মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: এশিয়ান গেমসে পুরুষদের হকি সেমি ফাইনালে পাকিস্তানকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে ফাইনালে প্রবেশ করল ভারত, সঙ্গে পদকও নিশ্চিত করল। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানে শেষ মিনিট পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা। এই ম্যাচেও তার অন্যথা ছিল না। বৃহস্পতিবার জাপানের গিফু প্রিফেকচারাল গ্রিন স্টেডিয়ামে দেখা গেল সেই ছবি। ভারত একটা সময়ে ৩-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে পরে ৩-৩ সমতায় আটকে যায়। আর সেখান থেকে অন্তিম মিনিটে রুদ্ধশ্বাস জয় ছিনিয়ে নেয়। নাটকীয়তায় মোড়া এই সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে ফাইনালে প্রবেশ করল ভারত। অন্যদিকে , ক্রিকেটে সোনার পদকের জন্য মুখোমুখি হতে চলেছে ভারত ও পাকিস্তান (India vs Pakistan)। ৩ অক্টোবর হবে বহু প্রতীক্ষিত এই ফাইনাল। এশিয়ার দুই ক্রিকেট শক্তির লড়াই এবার এশিয়ান গেমসের মঞ্চে নতুন মাত্রা পেতে চলেছে।
শুরু থেকে ভারতের আক্রমণ
এদিন হকির ময়দানে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল টিম ইন্ডিয়া। পঞ্চম মিনিটেই পেনাল্টি কর্নার থেকে নিজের ট্রেডমার্ক ড্র্যাগ-ফ্লিকে বল জালে জড়িয়ে ভারতকে ১-০ এগিয়ে দেন অধিনায়ক হরমনপ্রীত সিং। অষ্টম মিনিটে দিলপ্রীতের একটি গোল ব্যাক-স্টিকের কারণে ভিডিয়ো রিভিউতে বাতিল হলেও ভারতীয় আক্রমণ থামেনি। ১৩ মিনিটে রিভার্স হিটে পেনাল্টি কর্নার আদায় করে নিখুঁত ফিনিশে ব্যবধান ২-০ করেন সেই হরমনপ্রীতই। দ্বিতীয় কোয়ার্টারের ২৩ মিনিটে মনপ্রীত ও শীলানন্দের দুর্দান্ত সমন্বয়ে পাকিস্তানের ডি-বক্সে বল পান সুখজিত সিং, যিনি আলতো টোকায় স্কোরলাইন ৩-০ করে দেন। কিন্তু এরপরেই ম্যাচে শুরু হয় পাকিস্তানের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। ৩০তম মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে গোলরক্ষক মোহিতকে পরাস্ত করে পাকিস্তানের আবু মাহমুদ ব্যবধান ৩-১ করেন। বিরতির পর তৃতীয় কোয়ার্টারে ভারত অনেকটাই স্লো হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে ৪৫ মিনিটে ভারতীয় ডিফেন্সের ব্যর্থতার ফায়দা তুলে হান্নান শাহিদ ৩-২ করেন। চতুর্থ কোয়ার্টারের শুরুতে অর্থাৎ ৪৯ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে আসা পাসে রানা ওয়াহিদ স্টিক ছুঁইয়ে ৩-৩ সমতা ফেরান। টানা তিনটে গোল খেয়ে অনেকটাই ব্যাকফুটে চলে যায় ভারতীয় শিবির।
টানা ২১টা ম্যাচে অপরাজিত ভারত
ম্যাচের শেষ দশ মিনিট ছিল চরম উত্তেজনায় ভরা। খেলার ঘড়িতে যখন ঠিক ৬০ মিনিট, সার্কেলের ডান প্রান্তে সামান্য ফাঁকা জায়গা পেয়ে বিদ্যুৎগতিতে ঢুকে পড়েন অভিষেক। দুরূহ কোণ থেকে তাঁর নেওয়া জোরালো শট গোলরক্ষক রাজার পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে ঢুকে যায়। আর এর পরেই ম্যাচ শেষের হুটার বাজে। শেষ মুহূর্তের এই গোলে উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা ভারতীয় দল। এই জয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টানা ২১টা ম্যাচে অপরাজিত রইল ভারত। পাশাপাশি ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার এশিয়াডের ইতিহাসে পুরুষ ও মহিলা উভয় দলকেই ফাইনালে তুলে এক অনন্য কীর্তি স্থাপন করল ভারত।
ক্রিকেটে ফাইনালে ভারত-পাক মহারণ
