Rajnath Singh: দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বড় পদক্ষেপ, সব প্রচলিত মিসাইলের প্রযুক্তি ভারতীয় শিল্পকে হস্তান্তরের অনুমোদন রাজনাথের

rajnath-singh-drdo-missile-technology-transfer-india-defence-production

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যে আরও বড় পদক্ষেপ করল ভারত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও (DRDO)-র তৈরি সমস্ত প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি ভারতীয় শিল্প সংস্থাগুলিকে হস্তান্তরের (Transfer of Technology বা ToT) অনুমোদন দিয়েছেন। এর ফলে নির্দিষ্ট যোগ্যতা, সার্টিফিকেশন এবং নিয়ন্ত্রক বিধি পূরণ সাপেক্ষে ভারতীয় সংস্থাগুলি দেশে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির উৎপাদন করতে পারবে। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB) মঙ্গলবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতীয় শিল্পের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। এর মূল লক্ষ্য হল ডিআরডিও-র গবেষণাগারে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিকে উন্নয়ন পর্যায় থেকে সরিয়ে বাণিজ্যিক ও বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।

দেশীয় সংস্থার হাতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি

এতদিন ডিআরডিও-র তৈরি বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উৎপাদনে মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এবার সেই ব্যবস্থায় আরও বড় পরিসরে বেসরকারি ভারতীয় শিল্পকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের এই সিদ্ধান্তের ফলে যোগ্য ভারতীয় সংস্থাগুলি ডিআরডিও-র কাছ থেকে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে দেশেই উৎপাদন করতে পারবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে তেমনই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে ভারতীয় শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। সরকারের বক্তব্য, এই উদ্যোগ আমদানি নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। একইসঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ শৃঙ্খলে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই (MSME) এবং অন্যান্য প্রযুক্তি অংশীদারদের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়বে।

ডিআরডিও-শিল্প সহযোগিতায় জোর

প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ডিআরডিও এবং ভারতীয় শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করার পরিকল্পনা রয়েছে। উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি শুধু গবেষণাগারে তৈরি করাই নয়, সেই প্রযুক্তিকে দ্রুত উৎপাদনযোগ্য করে তোলা এবং সেনাবাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যায় সরবরাহ করাই এখন অন্যতম লক্ষ্য। এই ব্যবস্থায় ডিআরডিও ভারতীয় শিল্পকে প্রযুক্তি গ্রহণ ও আত্মস্থ করতে সহায়তা করবে। ফলে ভবিষ্যতে দেশীয় সংস্থাগুলি আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রতিরক্ষা রফতানিতে।

অ্যাস্ট্রা মার্ক-২ তৈরিতে বেসরকারি সংস্থার দৌড়?

এই নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য ক্ষেত্র হতে পারে ভারতের দেশীয় অ্যাস্ট্রা মার্ক-২ (Astra Mark-2) ক্ষেপণাস্ত্র। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক শীঘ্রই একটি রিকোয়েস্ট ফর প্রোপোজাল (RFP) জারি করতে পারে। সেখানে অ্যাস্ট্রা মার্ক-২ তৈরির জন্য বেসরকারি ক্ষেত্রের সংস্থা ও বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে আইকম, আদানি, ভারত ফোর্জ, টাটা গোষ্ঠী ও মহিন্দ্রা গ্রুপ সহ একাধিক ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীর সম্ভাব্য অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যাস্ট্রা মার্ক-২ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ১৮০–২০০ কিলোমিটার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বায়ুসেনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই দেশীয় আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন যদি বৃহৎ ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এর উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে উৎপাদনে নামার আগে নির্ধারিত যোগ্যতা, সার্টিফিকেশন এবং সমস্ত নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে হবে।

দেশীয় মিসাইলের চাহিদা বাড়ছে

প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন ভারতীয় তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার চাহিদা দেশ এবং বিদেশ—দুই ক্ষেত্রেই বাড়ছে। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি দেশও ভারতের দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া অ্যাস্ট্রা সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে শুধু ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রয়োজন মেটানো নয়, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। বেসরকারি শিল্পকে উৎপাদন ব্যবস্থায় আরও বেশি করে যুক্ত করলে সেই চাহিদা পূরণ করা সহজ হতে পারে।

প্রতিরক্ষা রফতানিতেও বড় সুযোগ

ভারত গত কয়েক বছরে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং রফতানির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। যুদ্ধবিমান, কামান, ড্রোন, যুদ্ধজাহাজসহ একাধিক ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রেও জোর দেওয়া হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো সেই নীতিরই পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যাপ্ত উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলিতেও দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র রফতানির সুযোগ বাড়তে পারে।

এতদিন কেন পিছিয়ে ছিল মিসাইল উৎপাদন?

ভারতে বেসরকারি শিল্পের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিমান, ড্রোন এবং আর্টিলারি বা কামান উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলিকে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষিপণাস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির ভূমিকা এতদিন তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। এবার ডিআরডিও-র তৈরি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি বৃহত্তর ভারতীয় শিল্পের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে গবেষণা ও উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা ডিআরডিও আরও বেশি করে নতুন প্রযুক্তি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্ত্র ব্যবস্থা এবং উন্নত প্রতিরক্ষা গবেষণায় মনোযোগ দিতে পারবে। অন্যদিকে শিল্প সংস্থাগুলি তুলনামূলকভাবে পরিণত প্রযুক্তির বৃহৎ পরিসরের উৎপাদনের দায়িত্ব নিতে পারবে।

আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়

রাজনাথ সিংয়ের অনুমোদিত এই প্রযুক্তি হস্তান্তর তাই শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর মাধ্যমে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থায় গবেষণা থেকে উৎপাদন এবং উৎপাদন থেকে রফতানি—পুরো শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশীয় শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, এমএসএমই-কে সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত করা, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং বিদেশি বাজারে ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাবনা বাড়ানো— সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত ভারতের ‘আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা’ কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে অ্যাস্ট্রা মার্ক-২-এর মতো উন্নত দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদনে যদি একাধিক ভারতীয় বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী যুক্ত হয়, তাহলে আগামী দিনে দেশের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন পরিকাঠামো আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share