মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কয়েক দিন আগে যে ব্যাটারকে দেখে মনে হচ্ছিল, বেঞ্চে বসেই বিশ্বকাপ (T20 World Cup 2026) শেষ হয়ে যাবে, সেই ব্যাটারই ভারতকে সেমিফাইনালে তুললেন। ইডেনে সঞ্জু স্যামসনের ব্যাটে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৫ উইকেটে হারাল ভারত (India vs West Indies)। ৯৭ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন সঞ্জু। ভাঙলেন কিং কোহলির রেকর্ডও। ক্রিকেটের নন্দন কাননে সুপার এইটের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সমীকরণ স্পষ্ট ছিল। দুই যুযুধান প্রতিপক্ষের মধ্যে জয়ী দলই সেমিফাইনালের টিকিট পাকা করবে। সপ্তাহান্তের টানটান ম্যাচে সুপার সঞ্জুর দাপটে এই নিয়ে ষষ্ঠবার ভারত টি-২০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল।
সঞ্জুর চওড়া ব্যাটেই শেষ চারে
১৯৬ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমেছিল ভারতীয় ক্রিকেট দল। টিম ইন্ডিয়ার হয়ে ওপেন করতে নেমেছিলেন সঞ্জু স্য়ামসন এবং অভিষেক শর্মা। তৃতীয় ওভারের শেষ বলে ভারত হারায় অভিষেক শর্মার উইকেট। অভিষেক ১১ বলে ১০ রান করে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। ৬ বলে ১০ রান করে ফেরেন ঈশান কিষানও। শুরুতেই জোড়া উইকেট হারিয়ে বেশ খানিকটা চাপে পড়ে যায় ভারত। ইডেনের গ্যালারিতে তখন নিস্তব্ধতা। ছোটদের মুখে হতাশা, বড়রা ব্যস্ত ভুল-ত্রুটি বাছতে। প্রশ্ন উঠছিল টসে জিতে ফিল্ডিং নেওয়া নিয়েও। কিন্তু অধিনায়ক সূর্য যে ফিল্ডিং নিয়ে ভুল করেননি তা প্রমাণ করলেন সূর্য। দেখালেন ক্রিজে টিকে থাকলে এই পিচে ব্যাট করা বেশ সহজ। ঈশান কিষান ফিরতেই দলের হাল ধরেন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এবং সঞ্জু স্যামসন। ২৬ বলে ঝকঝকে হাফসেঞ্চুরি বেরিয়ে এল সঞ্জুর ব্যাট থেকে। এরপরই তৃতীয় ধাক্কা খেল ভারত। ১৬ বলে ১৮ রান করে ফিরে যান সূর্যকুমার যাদব। তবে ভারতের রানের গতি থামেনি। ১১ ওভার শেষে ১০০ রান পূরণ করে ফেলে। মিডল অর্ডারে কিছুটা হলেও ভরসা দিয়েছিলেন তিলক বর্মা। ১৫ বলে ২৭ রান করে তিনিও ফিরে যান। ১৭ রান করে আউট হয়ে যান হার্দিকও। তবে শেষ পর্যন্ত লড়াই করলেন সঞ্জু স্যামসন। তিনি ৯৭ রানে শেষপর্যন্ত অপরাজিত থাকেন। চার বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটে জেতালেন টিম ইন্ডিয়াকে।
অনেককে জবাব দেওয়ার ছিল সঞ্জুর
কয়েক দিন আগে এই সঞ্জুকে খেলানো নিয়ে প্রশ্নের জবাব অধিনায়ক সূর্য বলেছিলেন, “আপনি চাইছেন আমি অভিষেককে বসিয়ে সঞ্জুকে খেলাই।” সেই কথার মধ্যে কোথাও একটি তাচ্ছিল্য মেশানো ছিল। ফলে অনেককে জবাব দেওয়ার ছিল সঞ্জুর। বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচকে মঞ্চ করে তুললেন তিনি। বুঝিয়ে দিলেন, সুযোগ পেলে তা কীভাবে কাজে লাগাতে হয়। এই ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কোনও সুযোগ দেননি সঞ্জু। ক্রিকেটের পরিভাষায় ক্লিনিক্যাল ইনিংস যাকে বলে। ঝুঁকি নিয়ে একটিও শট খেলেননি। যখন বড় শট খেলেছেন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলেছেন। যত সময় গড়াচ্ছিল, তত ভারত জয়ের পথে এগোচ্ছিল। তার মধ্যে হার্দিকের ক্যাচ ফস্কান হোল্ডার। তত ক্ষণ ভাল ফিল্ডিং করছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু কঠিন সময়ে চাপ সামলাতে পারল না তারা। শেষ ওভারের প্রথম দুই বলে ছক্কা ও চার মেরে দলকে জেতালেন সঞ্জু। ৫০ বলে ৯৭ রানে অপরাজিত থাকলেন। ১২ চার ও চার ছক্কা মারেন। ৩ রানের জন্য শতরান হাতছাড়া হলেও এই ইনিংস শতরানের থেকে কম নয়। দলকে জিতিয়েও কোনও বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখাননি সঞ্জু। পিচে হাঁটু মুড়ে বসে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। হাতজোড় করে প্রণাম করলেন। তার পর মাঠ ছাড়লেন।
‘‘এই ইনিংসটা আমার কাছে গোটা পৃথিবী’’