এশিয়ান গেমস ২০২৬-এর ক্রিকেটে সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দুরন্ত পারফরম্যান্স করে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে ভারত। ব্যাট হাতে প্রথমে ২০ ওভারে ১৬৯ রান তোলে টিম ইন্ডিয়া। ঈশান কিষানের অপরাজিত ৮০ রানের ইনিংস ভারতের বড় স্কোরের ভিত গড়ে দেয়। বৈভব সূর্যবংশীর ৩৮ রানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। জবাবে মাত্র ৪৫ রানেই অলআউট হয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। ভারতের হয়ে জসপ্রীত বুমরাহ, অভিষেক শর্মা ও অক্ষর প্যাটেল দুটি করে উইকেট নেন। শ্রীলঙ্কার তিন ব্যাটার রান-আউট হন। এবার ৩ অক্টোবর মুখোমুখি হবে ভারত ও পাকিস্তান। অর্থাৎ এশিয়ান গেমস ২০২৬-এর ক্রিকেটে সোনার পদক নির্ধারণ হবে দুই প্রতিবেশী দেশের লড়াইয়ে। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে দুই দলের লড়াই বরাবরই আলাদা গুরুত্ব পায়। এবার সেই দ্বৈরথই দেখা যাবে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মঞ্চে।
ইতিহাস নীতেশ কুমারের
এশিয়ান গেমস ২০২৬-এর ১২তম দিনটি ভারতের জন্য ছিল সাফল্যে ভরা। ক্রিকেট-হকির সঙ্গেই গ্রিকো-রোমান কুস্তিতে ইতিহাস গড়েছেন নীতেশ কুমার। পাশাপাশি তিরন্দাজি, নৌক্রীড়া, স্কোয়াশ ও সেপাক তাকরায়ও পদক ও সাফল্য এসেছে ভারতের ঝুলিতে। পুরুষদের ৯৭ কেজি গ্রিকো-রোমান বিভাগে মঙ্গোলিয়ার গাঙ্কহুয়াগ গানবাতারকে ৯-০ ব্যবধানে টেকনিক্যাল সুপিরিয়রিটিতে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছেন নীতেশ কুমার। এর ফলে ১৯৬২ সালের পর প্রথম ভারতীয় গ্রিকো-রোমান কুস্তিগির হিসেবে এশিয়ান গেমসের ফাইনালে পৌঁছলেন তিনি। এবার সোনার পদকের জন্য লড়বেন নীতেশ। গ্রিকো-রোমান কুস্তিতে এশিয়ান গেমসে ভারতের শেষ সোনা এসেছিল ১৯৬২ সালে। এদিকে মহিলাদের ৬২ কেজি বিভাগে মানসি আহলাওয়াত সেমিফাইনালে উঠলেও জাপানের নোনোকা ওজাকির কাছে ৬-০ ব্যবধানে হেরে যান। এবার ব্রোঞ্জের জন্য লড়বেন তিনি।
স্কোয়াশে ভারতের ব্রোঞ্জ
মহিলাদের দলগত স্কোয়াশে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেছে ভারত। সেমিফাইনালে হংকং চায়নার কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় ভারতীয় দল। প্রথম ম্যাচে আনাহত সিং চ্যান সিন ইউকের কাছে পরাজিত হন। এরপর তানভি খান্না ৩-১ ব্যবধানে লি কা ই-কে হারিয়ে ভারতকে সমতায় ফেরান। তবে নির্ণায়ক ম্যাচে জোশনা চিনাপ্পা হো তসে লোকের কাছে হেরে যান। ফলে ফাইনালে পৌঁছে যায় হংকং চায়না এবং ভারত পায় ব্রোঞ্জ। পুরুষদের কম্পাউন্ড ব্যক্তিগত বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতেছেন গণেশ মণি রত্নম থিরুমুরু। ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইয়ে ভিয়েতনামের দাং কং ডাককে ১৪৯-১৪৪ ব্যবধানে হারান তিনি। সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার কিম জংহোর কাছে হেরে গেলেও ব্রোঞ্জের ম্যাচে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান গণেশ। কম্পাউন্ড তিরন্দাজিতে ভারতীয় দলগত ইভেন্ট থেকে তিনটি সোনা এবং ব্যক্তিগত ইভেন্টে একটি ব্রোঞ্জ জিতেছে।
নৌক্রীড়ায় রুপো ভারতের
পুরুষদের স্কিফ ইভেন্টে রুপোর পদক জিতেছেন ভারতের মানু ফ্রান্সিস ও প্রিন্স কুরিসিঙ্কাল নোবেল। ভারতীয় জুটি মোট ২৩ নেট পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে। ফাইনাল রেসের আগে চতুর্থ স্থানে থাকা ভারতীয় জুটি শেষ দৌড়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। পুরুষদের কোয়াড্রান্ট বিভাগে সেমিফাইনালে পৌঁছে পদক নিশ্চিত করেছে ভারত। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকেই শেষ চারে জায়গা করে নেয় ভারতীয় দল। এশিয়ান গেমস ২০২৬-এর ১২তম দিন শেষে মোট ৬৩টি পদক নিয়ে পদক তালিকায় অষ্টম স্থানে রয়েছে ভারত। সোনা ১০টি, রুপো ২২টি ও ৩১টি ব্রোঞ্জ পদক রয়েছে ভারতের ঝুলিতে।

Leave a Reply