Navanethem Navi Pillay: ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিচারপতি নাভি পিল্লাই

navanethem navi pillay indian origin jurist wins 2026 nobel peace prize

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট বিচারপতি নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এই আইনজ্ঞ বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং গণহত্যার অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে নোবেল কমিটির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৯ অক্টোবর, শুক্রবার এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নোবেল কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি আরও বিস্তৃত করা এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের অবদান উল্লেখযোগ্য। মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষায় তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনে

১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি দরিদ্র পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় চলছিল বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থা, যেখানে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের অধিকার ও সুযোগ সীমিত করা হতো। পিল্লাইয়ের বাবা নারায়ণস্বামী নাইডু বাসচালক হিসেবে কাজ করতেন এবং সংসার চালাতে মাছ ধরার মতো অতিরিক্ত কাজও করতেন। মা সন্থামা নাইডু ছিলেন গৃহবধূ। আট ভাইবোনের মধ্যে পিল্লাই ছিলেন পঞ্চম। তাঁর পূর্বপুরুষেরা উনিশ শতকের শেষভাগে ভারত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁরা মূলত নাটাল অঞ্চলের চিনির খেতে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন। প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান পিল্লাই। পরবর্তী সময়ে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি জুরিডিক্যাল সায়েন্সে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম সারির নারী আইনজীবীদের একজন

১৯৬৭ সালে নাটাল প্রদেশে নিজস্ব আইনচর্চা শুরু করেন পিল্লাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওই অঞ্চলে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করা প্রথম মহিলা ছিলেন। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী এবং নিপীড়িত মানুষের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে মনোনীত প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মহিলাও ছিলেন তিনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর কর্মজীবনের এই অধ্যায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি ও সমানাধিকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে ঐতিহাসিক ভূমিকা

নাভি পিল্লাইয়ের আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পায় রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি হিসেবে কাজ করার সময়। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ট্রাইব্যুনালের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলা ছিল রুয়ান্ডার তাবা অঞ্চলের প্রাক্তন মেয়র জঁ-পল আকায়েসুর বিচার। তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যায় সরাসরি ও প্রকাশ্যে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক রায়ে আদালত জানায়, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হলে ধর্ষণ ও যৌন হিংসা গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পরিস্থিতি ও অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী এগুলি মানবতাবিরোধী অপরাধও হতে পারে। এই রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে যৌন হিংসার বিচার এবং সংঘাতের সময় নারীদের ওপর সংঘটিত অপরাধের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করে। গণহত্যায় প্রচারমাধ্যম ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা এবং উসকানির জন্য তাঁদের দায়বদ্ধতা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যুনালের রায়গুলি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

আন্তর্জাতিক আদালত ও রাষ্ট্রসংঘে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পিল্লাই। ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। একই বছর রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংঘাত এবং নিপীড়নের ঘটনায় আন্তর্জাতিক নজরদারি ও জবাবদিহির প্রশ্নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগসংক্রান্ত মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত হয়। গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) পৃথক প্রতিষ্ঠান—প্রথমটি ব্যক্তির আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করে, আর দ্বিতীয়টি মূলত রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি করে। পিল্লাই রাষ্ট্রসংঘের প্যালেস্টাইন-বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্বও দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যৌন হিংসা, গণহত্যা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে অবদান

নোবেল কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধের সংজ্ঞা এবং আইনি মানদণ্ড বিকাশেও পিল্লাইয়ের অবদান রয়েছে। বিশেষ করে গণহত্যা, যৌন হিংসা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক আইনকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনও ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের ক্ষমতা যেন গুরুতর অপরাধের বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া। অপরাধের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার এবং রাষ্ট্রের আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্নেও তিনি বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন।

ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার বার্তা

নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যমূলক সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় মানবাধিকার রক্ষার বিস্তৃত পরিসর পর্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, গণহত্যার বিচার এবং অপরাধের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের বিষয়গুলি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। নোবেল কমিটির বক্তব্যের সারমর্ম হলো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন কাজ করে গিয়েছেন নাভি পিল্লাই।

 

 

 

 

 

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share