High Court on Slaughter: রাজ্যের নির্দেশিকায় হস্তক্ষেপ নয়, পশু জবাই নিয়ে ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভার সরকারের ওপর ছাড়ল হাইকোর্ট

calcutta high court on slaughter case rejects pleas by tmc cpiml saying it is not an essential religious requirement

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতা হাইকোর্টে ইদ-উল-আজহা বা বকরি ইদের আগে গবাদি পশু জবাই সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া একগুচ্ছ মামলায় বড় ধাক্কা খেলেন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র , তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান-সহ একাধিক আবেদনকারী। বৃহস্পতিবার কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, “গরু কোরবানি ইসলাম ধর্মের আবশ্যিক ধর্মীয় প্রথা নয়।” সেই সঙ্গে আদালত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞামূলক বিজ্ঞপ্তিতে স্থগিতাদেশ দিতেও অস্বীকার করেছে। আদালত জানিয়েছে এ বিষয়ে রাজ্য সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সরকারের বিজ্ঞপ্তি

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী একটি জনবিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে বলা হয়, ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মোষ জবাই করতে হলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দেওয়া “অযোগ্যতার শংসাপত্র” প্রয়োজন হবে এবং শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত কসাইখানাতেই জবাই করা যাবে। বলা হয়েছে, যে বা যিনি ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ পশুপত্যা নিয়ন্ত্রণ আইনের নিয়ম লঙ্ঘন করবেন, তাকে ছয় মাস পর্যন্ত কারাবাস বা ১০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে, অথবা উভয় সাজাই দেওয়া হতে পারে।

কারা কারা আদালতের দ্বারস্থ হন

প্রধান বিচারপতি সুজয় পল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। ‘রামকৃষ্ণ পাল বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার’ মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল আরও একাধিক আবেদন। আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন তৃণমূল নেতৃবৃন্দ, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের প্রতিনিধিরা, গবাদি পশু ব্যবসায়ী এবং অন্যান্যরা। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, সরকারি বিধিনিষেধ সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের পরিপন্থী। তাঁদের বক্তব্য, ইদ-উল-আজহায় কোরবানির জন্য বড় পশু জবাই বহু মুসলিম পরিবারের কাছে অর্থনৈতিকভাবে জরুরি, কারণ উৎসবের আগে ছাগল ও ভেড়ার দাম ব্যাপক বেড়ে যায়। মহুয়া মৈত্রের আইনজীবী শাদান ফারাসত আদালতে যুক্তি দেন, ইসলামে কোরবানির জন্য সুস্থ পশু বলি দেওয়ার প্রথা রয়েছে, অসুস্থ বা অক্ষম পশু নয়। তাই ইদ-উল-আজহার ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের আইনের ১২ নম্বর ধারার অধীনে ছাড় দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।

রিভিউ না চেয়ে কেন বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ?

পাল্টা রাজ্যের পক্ষের আইনজীবীরা জানান, রাজ্য সরকার নিজে উদ্যোগী হয়ে কিছু করেনি। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। রাজ্যের প্রশ্ন, ‘কেউ হাইকোর্টের সেই মূল নির্দেশের রিভিউ বা পুনর্বিবেচনা চায়নি, সবাই শুধু বিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এটি রাজ্যের একটি ‘পলিসি ডিসিশন’ বা নীতিগত সিদ্ধান্ত, যা জনস্বার্থ মামলায় এ ভাবে চ্যালেঞ্জ করা যায় না।’ কলকাতা পুরসভার (KMC) পক্ষ থেকে বলা হয়, এই বিজ্ঞপ্তি হুট করে দেওয়া হয়নি। প্রতি বছরই নিয়ম মেনে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন করা হয়। তারা আরও জানিয়েছে, আইন ভাঙার দায়ে ইতিমধ্যেই ৬১০টি ঘটনায় পদক্ষেপ করা হয়েছে। পরিকাঠামোর অভাবের কথাও মানতে চায়নি কলকাতা পুরসভা। তারা জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব চিহ্নিত কসাইখানা, পরিকাঠামো এবং কর্মী-চিকিৎসক রয়েছে।

“অপরিহার্য ধর্মীয় অনুশীলন” নয়

আদালত জানায়, সুপ্রিম কোর্ট আগেই রায় দিয়েছে যে ইদ-উল-আজহায় গরু কোরবানি “অপরিহার্য ধর্মীয় অনুশীলন” নয়। সেই কারণে রাজ্যের বিজ্ঞপ্তিতে হস্তক্ষেপ করার কোনও ভিত্তি নেই। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, ২০১৮ সালের একটি মামলায় হাইকোর্টের সমন্বয় বেঞ্চ যে নির্দেশ দিয়েছিল, বর্তমান বিজ্ঞপ্তি মূলত তারই বাস্তবায়ন। হাইকোর্ট আরও নির্দেশ দেয়, রাজ্য সরকার যেন বিজ্ঞপ্তিতে দ্রুত দুটি নতুন শর্ত যোগ করে—
১) খোলা বা জনসমক্ষে কোনও পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
২) ইদ-উল-আজহার সঙ্গে গরু কোরবানি ধর্মীয়ভাবে আবশ্যিক নয়— এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

পশু হত্যার অনুমতি মিলবে কী করে?

পুরসভার চেয়ারম্যান অথবা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন পশু চিকিৎসকের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। তাঁদের যৌথ স্বাক্ষর প্রয়োজন। যদি তাঁরা উভয়েই নিশ্চিত হন ও লিখিতভাবে মত প্রকাশ করেন যে পশুটি ১৪ বছরের বেশি বয়স্ক ও কাজ বা প্রজননের পক্ষে অনুপযুক্ত তখন তাঁরা শংসাপত্র দেবেন। কোনও ব্যক্তিকে যদি এই শংসাপত্র দিতে কেউ অস্বীকার করা হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি উক্ত শংসাপত্র না পাওয়ার ঘটনার ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানাতে পারবেন।

ছাড় দেওয়া যায় কিনা, বিবেচনা করুক সরকার

বকরি ইদে ‘ধর্মীয় কারণে’ গো বলিতে ছাড় দেওয়া যায় কিনা, তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খতিয়ে দেখতে রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। তবে বকরি ইদকে সামনে রেখে কসাইখানা চালানো ও গো বলি নিয়ে দায়ের ১১ মামলার শুনানি শেষে রাজ্যের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিই বজায় রেখেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে খারিজ করেছে মামলাকারীদের বিজ্ঞপ্তি খারিজের আবেদন। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ রায়ে জানিয়েছে, যেহেতু ১৯৫০ সালের এই সংক্রান্ত আইনে ধর্মীয়, চিকিৎসা ও গবেষণার মতো কারণে পশু বলিতে ছাড় দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাই এই ক্ষেত্রে ধর্মাীয় কারণে ছাড় দেওয়া যায় কিনা, তা বিবেচনা করুক সরকার। অর্থাৎ, এই বিষয়ে বল এখন রাজ্যের কোর্টেই। রাজ্যকে শংসাপত্র ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মামলা চলবে, কিন্তু আপাতত কোনও স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়নি। হাইকোর্ট মনে করিয়ে দিয়েছে, বিহার রাজ্য সরকার বনাম মহম্মদ হানিফ কুরেশির মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের কথা। শীর্ষ আদালত বলেছিল, গরু জবাই ইদ-উজ-জোহার অংশ নয়, ইসলামে তা ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তাও নয়।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share