জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরীর পর এই প্রথম সেনার কোনও আর্মার্ড কোর অফিসার সেনাপ্রধান হলেন
মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শীর্ষস্তরে বড় রদবদল। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর (Indian Army) ৩১তম সেনাপ্রধান (Chief of the Army Staff) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন জেনারেল ধীরজ শেঠ (General Dhiraj Seth)। তিনি প্রায় তিন দশক পর প্রথম আর্মার্ড কোর (Armoured Corps)-এর অফিসার, যিনি সেনাপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হলেন। এর আগে ১৯৯৭ সালে জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী অবসর নেওয়ার পর আর কোনও আর্মার্ড কোর অফিসার এই দায়িত্ব পাননি। এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে শুধু সেনাপ্রধানের পদেই নয়, ভারতীয় সেনাবাহিনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডেও ব্যাপক রদবদল ঘটল। একইসঙ্গে ভারতীয় বায়ুসেনাতেও শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতে তিন বাহিনীর যৌথ যুদ্ধ প্রস্তুতি, আধুনিকীকরণ এবং থিয়েটার কমান্ড গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
দক্ষিণ ব্লকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হস্তান্তর
নয়াদিল্লির দক্ষিণ ব্লকের লনে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হয়। বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী চার দশকেরও বেশি সামরিক জীবনের ইতি টানার আগে গার্ড অফ অনার গ্রহণ করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জেনারেল ধীরজ শেঠ। এই পরিবর্তন ভারতের প্রতিরক্ষা নেতৃত্বে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, মাত্র এক মাস আগেই চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ (CDS) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জেনারেল এনএস রাজা সুব্রমণি এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ স্বামীনাথন। ফলে তিন বাহিনীর নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের হাতে দায়িত্ব চলে এল।
কে এই জেনারেল ধীরজ শেঠ?
জেনারেল ধীরজ শেঠ খড়্গবাসলায় স্থিত ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমির (NDA) প্রাক্তনী। ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি আর্মার্ড কোরে কমিশনপ্রাপ্ত হন। প্রায় চার দশকের দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি প্রচলিত যুদ্ধ, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টাফ নিয়োগে কাজ করেছেন। তাঁর সামরিক জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল, পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল কমান্ডের নেতৃত্ব দেওয়া। তিনি প্রথমে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে জয়পুরভিত্তিক সাউথ ওয়েস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ (GOC-in-C) হন। পরে পুনে-ভিত্তিক সাদার্ন কমান্ডের নেতৃত্বও গ্রহণ করেন। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল তিনি ভাইস চিফ অফ দ্য আর্মি স্টাফ (Vice Chief of the Army Staff) হিসেবে দায়িত্ব নেন। সেখান থেকেই তিনি এবার দেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদে উন্নীত হলেন।
সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে একাধিক পরিবর্তন
জেনারেল ধীরজ শেঠ সেনাপ্রধান হওয়ার ফলে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও রদবদল হয়েছে। ভাইস চিফ অফ দ্য আর্মি স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সন্দীপ জৈন। তিনি এতদিন সাদার্ন কমান্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অন্যদিকে, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজেশ পুষ্কর। বর্তমানে তিনি আম্বালা-ভিত্তিক দ্বিতীয় স্ট্রাইক কোরের (II Strike Corps) নেতৃত্বে রয়েছেন। ১ জুলাই পুনেতে সাদার্ন আর্মি কমান্ডের নতুন প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাজেশ পুষ্করও আর্মার্ড কোরের অফিসার। ফলে এই রদবদলে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ড কমান্ডগুলিতে আর্মার্ড কোরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেল।
সাউথ-ওয়েস্টার্ন কমান্ডেও নতুন নেতৃত্ব
জয়পুর-ভিত্তিক সাউথ ওয়েস্টার্ন কমান্ডের নতুন প্রধান হচ্ছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহিত মালহোত্রা। বর্তমানে তিনি কলকাতার ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ হিসেবে কর্মরত। ১৯৮৯ সালের জুন মাসে ৪৭তম আর্মার্ড রেজিমেন্টে কমিশনপ্রাপ্ত মালহোত্রা এবার এমন একটি কমান্ডের দায়িত্ব নিতে চলেছেন, যা পাকিস্তান সীমান্তে ভারতের অন্যতম সংবেদনশীল সামরিক দায়িত্ব বহন করে। তিনি অবসরগ্রহণকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল মঞ্জিন্দর সিং-এর স্থলাভিষিক্ত হবেন।
ভারতীয় বায়ুসেনাতেও নেতৃত্বে পরিবর্তন
শুধু সেনাবাহিনী নয়, ভারতীয় বায়ুসেনাতেও গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব পরিবর্তন হতে চলেছে। এয়ার মার্শাল আশুতোষ দীক্ষিত নতুন ভাইস চিফ অফ দ্য এয়ার স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। সামরিক সিনিয়রিটির নিরিখে তিনি আগামী অক্টোবর মাসে অবসর নিতে চলা বর্তমান বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল অমরপ্রীত সিং-এর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছেন। ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ফাইটার স্ট্রিমে কমিশনপ্রাপ্ত আশুতোষ দীক্ষিত বর্তমানে ইন্টিগ্রেটেড ডিফেন্স স্টাফ (Integrated Defence Staff)-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফের অধীনে থাকা এই ত্রি-সার্ভিস সংস্থায় তিনি তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের থিয়েটার কমান্ড গঠনের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এর আগে তিনি বেঙ্গালুরুর এয়ারক্রাফট অ্যান্ড সিস্টেমস টেস্টিং এস্টাবলিশমেন্ট (ASTE)-এর ফ্লাইট টেস্ট স্কোয়াড্রনের কমান্ডিং অফিসার এবং ২০২৩ সালের মে মাস থেকে ডেপুটি চিফ অফ দ্য এয়ার স্টাফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
থিয়েটার কমান্ড ও আধুনিকীকরণে নতুন নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ
ভারতের প্রতিরক্ষা কাঠামো বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিন বাহিনীর যৌথ থিয়েটার কমান্ড গঠন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক অস্ত্র ও প্ল্যাটফর্ম অন্তর্ভুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা এবং সমন্বিত সামরিক কাঠামো গড়ে তোলাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার। গত কয়েক বছরে এই সংস্কার প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে এগোলেও নানা প্রশাসনিক ও কাঠামোগত কারণে তা প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ফলে নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠ, নতুন সিডিএস, নৌবাহিনী প্রধান এবং বায়ুসেনার নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই সংস্কার কর্মসূচিকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে চিন ও পাকিস্তানের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং তিন বাহিনীর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নতুন নেতৃত্বের ভূমিকা আগামী কয়েক বছরে ভারতের সামরিক কৌশল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Leave a Reply