সেরার পুরস্কারটা নিতে এসে বললেন, ‘‘এই ইনিংসটা আসলে আমার কাছে গোটা পৃথিবী। যেদিন থেকে আমি খেলা শুরু করেছি, সেদিন থেকেই দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতাম। এমন একটা ইনিংসের জন্যই আমি এতদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন। এই যাত্রাটা এককথায় অসাধারণ। রাস্তায় অনেক চড়াই-উতরাই এসেছে। কখনও নিজের উপর সন্দেহ হয়েছে। আশঙ্কা দানা বেঁধেছিল, আদৌ দায়িত্ব পূরণ করতে পারব কি না? তবে আজ ঈশ্বর যেভাবে আমাকে আশীর্বাদ করেছেন, সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ।’’ একইসঙ্গে, রোহিত-কোহলিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেন, ‘‘এই ফরম্য়াটে আমি অনেকদিন ধরে খেলছি। কোহলি, ধোনি, রোহিত শর্মাদের মতো কিংবদন্তীদের থেকে অনেককিছু শিখেছি। পরিস্থিতি অনুসারে কীভাবে খেলা বদলাতে হয়, তা জেনেছি। আজকের দিনটা আমার জীবনে অবশ্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পরিস্থিতি অনুসারে ব্যাট করেছি। প্রত্যেকটা বলের মেরিট অনুসারে খেলেছি।’’
ভাঙলেন কোহলির রেকর্ড
ইডেনে রান তাড়া করতে নেমে একটি রেকর্ডও গড়লেন সঞ্জু। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এত দিন ভারতের হয়ে রান তাড়া করতে নেমে সবচেয়ে বেশি রান ছিল বিরাট কোহলির দখলে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৮২ রান করেছিলেন তিনি। সেই রেকর্ড এই ম্যাচে ভেঙে দিলেন সঞ্জু। টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেন সূর্য। ব্রেন্ডন কিং না থাকায় এই ম্যাচে হোপের সঙ্গে ওপেন করতে নামেন রস্টন চেজ। পাওয়ার প্লে-তে সাবধানি ব্যাটিং করেন দু’জনে। রান তোলার গতি খুব বেশি না থাকলেও উইকেট পড়েনি। তবে পড়তে পারত। জসপ্রীত বুমরার বলে ক্যাচ তোলেন চেজ। বলের নীচে পৌঁছেও গিয়েছিলেন অভিশেক শর্মা। কিন্তু সহজ ক্যাচ ফেলেন তিনি। সেই ক্যাচ ধরা নয়, ফস্কানো কঠিন। অভিষেক সেটাই করে দেখান। সুযোগ কাজে লাগান চেজ।
বুমরার বলে বাজিমাত
ওপেনিং জুটিতে ৬৮ রান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জুটি ভাঙেন বরুণ চক্রবর্তী। তাঁর বল পিছনের পায়ে খেলতে গিয়ে বোল্ড হন হোপ। ৩৩ বলে ৩২ রান করেন তিনি। তিনটি চার ও একটি ছক্কা মারলেও ১৭টি ডট বল খেলেন তিনি। হোপ আউট হওয়ার পর ব্যাট করতে নামেন শিমরন হেটমায়ার। চলতি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা ব্যাটার। শুরু থেকেই হাত খুলে শট মারতে শুরু করেন তিনি। এক ধাক্কায় দলের রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেন তিনি। বাধ্য হয়ে বুমরার হাতে বল তুলে দেন সূর্য। অধিনায়ককে নিরাশ করেননি বুমরা। আউট করেন হেটমায়ারকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই ব্যাটারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ২৩ বল করেছেন বুমরা। আউট করেছেন ছ’বার। ১২ বলে ২৭ রানে আউট হন হেটমায়ার। দু’বল পরেই বুমরা ফেরান চেজকে। তিনি করেন ২৫ বলে ৪০ রান।
সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এটি ভারতের সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়। এর আগে ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১৭৩ রান তাড়া করে জিতেছিল ভারত। ১২ বছর পর সেই নজির ভাঙল। ১০ বছর পর একটি বদলাও নিল ভারত। ২০১৬ সালে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারতের বিরুদ্ধে ১৯২ রান তাড়া করে জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বিদায় নিয়েছিল ভারত। সেই হারের বদলা ইডেনে নিল ভারত।
সেমিফাইনালে কারা
বিশের বিশ্বকাপের (T20 World Cup 2026) খেতাব জয়ের থেকে চার দলই কেবল দুই জয় দূরে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেখানে ভারত আর ইংল্যান্ড রেকর্ড তৃতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের লক্ষ্যে, সেখানে নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবার বিশের বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেতে মরিয়া। চার সেমিফাইনালিস্ট। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সুপার এইটে গ্রুপ ১-র শীর্ষে শেষ করা দল গ্রুপ ২-র রানার্সের বিরুদ্ধে খেলবে এবং আরেক সেমিফাইনালে গ্রুপ ২-র শীর্ষে থাকা দল খেলবে গ্রুপ ১-র রানার্স আপের বিরুদ্ধে। এই সমীকরণ অনুযায়ী বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুম্বইয়ে ভারত মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ডের, আর ইডেনে নিউজিল্যান্ড খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। সেমিফাইনালের প্রস্তুতি শুরু করেছে ইডেনও। তবে, রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় ইডেন ছিল আপন ছন্দে। ক্যারিবিয়ান ক্যালিপসো থামিয়ে সঞ্জুর প্রতিটা শটে উঠেছে মেক্সিকান ওয়েভ। সূর্য-হার্দিকদের সঙ্গে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার উল্লাসে মেতেছে ইডেনের গ্যালারি।

Leave a Reply