মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আজ, ১৫ অগাস্ট ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস (Independence Day)। ১৯৪৭ সালের এই দিনেই দীর্ঘ প্রায় দুই শতকের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ভারত। সেই স্বাধীনতা সহজে আসেনি। অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম, কারাবরণ এবং রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে দেশের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা দিবসের সকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয় পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। তাঁদের লড়াই শুধু একটি পরাধীন দেশকে মুক্ত করার জন্য ছিল না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক ভারত গড়ার স্বপ্নও ছিল। স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে সেইসব বীরের কিছু অমর উক্তি আজও নতুন করে দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করে।
একনজরে দেখে নেওয়া যাক তাঁদের সেই বাণী—
ভগৎ সিং
“স্বাধীনতা মানুষের অবিচ্ছিন্ন অধিকার। ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু আমার বিশ্বাস, আমার চিন্তাকে ওরা কখনও মারতে পারবে না।”
মহাত্মা গান্ধী
“প্রথমে তারা তোমাকে উপেক্ষা করবে, তারপর তোমাকে দেখে হাসবে। তারপরে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। শেষে কিন্তু জয় তোমারই হবে।”
জওহরলাল নেহরু
“পুঁজিবাদী সমাজের শক্তিগুলিকে যদি নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে ধনীরা আরও ধনী এবং দরিদ্ররা আরও দারিদ্রতার স্বীকার হবে।”
ভীম রাও আম্বেদকর
“কোনও সম্প্রদায়ের অগ্রগতি আমি সেই সম্প্রদায়ের নারীর অগ্রগতির নিরিখে পরিমাপ করি।”
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু
“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।”
স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কিংবদন্তি বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদের কণ্ঠেও ধ্বনিত হয়েছিল অদম্য আত্মবিশ্বাস—
চন্দ্রশেখর আজাদ
“দুশমন কি গোলিও কা হাম সামনা করেঙ্গে / আজাদ হি রহে হ্যায়, আজাদ হি রহেঙ্গে।”
দেশের ঐক্য ও নাগরিকের অধিকার-কর্তব্য নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল।
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল
“এদেশের সমস্ত নাগরিককে মনে রাখতে হবে যে তারা ভারতীয় এবং এই দেশে তাদের সমস্ত অধিকার রয়েছে, সমস্ত কর্তব্যও রয়েছে।”
বিপ্লবীদের মুখে দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগের যে অঙ্গীকার শোনা যেত, তারই প্রতিধ্বনি রয়েছে রামপ্রসাদ বিসমিলের বিখ্যাত পংক্তিতে—
রামপ্রসাদ বিসমিল
“সরফরোশি কি তমন্না অব হামারে দিল মে হ্যায় / দেখনা হ্যায় জোর কিতনা বাজু-ই-কাতিল মে হ্যায়”
স্বরাজের দাবিকে সাধারণ মানুষের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে বাল গঙ্গাধর তিলকের বিখ্যাত উক্তি আজও স্মরণীয়।
বাল গঙ্গাধর (লোকমান্য) তিলক
“স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার এবং আমি সেটা অর্জন করবই।”
নারী জাগরণ, শিক্ষা এবং সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতির প্রশ্নেও স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রেখে গিয়েছেন। সরোজিনী নাইডুর কথায় উঠে এসেছিল সেই প্রত্যয়ের কথা।
সরোজিনী নাইডু
“আমরা গভীর আন্তরিকতা, বক্তৃতায় আরও সাহস এবং কর্মে আন্তরিকতা চাই।”
অল্প বয়সেই দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম বসু। মৃত্যুকে ভয় না পাওয়ার সেই অদম্য মানসিকতার পরিচয় মেলে তাঁর কথায়—
ক্ষুদিরাম বসু
“আমি গীতাপাঠ করেছি। আমার মৃত্যুভয় নেই।”
স্বাধীনতা সংগ্রামের আর এক অগ্নিযুগের বিপ্লবী ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন। তাঁর আহ্বানে ছিল লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প—
মাস্টারদা সূর্য সেন
“লক্ষ্যে পোঁছানোর আগে মৃত্যুর হিমশীতল তোমাদের স্পর্শ করলে তোমরা অনুগামীদের হাতে এই অন্বেষণ এর ভার তুলে দেবে-যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছি। প্রিয় বন্ধুরা-এগিয়ে চল-কখনও পিছিয়ে যেও না। ওই দেখা যাচ্ছে স্বাধীণতার নবারুণ। উঠে-পড়ে লাগো। কখনও হতাশ হয়ো না। সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত।”
স্বাধীনতার স্বপ্ন শুধু রাজনৈতিক মুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে ভয় থাকবে না, জ্ঞান হবে মুক্ত এবং মানুষের চিন্তা ও কর্ম কোনও সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। তাঁর ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কবিতার সেই অমর প্রার্থনা আজও স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ মনে করিয়ে দেয়—
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়,
যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি,
পৌরুষেরে করে নি শতধা, নিত্য যেথা
তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা,
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ;
ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত॥”
উন্নত ভারতের স্বপ্নের প্রতীক
স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে এই বাণীগুলি তাই শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতায় থাকা কিছু উক্তি নয়। এগুলি আত্মত্যাগ, সাহস, অধিকার, কর্তব্য, ঐক্য এবং একটি উন্নত ভারতের স্বপ্নের প্রতীক। জাতীয় পতাকার তলায় দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁদের আদর্শকে মনে রাখাই হতে পারে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অন্যতম সার্থকতা।

Leave a Reply