Delhi Couple Arrested: টাকার বিনিময়ে ভারতীয় সিম পাচার পাকিস্তানে! আইএসআই-চক্রে গ্রেফতার দিল্লির দম্পতি

delhi-couple-pakistan-espionage-network-isi

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাজধানীতে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-সমর্থিত একটি সন্দেহভাজন গুপ্তচরচক্রের হদিশ পাওয়ার দাবি করল দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। এই ঘটনায় দিল্লির বাসিন্দা এক দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে পাকিস্তান-ভিত্তিক গোয়েন্দা অপারেটিভদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ভারতের স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ ও পাচারের কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। গ্রেফতার হওয়া দু’জন হল ২৫ বছরের সাহিল এবং তার ২১ বছরের স্ত্রী সমীরা। পুলিশের দাবি, পাকিস্তানে থাকা হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তারা একাধিক ভারতীয় সিম কার্ড সংগ্রহ করে পাকিস্তানে পাঠিয়েছিল। তদন্তে দিল্লি থেকে করাচি ও ইসলামাবাদ পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের যোগাযোগের সূত্র মিলেছে বলেও জানিয়েছে স্পেশাল সেল।

পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল ৮টি ভারতীয় সিম কার্ড

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সাহিল ও সমীরা মোট ৮টি ভারতীয় সিম কার্ড সংগ্রহ করে দুবাইয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানে পাঠিয়েছিল। এর বিনিময়ে পাকিস্তান-ভিত্তিক হ্যান্ডলারদের কাছ থেকে তারা প্রায় ৩০ হাজার টাকা পেয়েছিল বলে অভিযোগ।  তদন্তকারীদের দাবি, পাকিস্তানে পৌঁছনোর পর ওই সিম কার্ড ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করা হয়। সেই অ্যাকাউন্টগুলির মাধ্যমে পাকিস্তানি গোয়েন্দা অপারেটিভরা ভারতের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করত এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাত। পুলিশের আরও অভিযোগ, ওই হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টগুলির কয়েকটি ভারতীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও প্রবেশের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন গ্রুপে থাকা তথ্য সংগ্রহ করা।

সোশ্যাল মিডিয়া থেকে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ— কীভাবে চলত নেটওয়ার্ক?

স্পেশাল সেলের তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তান-ভিত্তিক হ্যান্ডলাররা ভারতের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। এর মধ্যে কথিত ‘ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার’ এবং ‘স্লিপার সেল’-এর সদস্যরাও থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। সোশ্যাল মিডিয়া এবং এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই যোগাযোগ চালানো হত বলে জানিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ, শুধু সিম কার্ড পাচার নয়, ভারতের মাটিতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের যোগাযোগের জন্য একটি বিস্তৃত ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরির অভিযোগও সামনে এসেছে।

সামরিক এলাকায় রেকি করার অভিযোগ

এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সামরিক এলাকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ। পুলিশের দাবি, সাহিলকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় গিয়ে রেকি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি গুপ্তচরবৃত্তি এবং মাঠপর্যায়ের অপারেশনের জন্য নতুন লোক নিয়োগের দায়িত্বও তার উপর ছিল বলে অভিযোগ।

তদন্তকারীদের আরও দাবি, সামরিক আদালত বা ট্রাইব্যুনালে চলা কোর্ট মার্শাল সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া কিছু ভারতীয় সেনাকর্মীর সম্পর্কেও সাহিল তথ্য সরবরাহ করেছিল। ফলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, এই নেটওয়ার্কের লক্ষ্য শুধুমাত্র সাধারণ তথ্য সংগ্রহ ছিল না। ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো, সেনা সদস্য এবং সামরিক কার্যকলাপ সম্পর্কে স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছিল বলেই অভিযোগ।

ইনস্টাগ্রাম থেকেই শুরু যোগাযোগ

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সাহিলের সঙ্গে পাকিস্তানি এজেন্টের প্রথম যোগাযোগ হয় ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে ২০২৪ সালে। এই যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমীরার ভূমিকা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। সাহিল ২০২২ সালে সমীরার সঙ্গে আলাপ হয় এবং পরবর্তীতে তারা বিয়ে করে। এরপর ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানি এক এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়। ওই এজেন্টই পরে দম্পতিকে পাকিস্তানের এক গোয়েন্দা অপারেটিভের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। অভিযোগ, ওই গোয়েন্দা অপারেটিভ আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দম্পতিকে গুপ্তচরচক্রে কাজ করতে রাজি করায়।  এরপর তাদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল দিল্লিতে নেটওয়ার্ককে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া, ভারতীয় সিম কার্ড সংগ্রহ ও পাঠানো এবং নতুন ব্যক্তিদের গুপ্তচরবৃত্তি ও ফিল্ড অপারেশনে যুক্ত করার চেষ্টা।

