মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার পশ্চিম মেদিনীপুরের (Paschim Medinipur) পিংলায় মিলল এক পাক গুপ্তচর চক্রের হদিশ। ভারতীয় সিম কার্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর কর্তাদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপের ওটিপি (OTP) সরবরাহ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মোবাইল সিমের ওটিপি বিক্রির আড়ালে এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক চালানো হচ্ছিল বলে জানা গেছে। তবে এই অভিযান ও চক্রের বিষয়ে জেলা পুলিশ সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল বলে দাবি করেছেন জেলা পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা। তিনি বলেন,‘‘পিংলায় অভিযান চালিয়ে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ (STF) দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে ওটিপি সরবরাহ করে পাকিস্তানে (Pakistan) তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পুরো বিষয়টি এসটিএফ-এর এক্তিয়ারভুক্ত, এর বেশি তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’’
গভীর রাতে এসটিএফ-এর অভিযান (Paschim Medinipur)
মঙ্গলবার গভীর রাতে পশ্চিম মেদিনীপুরের (Paschim Medinipur) পিংলার ক্ষীরাই গ্রাম থেকে মুরসেলিন ও গৌতম খাঁড়া নামে দুই যুবককে গ্রেফতার করেন রাজ্য স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (STF) আধিকারিকেরা। তদন্তে জানা গেছে, প্রতিটি ওটিপি-র বিনিময়ে ধৃতেরা মোটা টাকা পেত। মূলত ভারতীয় সিম ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট সচল রাখত পাক গোয়েন্দারা, যাতে এখানকার চরদের সঙ্গে নির্বিঘ্নে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। একদিকে ওটিপি বিক্রি, অন্যদিকে দেশবিরোধী তথ্য পাচারের অভিযোগ—এই দ্বিমুখী অপরাধের তদন্তে নেমে ধৃতদের কাছ থেকে প্রচুর সিম কার্ড উদ্ধার করেছে পুলিশ। এমনকি মূল অভিযুক্ত মুরসেলিন তাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় গিয়ে আইএসআই কর্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছিল বলেও তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।
ভুয়ো নথিতে হাজার হাজার সিম, তদন্তে চক্ষু চড়কগাছ
গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বেঙ্গল এসটিএফ জানতে পারে যে, পিংলার একটি দোকান থেকে ভুয়ো নথি ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সিম কার্ড তোলা হচ্ছে। সেই সিমগুলো কারা কিনছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন তদন্তকারীরা। সংশ্লিষ্ট মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, ওই নম্বরগুলি দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এরপরই পিংলার (Paschim Medinipur) সেই নির্দিষ্ট সিম বিক্রেতার দোকানে হানা দেন তদন্তকারীরা। সেখানে সিমের স্টক মেলাতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠে অফিসারদের। দেখা যায় প্রতি মাসে হাজার হাজার সিম বিক্রি হচ্ছে সেখান থেকে। দোকানদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গৌতম খাঁড়ার নাম সামনে আসে এবং জানা যায় যে এই সিমগুলো কিনছিল স্থানীয় বাসিন্দা মুরসেলিন।
এক একটি ওটিপি-র দাম আড়াই হাজার টাকা!
তদন্তে উঠে এসেছে, এক একটি সিম কার্ড পাঁচ থেকে ছয়শো টাকায় কেনা হত। এরপরই গ্রাম থেকে মুরসেলিনকে আটক করা হয়। তাকে জেরার মুখে জানা যায়, ভারতীয় সিম দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলছিল পাক আইএসআই কর্তারা, আর সেই অ্যাকাউন্টের ওটিপি জোগান দিচ্ছিল এই চক্রটি। প্রতিটি ওটিপি সরবরাহের জন্য ধৃতেরা দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত রোজগার করত। অপরাধের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই দু’জনকে গ্রেফতার করে এসটিএফ। মুরসেলিন আরও জানায়, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এক পাকিস্তানি (Pakistan) আইএসআই অফিসারের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়। ভারতীয় সিমের ওটিপি দিলে মোটা টাকা মিলবে—এই লোভনীয় টোপ গিলে সে এই চক্রে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ গুপ্তচর অফিসারের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ভারতীয় নম্বর দিয়ে খোলা সেই হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেই পাক কর্তারা ভারতের মাটিতে থাকা তাদের চরদের নির্দেশ পাঠাত।
দেশজুড়ে জাল, তদন্তে কেন্দ্রীয় সংস্থাও
অভিযুক্ত পিংলার বাসিন্দা (Paschim Medinipur) মুরসেলিন সরাসরি চরবৃত্তির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে প্রাথমিক অনুমিত। এই চক্রের পরিধি কতখানি বিস্তৃত, কতজন পাক অফিসারের সঙ্গে এদের যোগাযোগ ছিল এবং কী কী সংবেদনশীল তথ্য পাচার করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই পিংলা জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। প্রসঙ্গত, এই ঘটনার ঠিক সাতদিন আগেই কলকাতা থেকে পাকিস্তানে তথ্য পাচারের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ (NIA)। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, বিপুল অর্থ এবং পাকিস্তানি (Pakistan) নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে সে পাকিস্তানি গোয়েন্দা আধিকারিকদের (PIOs) কাছে ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল নথি ও তথ্য পাচার করছিল।

Leave a Reply