মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ঝুঁকেছিলেন পুষ্পা, এবার ধরা পড়লেন। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এর জালে ফলতার তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খান। সূত্রের খবর, দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন জাহাঙ্গির (Jahangir Arrested)। অবশেষে নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, গ্রেফতার করে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।
নেপালে পালানোর চেষ্টা
এসটিএফ সূত্রে খবর, নেপাল সীমান্ত ধরে পালানোর চেষ্টা করছিলেন জাহাঙ্গির। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে যান এসটিএফ-এর আধিকারিকেরা। ভারত-নেপাল সীমান্তে বাড়িভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেছিল জাহাঙ্গির।পরিবার নিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকাই ছিল জাহাঙ্গিরের লক্ষ্য। নেপালে পালিয়ে গিয়ে পাকাপাকি থাকার চেষ্টা করছিলেন। আগেভাগে নেপালের স্কুলে ভর্তি করেছিলেন সন্তানদের। মিলেছে জাহাঙ্গিরের সন্তানদের স্কুলে ভর্তির তথ্যও। পুলিশ বলছে, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর খোঁজ শুরু হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, পালিয়ে যাওয়ার পর নিজের অবস্থান গোপন রাখতে একাধিক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করেছিলেন তৃণমূল নেতা। তিনি মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখেন। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ থেকেও লগআউট করে যান, যাতে তাঁর অবস্থান বা যোগাযোগের সূত্র খুঁজে পাওয়া না যায়। ফলে গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে।
কী করে জাহাঙ্গিরের খোঁজ পেল পুলিশ ?
জাহাঙ্গিরের বিভিন্ন সঙ্গীদের গ্রেফতার করে পুলিশ জানতে পারে, তিনি নেপালে যাতায়াত করতেন। সেই সূত্রেই জাহাঙ্গিরের এক কাছের লোক যে নেপালে থাকত তাকে ট্র্যাক করতে শুরু করে পুলিশ। তাকে ট্র্যাক করে জানা যায়, ঘরভাড়া নিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতে শুরু করে দিয়েছেন জাহাঙ্গির। নেপালে জাহাঙ্গিরের সন্তানকে ভর্তি করার কাজও এগোয়। পুলিশ জানতে পারে, জাহাঙ্গির বাংলা-নেপাল বর্ডারের কাছে রয়েছেন। সেইমতো টিম গঠন করা হয়। টিম গঠন করে সাদা পোশাকের ডায়মন্ডহারবার জেলা পুলিশ এবং এসটিএফের টিম সেখানকার উদ্দেশে রওনা দেয়। পুলিশ আসছে খবর পেয়ে পালাতে শুরু করেন জাহাঙ্গির। তাঁকে ধরপাকড়ের জন্য দৌড়াদৌড়িও শুরু হয়ে যায়। শেষমেশ তাঁকে ধরে ফেলে পুলিশ।
ডায়মন্ডহারবার জেলা পুলিশ ও এসটিএফ-এর অভিযান
ফলতায় পুনর্নির্বাচনের আগে ভোটে না লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির। ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি চাই ফলতায় শান্তি থাকুক। অনেক উন্নয়ন হোক। সোনার ফলতা হোক, এটা আমার স্বপ্ন ছিল। মুখ্যমন্ত্রী ফলতার উন্নয়নের জন্য স্পেশাল প্যাকেজ দিচ্ছেন। আগামী ২১ মে পুননির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে তাই নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি’। ইভিএমে তৃণমূলের প্রতীকের পাশে জাহাঙ্গিরের নাম পর্যন্ত পাল্টাতে পারেনি তৃণমূল। ২৪ মে ভোটের ফল বেরোলে দেখা যায়, ফলতায় ১ লক্ষ ৯ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে ৭৭৮৩ টি ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে শেষ করেছেন জাহাঙ্গির। এরপর কার্যত অন্তর্ধানে চলে যান। কোনও খোঁজ ছিল না তাঁর। বিভিন্ন মামলায় নাম জড়ানোর পর থেকে তাঁর খোঁজে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। ডায়মন্ডহারবার জেলা পুলিশ এবং এসটিএফ যৌথভাবে একাধিক জায়গায় অভিযান চালায়।
জাহাঙ্গিরের রক্ষাকবচ প্রত্যাহার
২০১৯ সালে জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় রক্ষাকবচ পান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ফলতার ওই তৃণমূল নেতা। এর পাশাপাশি, ফলতা বিধানসভার পুনর্নির্বাচনের আগে হাইকোর্ট থেকে আর একটি রক্ষাকবচ পেয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির। রাজ্যে পালাবদলের পর তদন্তের স্বার্থে জাহাঙ্গির খানের অন্তর্বর্তী আইনি সুরক্ষার নির্দেশ প্রত্যাহার করার আর্জি জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল খোদ রাজ্য সরকার। রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়, একাধিক মামলার তদন্তের খাতিরে এই প্রভাবশালী নেতাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। কিন্তু আদালতের আইনি রক্ষাকবচ থাকার কারণে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে পারছিল না। ২৬ মে কলকাতা হাইকোর্টে বড়সড় ধাক্কা খান জাহাঙ্গির। তাঁর আইনি সুরক্ষার মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকার করে উচ্চ আদালত। গত ২৬ মে জাহাঙ্গিরকে দেওয়া সমস্ত রক্ষাকবচই প্রত্যাহার করে নেয় কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারপতি পার্থসারথি সেন বলেন, পুলিশ যখন মামলা রুজু করেছে, তখন তদন্ত হবেই। এরপর জাহাঙ্গিরকে গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে আর কোনও আইনি বাধা ছিল না পুলিশের। জাহাঙ্গিরের গ্রেফতারির দাবিতে সরব হন ফলতাবাসীও।
জাহাঙ্গিরের নাম মোট ৭টি এফআইআর
আইনি বাধা সরে যেতেই জাহাঙ্গিরকে পাকড়াও করার জল্পনা শুরু হয়। দীর্ঘ নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য এবং বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার শেষ পর্যন্ত তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এসটিএফ। নেপাল সীমান্ত থেকে গ্রেফতার করা হয়। জাহাঙ্গির খানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। এলাকায় তাঁর প্রভাবশালী ভূমিকার কারণে তাঁকে অনেকেই ‘স্বঘোষিত ডন’ বলেও উল্লেখ করেন। সাধারণ মানুষকে রীতিমতো ভয়ে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ। পুলিশ সূত্রের খবর, জাহাঙ্গির খানের বিরুদ্ধে ফলতা থানায় খুন, খুনের চেষ্টা, তোলাবাজি, হুমকি, বাড়ি ভাঙচুর, লুঠ-সহ একাধিক অভিযোগে মোট ৭টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। অবশেষে জাহাঙ্গির গ্রেফতার হওয়ায় স্বস্তিতে ফলতাবাসী।

Leave a Reply