মোবাইল ফোন থেকেই মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

চাঁদ বিবি ক্যাম্প এলাকা থেকে সাহিলকে প্রথমে গ্রেফতার করে স্পেশাল সেল। তিনি মহম্মদ আশফাকের ছেলে বলে পুলিশ জানিয়েছে।  সাহিলের মোবাইল ফোনের ফরেন্সিক পরীক্ষার সময় পাকিস্তানি এজেন্টদের সঙ্গে তার কথোপকথনের তথ্য তদন্তকারীদের হাতে আসে বলে দাবি। সেই চ্যাটের সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা সমীরার ভূমিকার বিষয়ে জানতে পারেন।

এরপর সমীরাকেও গ্রেফতার করা হয়। তার মোবাইল ফোনে সাহিল এবং পাকিস্তান-ভিত্তিক হ্যান্ডলারদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ও কথোপকথনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। দম্পতির কাছ থেকে মোট দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, ওই ডিভাইসগুলিতে পাকিস্তানি গোয়েন্দা অপারেটিভদের সঙ্গে কথাবার্তা এবং ভারতে থাকা নেটওয়ার্কের বিভিন্ন যোগাযোগ ও কার্যকলাপের তথ্য রয়েছে।

কারা এই সাহিল ও সমীরা?

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে জন্ম সাহিল দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি (IGNOU) থেকে কলায় স্নাতক পাশ করেছে। সে এক আইনজীবীর সঙ্গে কাজ করত এবং ভবিষ্যতে এলএলবি পড়ার পরিকল্পনা ছিল। ২০২৫ সালের জুনে সে চাকরি ছেড়ে দেয়। এরপর থেকে সে বেকার ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। অন্যদিকে, ২০০৫ সালে জন্ম সমীরা কেশবপুরমের কন্যা বিদ্যালয় থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে। পরে করেসপন্ডেন্স-এর মাধ্যমে বিএ ডিগ্রি অর্জন করে। গ্রেফতারের আগে নয়ডার একটি কল সেন্টারে কাজ করছিল।

কীভাবে সামনে এল পুরো নেটওয়ার্ক?

স্পেশাল সেলের কাছে প্রথমে খবর আসে, সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, তাদের কথিত ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার  এবং স্লিপার সেলকে দিল্লি থেকে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।তদন্ত যত এগোয়, ততই সামনে আসে এমন কিছু স্থানীয় ব্যক্তির নাম, যারা ভারতীয় সিম কার্ড সংগ্রহ, পাকিস্তান-ভিত্তিক হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভারতের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সাহায্য করছিল বলে অভিযোগ। সেই তদন্তেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সাহিলের নাম সামনে আসে। তার মোবাইলের ফরেন্সিক পরীক্ষার পর পাকিস্তানি এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। এরপর সেই সূত্র ধরে সমীরার কথিত ভূমিকা এবং বৃহত্তর নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করেছে স্পেশাল সেল।

তদন্তে এখন নজর কোথায়?

দিল্লি পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সাহিল ও সমীরাকে গ্রেফতার করার ফলে পাকিস্তান-ভিত্তিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং ভারতে থাকা তাদের কথিত যোগাযোগকারীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গিয়েছে।বিশেষ করে ভারতীয় সিম কার্ড কীভাবে পাকিস্তানে পৌঁছত, সেই সিম ব্যবহার করে কারা হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট চালাত, ভারতীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা হয়েছিল এবং সামরিক এলাকার কোন কোন তথ্য পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের কাছে পৌঁছেছিল— এই বিষয়গুলিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

তদন্তকারীদের দাবি সত্যি হলে, ঘটনাটি শুধুমাত্র দু’জনের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ নয়; বরং পাকিস্তান-ভিত্তিক হ্যান্ডলারদের সঙ্গে ভারতের মাটিতে থাকা সম্ভাব্য সহযোগীদের মধ্যে কীভাবে ডিজিটাল যোগাযোগ, সিম কার্ড এবং স্থানীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি সামনে আনতে পারে এই মামলা। তবে এই সমস্ত অভিযোগই পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে; আদালতে অভিযোগগুলি প্রমাণিত হওয়া এখনও বাকি।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share