West Bengal Conversion Row: বিনামূল্যে পড়াশোনা নাকি ধর্মীয় প্রচার! ‘হিলিং’ ও প্রার্থনা সভার আড়ালে ধর্মান্তরণের অভিযোগ

west bengal conversion row know the details locals are pushing back against christian conversion activities

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ধর্মান্তরণকে ‘অত্যন্ত গুরুতর বিষয়’ বলে আগেই চিহ্নিত করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এর আগে একাধিক বার আদালত জানায়, বেআইনি ভাবে কাউকে ধর্মান্তরিত করা অপরাধ।পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মান্তরণ (West Bengal Conversion Row) সংক্রান্ত অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, বাঁকুড়ার সোনামুখী এবং জলপাইগুড়িতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মীয় সংগঠন বা ধর্মপ্রচারকদের বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। কোথাও বিদেশি নাগরিকের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কোথাও বিনামূল্যে পড়ানোর কেন্দ্রকে ঘিরে প্রতিবাদ হয়েছে, আবার কোথাও প্রার্থনা ও ‘হিলিং’ কর্মসূচির আড়ালে ধর্মান্তরণের অভিযোগ উঠেছে। তবে এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ। পুলিশ ও প্রশাসনের তরফে বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে অভিযোগ এবং প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখাও জরুরি।

হিঙ্গলগঞ্জে বিদেশি নাগরিককে ঘিরে বিতর্ক

সাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভা এলাকায়। অভিযোগ, আর্জেন্টিনার এক নাগরিক বেশ কয়েক মাস ধরে ওই এলাকায় ছিলেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি বাংলা ভাষা শিখেছিলেন এবং এলাকার কয়েকটি ‘হাউস চার্চ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ করেন, ওই বিদেশি নাগরিক স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর গ্রামবাসীরা ওই ব্যক্তিকে তাঁর ধর্মীয় কর্মকাণ্ড এবং এলাকায় থাকার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করেন। তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় অনুমতি রয়েছে কি না, ধর্মীয় কার্যকলাপের সঙ্গে তিনি যুক্ত কি না—তা নিয়েও স্থানীয়রা জানতে চান।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, আর্থিকভাবে দুর্বলরাই নজরে

হিঙ্গলগঞ্জের সান্দেলেরবিল গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় কথিত ধর্মীয় সমাবেশের খবর পেয়ে পুলিশ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাঁদের মধ্যে দু’জন বিদেশি নাগরিক বলে জানা গিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কয়েকজন একটি বাড়িতে জড়ো হয়ে আদিবাসী এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষকে ধর্ম পরিবর্তনের জন্য প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, কলকাতার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, বাংলাদেশ এবং আর্জেন্টিনা থেকেও লোকজন নিয়মিত ওই বাড়িতে আসতেন। আর্থিকভাবে দুর্বল সুন্দরবন-সংলগ্ন পরিবারের মানুষকে টাকা বা অন্য কোনও সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ ওঠে। তবে পুলিশ এখনও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, তাঁদের এলাকায় আসার উদ্দেশ্য এবং ধর্মান্তরণের অভিযোগের কোনও বাস্তব ভিত্তি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে।

হাসনাবাদে বিনামূল্যে কোচিং কেন্দ্র ঘিরে প্রতিবাদ

একই ধরনের বিতর্ক দেখা দিয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার হাসনাবাদ এলাকাতেও। একটি খ্রিস্টান পরিচালিত বিনামূল্যের কোচিং সেন্টারে শিশুদের পড়াশোনা করানো হলেও সেখানে যিশু ও বাইবেল সংক্রান্ত (Christian Conversion Activities) বিভিন্ন ধর্মীয় উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ তুলে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেন। হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ ওই কেন্দ্রে গিয়ে কার্যকলাপ বন্ধের দাবি জানান। প্রতিবাদকারীদের একজন সুপর্ণা বেরার অভিযোগ, শিশুদের বিনামূল্যে পড়ানোর পাশাপাশি সেখানে খ্রিস্টান ধর্মীয় বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাদের জানানো হচ্ছিল। কেন্দ্রের দেওয়ালে যিশুর ছবি থাকার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে এই ধরনের কার্যকলাপ চলছিল। তবে এতদিন স্থানীয়রা সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ করেননি। সম্প্রতি স্থানীয়দের একাংশ একত্রিত হয়ে এর বিরোধিতা করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

শিশুদের বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগই উদ্দেশ্য!

