US Iran Conflicts: রণাঙ্গন মধ্যপ্রাচ্য! ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের এক মাস পূর্ণ, কী ভাবছে আমেরিকা? কতটা প্রভাব বিশ্বে?

iran war

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ইরান যুদ্ধের (US Iran Conflicts) একমাস পার। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধে (Iran‑Israel War) গোটা মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গন হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের জেরে বিশ্বের ‘তৈলধমনী’ হরমুজ প্রণালী বন্ধ, আকাশসীমা বন্ধের প্রভাব গড়িয়েছে বহু দূর। পরিবেশই বদলে গিয়েছে। আতঙ্কিত যুদ্ধ কবলিত দেশের মানুষজন। যেসব দেশের যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব নেই, তাঁরা আশঙ্কায়। গত ২৮ মার্চ আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথ হামলায় তেহরানে প্রথম ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই-সহ শীর্ষ একাধিক নেতৃত্ব নিহত হন। এই হামলার আসল উদ্দেশ্য ছিল, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে একটি পশ্চিমপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এই হামলার পরিকল্পনা চলছিল গত কয়েক মাস ধরেই। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আমেরিকা ও ইজরায়েল বুঝতে পারে যে, তারা এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, যারা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সহনশীল ও বিধ্বংসী।

যুদ্ধের শুরু ও বিস্তার

ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে ওয়াশিংটন ও তেল আভিভ যৌথভাবে তেহরান, মিনাবসহ একাধিক শহরে বিমান হামলা শুরু করে। হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই এবং সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তবে এত বড় আঘাতের পরও তেহরান নতিস্বীকার করেনি। প্রতিশোধে ইরান ইজরায়েল ছাড়াও উপসাগরীয় দেশগুলো—কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও জর্ডান—এর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। আবুধাবিতে ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে দুজন নিহত হন, আর কুয়েতের শুওয়াইক বন্দরেও হামলার ঘটনা ঘটে। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, বাঙ্কার-বাস্টার এবং আরও নানা ধরণের মারণাস্ত্রের অবিরাম আঘাতে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও, ইরান স্বল্পমূল্যের অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নাজেহাল করে চলেছে এবং হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি

সংঘর্ষ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১২টিরও বেশি দেশে প্রায় ৪,৫০০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ইরানেই মারা গিয়েছেন প্রায় ১,৯০০ জন। লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইরানের দুটি বড় ইস্পাত কারখানা ধ্বংস হয়েছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ-কে ঘিরে ইজরায়েলের সঙ্গে লেবাননে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ১,১০০-র বেশি মানুষ নিহত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া। আমেরিকা-ভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থার মতে, ইরানে এ পর্যন্ত ৩,৩০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ১,৪০০ জনই সাধারণ নাগরিক।

মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যয়

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ১০,০০০-র বেশি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে এবং ইরানের ১৫০টিরও বেশি নৌযান ডুবিয়েছে। প্রাক্তন পেন্টাগন কর্মকর্তা ইলেইন ম্যাককাস্কার-এর মতে, যুদ্ধের প্রথম তিন সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির খরচ ১.৪ থেকে ২.৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এখনও পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যে, আইআরজিসি এবং অন্যান্য সামরিক ইউনিটগুলো কোনও একক বা কেন্দ্রীয় কমান্ড ছাড়াই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। কূটনৈতিক আঙিনায় ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের গালিবাফই মূলত নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপ ও তেলের বাজার

ইরান তার কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। স্ট্রেইট অফ হরমুজ—যেখানে দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল পরিবাহিত হয়—সেখানে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে তারা সরবরাহ ব্যাহত করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গিয়েছে। বিশ্ব-বাজারে তেলের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প শেষমেশ আলোচনার পথে ঝুঁকতে বাধ্য হন। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত (মোট ১০ দিন) ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা করেন তিনি। এক মাসের মধ্যে এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। সামরিক, মানবিক ও অর্থনৈতিক—সব দিক থেকেই পরিস্থিতি ক্রমশ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শান্তি আলোচনা “ভালোই এগোচ্ছে।” তবে ইরান মার্কিন প্রস্তাবকে “একপাক্ষিক ও অন্যায্য” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে স্ট্রেইট অব হরমুজে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ। এদিকে, ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় কোনওরকম শিথিলতা আসবে না। যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরান এখনও অদম্য মনোবলে বলীয়ান। তেহরান বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে একমাত্র তাদের শর্তেই। এই ঘোষণার সঙ্গে সাদুর্য রেখে তারা যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে গোপন বা ‘ব্যাক-চ্যানেল’ আলোচনাও শুরু করেছে। তবে এই আপাত শান্তির আড়ালেই লুকিয়ে আছে ইরানে মার্কিন স্থল অভিযানের এক ভয়াবহ আশঙ্কা। যার প্রস্তুতি হিসেবে হাজার হাজার মেরিন সেনা ও প্যারাট্রুপার ইতিমধ্যেই মধ্য এশিয়ার দিকে এগিয়ে আসছে।

ভারতের কৌশলগত অবস্থানের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসতেই বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে ফের একবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ভারতের নাম। সূত্রের খবর, ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ রুখতে এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, মোদি ও ট্রাম্পের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি তথা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইলন মাস্কও। ২০২৬-এর এই উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বশান্তি ফেরাতে মোদি-ট্রাম্প-মাস্ক ত্রয়ীর এই ‘কানেকশন’ এক নয়া সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, ইরান-ইজরায়েল সংঘাত যাতে কোনওভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সে বিষয়ে মোদির পরামর্শ চেয়েছেন ট্রাম্প। ভারতের কৌশলগত অবস্থান ও ইরানের সঙ্গে দিল্লির সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের আগুন নেভাতে মরিয়া আমেরিকা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংকটে ভারতের মধ্যস্থতা এখন বিশ্বের কাছে সবথেকে বড় ভরসা। প্রধানমন্ত্রী মোদি আগেই ‘টিম ইন্ডিয়া’র আদলে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত প্রয়াসের কথা বলেছিলেন, এবার ট্রাম্পের সঙ্গে এই কথা সেই পথকেই আরও প্রশস্ত করল।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share