার সময় তাঁর প্রতিভা চিনে নিয়ে যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন, সেই গুরুকেই কৃতজ্ঞতা জানালেন গাভিত। সোনা জয়ের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় দিলীপ বলেন, “শুরুরটা একটু ধীর ছিল। পরে গতি বাড়াতে পেরেছি। আগামীবার আরও ভালো করব। সাধারণত আমি ৪০০ মিটার দৌড়াই, সেটাই আমার মূল ইভেন্ট। কিন্তু এখানে শুধু ১০০ মিটার দৌড়ানোর সুযোগ ছিল এবং আমি দারুণ উপভোগ করেছি। আমি নাসিকের তোরণ ডোঙ্গারি গ্রামের ছেলে। আগে গ্রামের খামারে কাজ করতাম। তখনই আমার স্যার বৈজনাথ কালে আমাকে দৌড়তে দেখে নাসিকে প্রশিক্ষণের জন্য ডাকেন। তিনি বলেছিলেন, সমস্ত খরচ তিনিই বহন করবেন। আজ গুরু পূর্ণিমা, তাই এই পদক আমার গুরুকে উৎসর্গ করলাম।”
গুরু-শিষ্যের প্রেরণার সম্পর্ক
মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার তোরণ ডোঙ্গারি গ্রামের অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে জন্ম দিলীপের। পাঁচ সদস্যের আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারে বড় হওয়া এই অ্যাথলিটের আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজগতে পৌঁছনোর স্বপ্ন একসময় ছিল অনেক দূরের। কিন্তু কোচ বৈজনাথ কালের নজরে পড়ার পরই বদলে যায় তাঁর জীবন। প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সমস্ত খরচের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন কালে। ডান হাতের কনুইয়ের নীচের অংশ হারিয়েও নিজের লড়াই থামাননি দিলীপ। সুরগানা তহসিলের শহিদ ভগৎ সিং স্কুলে পড়াশোনা করার পর সম্পূর্ণভাবে অ্যাথলেটিক্সে মনোনিবেশ করেন তিনি। বর্তমানে অলিম্পিক গোল্ড কোয়েস্টের সহায়তায় ভারতের অন্যতম সফল প্যারা স্প্রিন্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দিলীপের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত কোচ বৈজনাথ কালে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল রেকর্ড গড়া। আবহাওয়ার কারণে শুরুটা পরিকল্পনামতো হয়নি। কিন্তু ঠিক কৌশল মেনে প্রথম ৫০ মিটারের পর দিলীপ দুর্দান্তভাবে গতি বাড়ায়। আসলে ওর মূল ইভেন্ট ৪০০ মিটার। দুর্ভাগ্যবশত, কমনওয়েলথ গেমসে ৪০০ মিটার ছিল না। তাই আমরা ১০০ মিটারে নামার সিদ্ধান্ত নিই। সেই ইভেন্টেই যোগ্যতা অর্জন করে শেষ পর্যন্ত সোনা জিতে নিল।” গুরু পূর্ণিমার দিনে শিষ্যের এই সাফল্য শুধু ভারতের পদক তালিকায় আর একটি সোনা যোগ করেনি, বরং একজন কোচ ও তাঁর ছাত্রের অনন্য সম্পর্কের এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্তও তুলে ধরেছে।
ভারতীয় বক্সারদের দাপট