অন্যদিকে, কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া। স্থানীয় বাসিন্দারা আপত্তি জানানোর পর কেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলেও তিনি জানান। ধর্মীয় কার্যকলাপ নিয়ে স্থানীয়দের আপত্তি থাকলে তা চালিয়ে যাওয়া হবে না বলেও ওই ব্যক্তি ইঙ্গিত দেন।

সোনামুখীতেও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঘিরে উত্তেজনা

বাঁকুড়ার সোনামুখীতেও একটি খ্রিস্টান ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে আয়োজকদের বিরোধের ঘটনা সামনে এসেছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘হিলিং’ বা প্রার্থনা সভার আড়ালে স্থানীয় মানুষ এবং আদিবাসীদের ধর্মান্তরণের চেষ্টা করা হচ্ছিল। যদিও এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় একটি সংগঠনের সদস্যরা অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে আয়োজকদের কাছে বিভিন্ন বই ও বিতরণ করা সামগ্রী সম্পর্কে জানতে চান। কথোপকথনের সময় তাঁরা প্রশ্ন করেন, ওই বইগুলির মধ্যে বাইবেল রয়েছে কি না এবং অনুষ্ঠানে আসলে কী ধরনের বিষয় শেখানো হচ্ছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বিতরণ করা সামগ্রী প্রার্থনার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দু’পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়।

জলপাইগুড়িতে ধর্ম নিয়ে তর্কে মুখোমুখি মহিলা ও ধর্মপ্রচারক

জুলাই মাসে জলপাইগুড়িতেও ধর্মপ্রচারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার একটি ভিডিও সামনে আসে। সেখানে এক বাঙালি মহিলা এক খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। ভিডিওতে ওই মহিলাকে সনাতন ধর্মের উৎপত্তি ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, সনাতন ধর্মের কোনও একক প্রতিষ্ঠাতা নেই এবং ‘সনাতন’ কোনও ব্যক্তির নাম নয়, এটি একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য। ঘটনাটি ধর্মীয় প্রচার, বিশ্বাস এবং ধর্মান্তরণ নিয়ে স্থানীয় স্তরে তৈরি হওয়া উত্তেজনারই আরেকটি উদাহরণ হিসেবে সামনে আসে।

ধর্মান্তরণ নিয়ে বাড়ছে স্থানীয়দের প্রতিবাদ

হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, সোনামুখী এবং জলপাইগুড়ির ঘটনাগুলিকে একসঙ্গে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—ধর্মীয় প্রচার ও ধর্মান্তরণের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় স্তরে প্রতিক্রিয়া বাড়ছে। কোথাও বিদেশি নাগরিকের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, কোথাও শিশুদের পড়াশোনার সঙ্গে ধর্মীয় বিষয়বস্তু যুক্ত করার অভিযোগ উঠছে, আবার কোথাও প্রার্থনা বা ‘হিলিং’ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা। প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য, আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবার, আদিবাসী সম্প্রদায় বা শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা, সাহায্য কিংবা প্রার্থনার নামে ধর্মীয়ভাবে প্রভাবিত করা উচিত নয়। তাঁদের অভিযোগ, টাকা বা অন্য কোনও সুবিধার বিনিময়ে ধর্ম পরিবর্তনের চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ধর্মীয় প্রচার-ধর্মীয় শিক্ষা বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরণ!

তবে ধর্মীয় প্রচার বা ধর্মীয় শিক্ষা এবং বেআইনি বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরণের মধ্যে আইনি পার্থক্য রয়েছে। কোনও ব্যক্তিকে জোর করে, প্রতারণার মাধ্যমে বা অবৈধ প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে স্থানীয়দের প্রতিবাদ যেমন ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আনছে, তেমনই অভিযোগগুলির সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share