Indian Professor Deepak Dhar: হকিংদের পাশে এবার ভারতীয় বিজ্ঞানী, ২০২৬-এর ডিরাক মেডেল পেলেন দীপক ধর

indian professor deepak dhar wins eminent dirac medal physics giants creates history

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে ফের এক বড় স্বীকৃতি ভারতের। বিশিষ্ট ভারতীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিদ দীপক ধরকে ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ ডিরাক মেডেলে সম্মানিত করেছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স (ICTP)। পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যায় (Statistical Mechanics) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৫ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কার তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা ও গণিতে অসামান্য অবদানের জন্য দেওয়া হয়। অতীতে এই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত বহু বিজ্ঞানী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন স্টিফেন হকিং-সহ পদার্থবিজ্ঞানের একাধিক কিংবদন্তি। ২০২৬ সালে দীপক ধর-সহ মোট চার জন বিজ্ঞানীকে ডিরাক মেডেলের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। বিপুল সংখ্যক কণার সমন্বয়ে গঠিত জটিল ব্যবস্থাগুলি কীভাবে সম্মিলিতভাবে আচরণ করে, তা নিয়ে গবেষণা করে যে শাখা, সেটিই পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা। আধুনিক বিজ্ঞানে এই ক্ষেত্রের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জটিল নেটওয়ার্ক এমনকি আর্থিক বাজারের মতো বিষয় বুঝতেও এই গবেষণার বিভিন্ন ধারণা কাজে লাগছে।

ছোট শহর থেকে বিশ্বমঞ্চে

১৯৫১ সালে উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড়ে জন্ম দীপক ধরের। হিন্দি-মাধ্যম পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা দীপকের মা চাইতেন ছেলে আইএএস অফিসার হোক। কিন্তু তাঁর বাবার উৎসাহেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বাবা নিয়মিত বাড়িতে বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা নিয়ে আসতেন। তার মধ্যে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং অফ সায়েন্স’ (Understanding Science) নামের একটি পত্রিকা কিশোর দীপকের মনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। সেই কৌতূহলই পরবর্তীতে তাঁকে নিয়ে যায় বিশ্বের অন্যতম সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি আইআইটি কানপুর থেকে এমএসসি করেন। এরপর পাড়ি দেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (Caltech)। সেখানে তিনি রিচার্ড ফাইনম্যান ফেলোশিপ পান। বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও হয় তাঁর। ফাইনম্যানের সঙ্গে সহকারী হিসেবে পড়াতেন দীপক ধর। ১৯৭৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকেই পিএইচডি সম্পূর্ণ করেন তিনি।

বিদেশে কেরিয়ার নয়, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত

পিএইচডি শেষ করার পর বিদেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু দীপক ধর বেছে নেন অন্য পথ। দেশে ফিরে যোগ দেন টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে (TIFR)-এ। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ভারতেই গবেষণা চালিয়ে যান তিনি। আইআইএসইআর পুনেতেও (IISER Pune) প্রায় আট বছর অধ্যাপনা করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে পড়ানোর পাশাপাশি ভারতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। টাটা-তে কাজের সময় কোনও আনুষ্ঠানিক গুরুর অধীনে না থেকেও দেশের শক্তিশালী তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের একটি গবেষণা-সমাজের অংশ হয়ে ওঠেন তিনি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিসংখ্যানগত পদার্থবিদ্যার নানা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে কাজ করেছেন।

‘দীপক ধরের বার্নিং অ্যালগরিদম’ ও আন্তর্জাতিক সম্মান

দীপক ধরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান হল বার্নিং অ্যালগরিদম-এর স্যান্ডপাইল মডেল (Dhar’s burning algorithm। Sandpile model)। জটিল ব্যবস্থার আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ডিরাক মেডেলই দীপক ধরের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়। ২০২২ সালে তিনি বল্টসম্যান মেডেল (Boltzmann Medal) পান এবং এই সম্মান পাওয়া প্রথম ভারতীয় হন। স্ট্যাটিসটিক্যাল পদার্থবিদ্যায় (Statistical Physics) এটি অন্যতম সর্বোচ্চ মর্যাদার পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সময় নিজের সাফল্য সম্পর্কে ধর বলেছিলেন, “আমি বল্টসম্যান মেডেল পাওয়া প্রথম ভারতীয়, কিন্তু পরিসংখ্যানগত পদার্থবিদ্যায় ভালো কাজ করা প্রথম ভারতীয় নই।” ২০২৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ প্রদান করে।

ডিরাক মেডেলের বিশেষ মর্যাদা

প্রখ্যাত পদার্থবিদ পল ডিরাক-এর নামে এই পুরস্কার চালু করে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স। ১৯৮৫ সাল থেকে প্রতি বছর তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা ও গণিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই মেডেল দেওয়া হয়। এই পুরস্কারের একটি বিশেষ নিয়ম হল—নোবেল, ফিল্ডস বা উলফ পুরস্কারজয়ীদের ডিরাক মেডেল দেওয়া হয় না। তবে অতীতে বহু ডিরাক মেডেলজয়ী পরবর্তীকালে এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারগুলির কোনও না কোনওটি পেয়েছেন। দীপক ধরের সাফল্যের তাৎপর্য তাই শুধু একটি পুরস্কার পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরপ্রদেশের একটি ছোট শহরে বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা পড়ে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়া এক ছাত্র পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যানের সঙ্গে কাজ করেছেন, বিদেশে উজ্জ্বল কেরিয়ারের সুযোগ পেয়েও দেশে ফিরে এসেছেন এবং ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চায় কয়েক দশক ধরে অবদান রেখে চলেছেন। ২০২৬-এর ডিরাক মেডেল সেই দীর্ঘ যাত্রারই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তাঁর গল্প একই সঙ্গে প্রমাণ করে—কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং দেশের মাটিতে থেকে বিজ্ঞানচর্চার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে ছোট শহর থেকেও বিশ্ববিজ্ঞানের মঞ্চে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share