পুরুষ এবং মহিলা বিভাগ মিলিয়ে মোট ১৪ জন বক্সারের দল পাঠিয়েছে ভারত। চার জন হেরে গিয়েছেন কোয়ার্টার ফাইনাল বা তার আগেই। নিজেদের বিভাগের শেষ চারে পৌঁছে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করেছেন অঙ্কুশ যাদব, সাক্ষী চৌধরী, অরুন্ধতী চৌধরী, সচিন সিওয়াচ এবং নরেন্দ্র বেরওয়াল। পুরুষদের ৮০ কেজি বিভাগে অঙ্কুশ ৫-০ ব্যবধানে হারিয়েছেন সেশেলসের জেড মিকককে। সেমিফাইনালে তাঁর প্রতিপক্ষ কানাডার জোসুয়া ওফোরি। সচিন ৬০ কেজি বিভাগের সেমিফাইনালে পৌঁছেছেন বতসোয়ানার ট্রেসর মোরেমিকে। সচিনের পক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ফল ৫-০। শেষ চারের লড়াইয়ে তাঁর প্রতিপক্ষ ওয়েলসের হ্যারিস অ্যালান। নরেন্দ্র ৯০+ কেজি বিভাগের কোয়ার্টার ফাইনালে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছেন সামোয়ার মাইকেল সেকোকে। সেমিফাইনালে তাঁকে লড়াই করতে হবে ত্রিনিদাদ এবং টোবাগোর নিগেল পলের বিরুদ্ধে।
নারীশক্তির প্রভাব
মহিলাদের ৫১ কেজি বিভাগের সেমিফাইনালে উঠেছেন সাক্ষী। তিনি ৫-০ ব্যবধানে হারিয়েছেন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্যাটলিন ফ্রায়ার্সকে। সেমিফাইনালে তাঁর প্রতিপক্ষ কানাডার জেন ওয়াল। অরুন্ধতী জয় পেয়েছেন মহিলাদের ৭০ কেজি বিভাগে। তিনি কোয়ার্টার ফাইনালে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়েছেন নিউ জিল্যান্ডের মরগ্যান হেন্ডারসনকে। সেমিফাইনালে তাঁর লড়াই ওয়েলসের রোজি একসেলের সঙ্গে। সেমিফাইনালে উঠে আগেই পদক নিশ্চিত করেছেন আরও চার জন। তাঁরা হলেন লভলীনা বরগোহাঁই (৭৫ কেজি), প্রিয়া ঘাংহাস (৬০ কেজি), প্রীতি পাওয়ার (৫৪ কেজি) এবং যদুমণি সিং (৫৫ কেজি)।
ভারতের ঝুলিতে পদকের সম্ভাবনা!
এছাড়া অ্যাথলেটিক্সে অনিমেষ কুজুর ২০০ মিটারের সেমিফাইনালে উঠেছেন। আর শট পুটে তাজিন্দরপাল সিং তুর ও সমরদীপ সিং গিল ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন। লন বোলসেও ভারত দুরন্ত ছন্দে রয়েছে। নবনীত সিং ও দিনেশ কুমারের জুটি নামিবিয়াকে হারিয়ে এগিয়ে চলেছে। যার ফলে ভারতের মেডেলের ঝুলি আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুরুষদের ৪০০ মিটার হার্ডলসেও এগিয়ে চলেছে ভারত। এক্ষেত্রে যশস পালক্ষা ও সন্তোষ কে তামিলারাসান ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন। হিট-২-এ সন্তোষ ৪৯.৫১ সেকেন্ড সময় নিয়ে তৃতীয় হন। হিট-১-এ যশস ৪৯.৬৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে তৃতীয় স্থানে শেষ করেন।
আজ নামছেন নীরজ
কমনওয়েলথ গেমসে আজ অভিযান শুরু নীরজ চোপড়ার। জ্যাভলিনের কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে নামছেন ২০২০ সালের অলিম্পিক্স চ্যাম্পিয়ন নীরজ। দু’বছর আগের অলিম্পিক্সে অবশ্য রুপো জিতে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ২০১৮ সালের কমনওয়েলথ গেমস চ্যাম্পিয়ন নীরজ এ বার কি পারবেন? যোগ্যতা অর্জন পর্ব দুপুর ২:৫৫ থেকে। সম্প্রচারিত হবে সোনি স্পোর্টস চ্যানেল ও সোনি লিভ অ্যাপে।

Leave a Reply