Nigeria: নাইজেরিয়ায় এক সপ্তাহে ৫২ জনেরও বেশি খ্রিস্টান নিহত! বেনুয়ে ও কাদুনায় নতুন করে হিংসায় উদ্বেগ

nigeria terror Fulani islamic groups massacre over 52 christians as renewed wave of jihadist activity

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: নাইজেরিয়ার ( Nigeria Terror) মধ্যাঞ্চলে ফের রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থা ও বাসিন্দাদের দাবি, গত ২৪ থেকে ২৯ জুলাই-এর মধ্যে বেনুয়ে ও কাদুনা রাজ্যে ধারাবাহিক হামলায় ৫২ জনেরও বেশি খ্রিস্টান নিহত হয়েছেন। স্থানীয়রা এসব হামলার জন্য ফুলানি সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীকে দায়ী করছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থা ট্রুথ নাইজেরিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই বেনুয়ে রাজ্যে অন্তত ৬১ জন খ্রিস্টান নিহত হয়েছেন। যদিও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সেনা ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী একাধিক ক্ষেত্রে হামলা প্রতিরোধ বা দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনা

ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনায় বিগত কয়েক বছর ধরেই জর্জরিত আফ্রিকার অন্যতম এই দরিদ্র দেশটি। যে অঞ্চলগুলিতে হামলা চালিয়েছে জঙ্গি গোষ্ঠী, সেখানে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় পাশাপাশি বসাবস করেন বলেই জানা গিয়েছে। স্থানীয় মুসলিম পশুপালক ফুলানি গোষ্ঠী এবং খ্রিস্টান কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে বিবাদ। সূত্রের খবর, শরিয়তি আইন স্থাপনের জন্য খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর উপরে ভয়ানক হামলা চালানো হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম মানুষজনের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে গ্রামবাসীদের। সন্ত্রাসের রেশ এখনও রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, ঘরবাড়ি জ্বালানোর পাশাপাশি নির্বিচারে চলেছে গুলি।

ওতুকপোতে ভোরের হামলায় বহু নিহত

সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা ঘটে ২৮ জুলাই ভোরে বেনুয়ে রাজ্যের ওতুকপো কাউন্টির এফেই-উতিকপি গ্রামে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৫০ জন সশস্ত্র হামলাকারী ২৫টিরও বেশি মোটরসাইকেলে করে গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালায়। হামলার সময় তারা ধর্মীয় স্লোগান দিচ্ছিল বলেও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ওচে আদাহ জানান, হামলায় অন্তত ১৪ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরদিন এমিচি ও নওয়াবা ওজু এলাকাতেও হামলা চালিয়ে আরও তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এর আগে ২৭ জুলাই ইপোম গ্রামেও একজন নিহত হন। গত দুই সপ্তাহে একই অঞ্চলে আরও অন্তত ১৬ জন খ্রিস্টান নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বেনুয়ে রাজ্যের আইনসভার সদস্য মাইকেল অডু বলেন, “এই ধরনের হামলা আমাদের এলাকায় বারবার ঘটছে। মানুষ প্রতিনিয়ত স্বজন হারাচ্ছে এবং আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে।” ওতুকপো কাউন্টির চেয়ারম্যান ম্যাক্সওয়েল ওগিরি অভিযোগ করেন, এলাকায় সেনা, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও হামলা ঠেকানো যায়নি। তাঁর দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই হামলার আগাম তথ্য থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কৃষক ও গ্রামবাসীরাও হামলার শিকার

কোয়ান্ডে কাউন্টির আবাজি এলাকায় ২৭ জুলাই খামারে কাজ করার সময় তেরেহেম্বা নামে এক খ্রিস্টান নারী নিহত হন বলে অভিযোগ। তাঁর সঙ্গে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী ইগবা তের্না জানান, তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। অন্যদিকে ওহিমিনি কাউন্টির আগাদাগবা ও ওচোবো এলাকায় ২৪ ও ২৫ জুলাই দুই দফা হামলায় একজন পথচারী ও দুজন স্থানীয় প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবক নিহত হন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, হামলার পরও প্রায় ৩০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

কাদুনায় রাতের হামলায় ৩০ জন নিহতের দাবি

একই সময়ে কাদুনা রাজ্যের কৌরু এলাকায় ২৬ জুলাই রাতে আরেকটি বড় হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নারিডন গ্রামের ওপর হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে আটজন শিশু রয়েছে। আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন এবং বহু বাড়িঘর ধ্বংস হয়। গ্রামের প্রধানের সচিব ডোগন রানা জানান, এক পরিবারে এক রাতেই পাঁচ শিশু নিহত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, নিকটবর্তী নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলের খুব কাছে অবস্থান করলেও দীর্ঘ সময় হামলা চলার পরও কার্যকর হস্তক্ষেপ করেনি।

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

কাদুনা রাজ্যের গভর্নর উবা সানি হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন এবং পার্শ্ববর্তী প্লেটো রাজ্যের প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেনুয়ে, কাদুনা, প্লেটো ও তারাবা রাজ্যে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। তবে হামলাগুলোর উদ্দেশ্য, দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এবং হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানা যায়নি। সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো নাইজেরিয়ার মধ্যাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক ও নিরাপত্তাজনিত সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

নাইজেরিয়া জুড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব

ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, প্রায় দুই দশক ধরে নাইজেরিয়া জুড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব চালাচ্ছে মূলত দু’টি জঙ্গি গোষ্ঠী। একটি হলো বোকো হারাম। নাইজেরিয়ায় ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অপহরণ, হামলা, আত্মঘাতী বিস্ফোরণের মতো ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। আর একটি সংগঠন হলো ইসলামিক স্টেট অফ ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স। এরা এক সময়ে বোকো হারামেরই অংশ ছিল। ২০১৬ সালে আলাদা হয়ে যায়। এদেরও ইসলামিক শাসন কায়েম করাই লক্ষ্য। তবে ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স সাধারণ মানুষের বদলে সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপরেই বেশি হামলা চালায়।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share