তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
রাজ্যজুড়ে নিপা ভাইরাসের চোখরাঙানি বাড়ছে। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের হাসপাতালে কর্মরত দুই নার্স আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছিল ইতিমধ্যেই। গত কয়েকদিন ধরে এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি আছেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে একজনের বাড়ি নদিয়ায় ও অপরজনের বাড়ি বর্ধমানের কাটোয়ায়। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা সঙ্কটজনক। জানা যাচ্ছে, ওই নার্স কোমায় রয়েছেন। এর মধ্যেই, আক্রান্ত সন্দেহে নতুন করে আরও বর্ধমানের ২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা যাচ্ছে, আগে আক্রান্ত কাটোয়া নিবাসী নার্সকে যখন বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তাঁর চিকিৎসায় থাকা এক হাউসস্টাফকে এবার নিপা সন্দেহে কলকাতার বেলেঘাটা আইডিতে ভর্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও এক নার্সকে ভর্তি করা হয়েছে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তাই, নিপা ভাইরাস নিয়ে বাড়তি সতর্ক কেন্দ্রীয় সরকার।
করোনা অতিমারির তুলনায় কতখানি বেশি বিপজ্জনক নিপা ভাইরাস?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, নিপা ভাইরাস মৃত্যু হারের নিরিখে করোনার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। তাঁদের মতে, মৃত্যু হারের নিরিখে করোনা ভাইরাসের তুলনায় নিপা ভাইরাস বেশি বিপজ্জনক। তাঁরা জানাচ্ছেন, নিপা ভাইরাসে আক্রান্তের মৃত্যুর হার ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ, নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে করোনা ভাইরাসের তুলনায় নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের ক্ষমতা কম। তাই করোনা ভাইরাসের মতো অতো দ্রুত এই ভাইরাস ছড়াবে না। এমনটাই আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সচেতনতা ও সতর্কতা জরুরি। যদি এই ভাইরাস নিজের প্রকৃতি পরিবর্তনে সক্ষম হয়, তাহলে পরিস্থিতি করোনা মহামারির তুলনায় আরও বেশি সঙ্কটজনক হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, করোনা হাঁচি-কাশি এবং স্পর্শের মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তো। নিপা ভাইরাসের সেই ক্ষমতা তুলনামূলক কম। আক্রান্তের সরাসরি স্পর্শের মাধ্যমেই এই রোগ একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে সংক্রামিত হচ্ছে। বিশেষত মূত্র, রক্ত কিংবা লালার মাধ্যমে এই রোগ সংক্রামিত হয়। তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, নিপা ভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসায় মূল প্রতিবন্ধকতা হলো, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এখনও নেই। তাই নানান রকম পদ্ধতিতে এই রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়। তাই নিপা নিয়ে আতঙ্ক নয়। বরং সচেতনতা জরুরি। এমনটাই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ।
কেন এই সংক্রমণ নিয়ে কেন্দ্রের বাড়তি উদ্বেগ?
রাজ্যে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ হতেই সক্রিয় কেন্দ্রীয় সরকার। সংক্রমণ যাতে না ছড়ায় তার জন্য নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথ উদ্যোগে কাজ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। নিপা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে বাড়তি তৎপর কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক। তার পিছনে মূল কারণ নিপার মৃত্যু হার। এমনটাই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, নিপার মৃত্যু হার অন্যান্য ভাইরাসঘটিত রোগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এই ভাইরাস মানুষের মস্তিষ্ককে দ্রুত অক্ষম করে দেয়। ফলে শরীরের সমস্ত স্নায়ু কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায়। একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যায়। তাই এই ভাইরাস অত্যন্ত বিপজ্জনক। নিপা সংক্রমণ ছড়ালে মৃত্যু বাড়বে। প্রথম থেকেই সংক্রমণ ঠেকাতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। তাছাড়া এই সংক্রমণ ঠেকানোর মূল হাতিয়ার হলো প্রাথমিক পর্বেই রোগ নির্ণয়। একাধিক কেন্দ্রীয় সংস্থায় সেই শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
কোন ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, জ্বর আর সর্দি, গলা ব্যথার মতো উপসর্গ একেবারেই অবহেলা করা যাবে না। দ্রুত শারীরিক পরীক্ষা জরুরি। প্রশাসনিক মহলে আইসোলেশন নিয়ে কড়া পদক্ষেপ জরুরি। তাঁরা জানাচ্ছেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই কোনো নিপা ভাইরাস আক্রান্তের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আলাদা ভাবে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো ভাবেই যাতে সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না পরে সেই জন্য বাড়তি নজরদারি জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, বাদুরের পাশপাশি শুয়োরের দেহ থেকেও এই রোগ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আপাতত শুয়োরের মাংস খাওয়া উচিত হবে না বলেই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন ফল থেকেও নিপা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। কাটা ফল বা অর্ধেক খাওয়া ফল অথবা ফলে কোনো আঁচড় আছে দেখলে এই সময়ে তা কোনো ভাবেই খাওয়া উচিত নয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

Leave a Reply