মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মহাকাশযানে চেপে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছনোই ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের শেষ কথা নয়। একদিন চাঁদ, মঙ্গল বা অন্য কোনও মহাজাগতিক গন্তব্যে মানুষকে দীর্ঘ সময় বসবাস করতে হলে প্রয়োজন হবে এমন এক আবাসস্থলের, যা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও মানুষকে নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। সেই ভবিষ্যতের ‘মহাকাশের বাড়ি’-র (Space Habitat BHEEM) একটি ধারণা সামনে আনলেন ভারতীয় মহাকাশচারী গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা (Shubhanshu Shukla)। ভিনগ্রহে মানুষের বাসযোগ্য ঠিকানার একটি রূপরেখা তৈরি করেছেন তিনি। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভীম’ বা ‘ভারতীয় হ্যাবিটেবল এক্সপ্যান্ডেবল এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল হ্যাবিটেট’ (BHEEM)।
‘ভীম’-এর জন্মবৃত্তান্ত
রাশিয়া থেকে ফিরে ভারতে মহাকাশচারী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন শুভাংশু। তখনই এই গবেষণার সূত্রপাত। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের (IISc) অলোক ল্যাবে তৈরি হয়েছে এই ‘ভীম’ কনসেপ্ট। ভারতের রকেট সিস্টেম ও অরবিটাল মডিউলের খুঁটিনাটি শেখার পাশাপাশি শারীরিক কসরতও চলছিল। এর মাঝেই ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযান নিয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণায় উৎসাহিত করা হয় তাঁদের। শুভাংশুর কথায়, ‘যে মহাকাশযানে ওড়ার জন্য আমরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম, আমি তার বাইরে গিয়ে ভাবতে চেয়েছিলাম। গন্তব্যে নামার পর মানুষ কোথায় থাকবে, সেটা নিয়েই কাজ শুরু করি।’ পৃথিবীর বাইরে মানুষের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, বিশেষ করে চাঁদ ও মঙ্গলের মতো গন্তব্যে স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি আবাসস্থল তৈরির সম্ভাবনাই ছিল গবেষণার মূল বিষয়। এই গবেষণার ফলেই তৈরি হয় ভীম-এর ধারণা। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc)-এর অলোক ল্যাব-এ এই প্রকল্পের গবেষণা হয়েছে।
মহাকাশে থাকার চ্যালেঞ্জ
ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল পৃথিবীর বাইরে মানুষকে দীর্ঘ সময় নিরাপদে রাখা। রকেটে চেপে ভিনগ্রহে পৌঁছনো এক জিনিস। কিন্তু সেখানে গিয়ে মানুষের বেঁচে থাকা ও কাজ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রযুক্তিগত লড়াই (Gaganyaan Mission)। শুধু পৌঁছলেই তো হল না! ভবিষ্যতের সেই বাসস্থানে মহাকাশচারীদের চরম মহাজাগতিক বিকিরণ বা রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করার বন্দোবস্ত থাকতে হবে। থাকবে তাপমাত্রার বিপুল হেরফের। রুক্ষ ও বিপজ্জনক পরিবেশ। এই সব কিছু সামলে নিরবচ্ছিন্ন জীবনদায়ী ব্যবস্থা বা লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তোলা ভীষণ জরুরি। এই আশ্রয়স্থলে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, যেমন—শক্তি উৎপাদন, শক্তি সঞ্চয় এবং অক্সিজেনের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রয়োজন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চয়ের নিখুঁত পরিকাঠামো। একইসঙ্গে সেই বাসস্থান নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ব্যবহারিক পদ্ধতিও তৈরি রাখতে হবে। শুভাংশুর সোজা কথা, ‘আমরা কোথায় থাকব? এই সহজ প্রশ্নটাই ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।’
এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে
শুক্লা বলেন, ভবিষ্যতে পৃথিবীর বাইরে মানুষকে বসবাস করাতে চাইলে এখন থেকেই তার প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। তাঁর বক্তব্য, ২০ বছর পরে মানুষকে পৃথিবীর বাইরে বসবাস করাতে হলে সেই কাজ ২০ বছর পরে শুরু করলে চলবে না—শুরু করতে হবে এখন থেকেই। ভারতের মানব মহাকাশযাত্রার উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ক্রমশ বাড়ছে। গগনযান কর্মসূচি ভারতীয় মহাকাশচারীদের নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথে পাঠানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের আরও দূরবর্তী মানব মহাকাশ অভিযানের ভিত্তি তৈরি করছে। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই চাঁদ ও মঙ্গলের মতো গন্তব্যে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভারতের ‘গগনযান’ প্রকল্পের পথ ধরে এই দূরদর্শী গবেষণা দেশের মহাকাশ গবেষণাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ‘ভীম’-এর মূল লক্ষ্য হল, পৃথিবী থেকে ভাঁজ বা কমপ্যাক্ট অবস্থায় বাসস্থানের উপকরণ চাঁদ কিংবা মঙ্গলে নিয়ে গিয়ে সেখানে ধীরে ধীরে তা সম্প্রসারণ করা। ফলে সীমিত পে-লোড-এর মধ্যেই তুলনামূলক বড় থাকার জায়গা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
সাহস দেখাতে হবে, ভাবতে হবে
ভিনগ্রহে মানুষের বসতি গড়ার দৌড়ে ভারতের গবেষণাগারগুলোও যে আগামী দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। শুভাংশু শুক্লার মতে, ‘ভিন্ন বিশ্বে বাসস্থান তৈরির প্রথম ধাপটা হয়তো প্রথম ইট গাঁথা নয়। প্রথম ধাপটা হল, সেই বাসস্থান কেমন হতে পারে, তা কল্পনা করার সাহস দেখানো।’ শুক্লার ভীম প্রকল্প তাই শুধু একটি মহাকাশ-আবাসনের নকশা নয়; এটি পৃথিবীর বাইরে মানুষের ভবিষ্যৎ বসবাসের সম্ভাবনা নিয়ে ভারতের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। শুক্লার ভাষায়, অন্য কোনও গ্রহে বা মহাজাগতিক জগতে মানুষের আবাসস্থল তৈরির প্রথম ধাপ হয়তো তার প্রথম ইটটি বসানো নয়—প্রথম ধাপ হতে পারে সেই বাড়িটিকে কল্পনা করার সাহস দেখানো। চাঁদ ও মঙ্গলে মানুষের ভবিষ্যৎ বসতি তৈরির স্বপ্ন যখন ক্রমশ বাস্তব গবেষণার দিকে এগোচ্ছে, তখন সেই ‘মহাকাশের বাড়ি’-র ভাবনাও যে ভারতের গবেষণাগার থেকেই উঠে আসছে, ভীম তারই ইঙ্গিত।

Leave a Reply