Eye Problems in Children: শুধু মোবাইল নয়, এই সব কারণেও ছোটদের চোখে বাড়ছে সমস্যা, জানুন চোখ ভালো রাখার সহজ উপায়

screen-time-eye-health-children-myths-facts

তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল

স্বাস্থ্য সমস্যা আর বয়সের চৌকাঠে আটকে থাকছে না। বরং, খুব ছোটো থেকেই বিপদ বাড়ছে। ফলে আগাম সচেতনতা না থাকলে জীবনভর ভোগান্তির আশঙ্কা থাকছে। ভারতে দৃষ্টিশক্তি নিয়ে সমস্যা সম্পর্কে এমনটাই জানাচ্ছেন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞরা। অগাস্ট মাসে দেশ জুড়ে ন্যাশনাল আই এক্সাম মান্থ পালন হয়। চলতি বছরের থিম, ‘হেলদি লাইফ, হেলদি আইস’! চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, একাধিক রোগের ঝুঁকির নেপথ্যে থাকে জীবনযাপনের ধরণ। আর সেই তালিকায় বাদ নেই চোখের সমস্যা।

দেশ জুড়ে ক্রমশ বাড়ছে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যেও উদ্বেগজনক হারে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা বাড়ছে। যার ফলে জীবনভর নানান ভোগান্তি হচ্ছে। দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের সমস্যার পাশাপাশি চোখে নানান রকম ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনাও বাড়ছে। ফলে, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে। অনেকেই মনে করেন, মোবাইল দেখার জেরেই কমবয়সীদের মধ্যে চোখের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, শুধুমাত্র মোবাইল বা ল্যাপটপের জন্যই চোখের সমস্যা হচ্ছে না। বরং নেপথ্যে থাকছে একাধিক কারণ।

কেন ভারতে চোখের সমস্যা বাড়ছে?

চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভারতে স্কুল পড়ুয়াদের চোখের সমস্যা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দেশ জুড়ে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মায়োপিয়ার সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। স্পষ্ট দেখতে না পারার সমস্যায় তারা ভুগছে। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বাইরের জগতের সঙ্গে কম মেলামেশার সুযোগের জেরেই চোখের এই ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, অধিকাংশ ভারতীয় স্কুল পড়ুয়াদের এখন মাঠে খেলাধুলা করা কিংবা বাগানে ঘোরার জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ নেই। ফলে চোখের ক্ষতি হচ্ছে। খোলা মাঠ, বাগান, সবুজ গাছপালা চোখের জন্য খুবই উপকারী। সেখানে সময় কাটানোর সুযোগ না থাকার জেরেই দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত নানান সমস্যা তৈরি হচ্ছে। স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যে চোখে ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনাও বেড়েছে। যা অনেক সময়েই চোখের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে।

পঞ্চাশ পেরোলেই বাড়ছে ছানির ঝুঁকি

তবে ছোটোদের পাশাপাশি ভারতে পঞ্চাশোর্ধ্বদের মধ্যেও মারাত্মক হারে চোখের সমস্যা বাড়ছে। বিশেষত ছানির সমস্যা দেখা দিচ্ছে।চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, চোখের নিয়মিত পরীক্ষা না করানোর জেরেই প্রৌঢ়দের মধ্যে চোখের সমস্যা জটিল হচ্ছে।ছানি হয়েছে কিনা, সেটা নির্ণয় করা জরুরি। বয়স চল্লিশ বছর পেরোলেই বছরে অন্তত একবার চোখের পরীক্ষা করা দরকার। কিন্তু অনেকেই নিয়ম মেনে তা করেন না। ফলে রোগ নির্ণয় হয় না এবং সমস্যা আরও বাড়ে। এমনকি কর্ণিয়ার ক্ষতি হয়, যা অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।

স্ক্রিন টাইম কি চোখের সমস্যার একমাত্র কারণ?

চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। কিন্তু শুধুমাত্র মোবাইল বা ল্যাপটপ দেখার জন্যই চোখের ক্ষতি হচ্ছে, এমন ধারণা ভুল। তাঁরা জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মোবাইল বা ল্যাপটপ দেখলেই চোখ খারাপ হয় না। বরং দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, নানান সংক্রমণের নেপথ্যে একাধিক কারণ থাকে। বিশেষত শিশুদের চোখের সমস্যার নেপথ্যে নানান কারণ থাকে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই কারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

শিশুদের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় গুরুত্বপূর্ণ?

চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, একজন শিশু কতক্ষণ স্ক্রিন টাইম পাচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। দিনের অধিকাংশ সময়েই কি সেই শিশু মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখছে, নাকি মোবাইল দেখার পাশাপাশি সে বাইরে খেলাধুলা করছে, সেটা বোঝা জরুরি। পাশাপাশি কমবয়সীদের জীবনযাপনের ধরন কতখানি স্বাস্থ্যকর, সেটার উপরেও তাদের চোখের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের অভ্যাসের উপরেও চোখের স্বাস্থ্য নির্ভরশীল।

স্কুল পড়ুয়াদের কতটা স্ক্রিন টাইম কম ঝুঁকিপূর্ণ?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মতো, ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের দিনে গড়ে ১ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম দেওয়া উচিত নয়।তবে একটানা এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম কখনোই স্বাস্থ্যকর নয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম হলে তার মাঝে ২০ মিনিট অন্তর চোখকে বিশ্রাম দেওয়া জরুরি। বহু স্কুল পড়ুয়াকেই এখন নানান অনলাইন ক্লাস করতে হয়। সেক্ষেত্রেও ২০-২৫ মিনিট অন্তর চোখ-মুখ ধোয়ার অভ্যাস রাখতে হবে। তাঁদের পরামর্শ, এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম থাকলে এক ঘণ্টা খেলাধুলার জন্যও বরাদ্দ করতে হবে। মাঠে বা বাগানে শারীরিক পরিশ্রম হয়, এমন খেলার সময় বের করতে হবে। তবেই চোখের সমস্যার ঝুঁকি কমবে।

চোখ ভালো রাখতে খাবারে কী রাখবেন?

পুষ্টিবিদদের একাংশ জানাচ্ছেন, চোখ ভালো রাখতে নিয়মিত নানান রকমের সব্জি খেতে হবে। তাঁদের পরামর্শ, গাজর, কুমড়ো, টমেটোর মতো সব্জি নিয়মিত খেলে চোখ ভালো থাকবে। কারণ এই ধরনের সব্জিতে বিটা ক্যারোটিন থাকে, যা ভিটামিন এ-র জোগান দেয়। এর ফলে চোখের দৃষ্টি ভালো রাখতে সাহায্য করে।

ডিম, ফল ও ডালেও নজর দিন

চোখ ভালো রাখতে নিয়মিত স্কুল পড়ুয়াদের ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, ডিমে থাকে জিঙ্ক-সহ একাধিক মিনারেল, যেগুলো চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। বিশেষত, ডিমের কুসুম চোখের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি প্রয়োজনীয়।কমলালেবু, পেয়ারার মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলও চোখের জন্য উপকারী। পুষ্টিবিদদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভিটামিন সি-র চাহিদা পূরণ হলে দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের মতো সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত এই ধরনের ফল খাওয়া জরুরি। এর পাশাপাশি বাদাম, ছোলা এবং বিভিন্ন রকমের ডাল খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ এবং ফাইবার থাকে, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

পর্যাপ্ত ঘুমও চোখের স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি

খাবারের পাশাপাশি কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস পালন জরুরি বলেই জানাচ্ছেন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, চোখ ভালো রাখতে ঘুমের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করতে হবে। দিনে অন্তত ৮-৯ ঘণ্টা ঘুমোনো জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম হলে চোখ বিশ্রাম পাবে এবং চোখের কার্যক্ষমতা বজায় থাকবে। তাছাড়া ভালো ঘুমের জন্য ঘুমোতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন টাইম বন্ধ করতে হবে। যাতে মস্তিষ্ক এবং চোখের স্নায়ু অতিরিক্ত উত্তেজিত না থাকে।

প্রতিদিন কিছুটা সময় কাটান প্রকৃতির মাঝে

নিয়মিত বাইরে কিছুটা সময় কাটাতে হবে। বাগান, পার্ক কিংবা মাঠে খেলাধুলা করার জন্য সময় দিতে হবে। পরিবেশের মধ্যে কিছুটা সময় কাটালে চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকার হতে পারে। একটানা কাজ করাও যাবে না। বরং নির্দিষ্ট সময় অন্তর চোখকে বিশ্রাম দিতে হবে।

বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা জরুরি

তবে সবকিছুর পাশাপাশি প্রতি বছর চোখের পরীক্ষা করানো জরুরি। তাহলে সমস্যা হলেও প্রাথমিক পর্বেই তা নির্ণয় করা যাবে। ফলে বড় বিপদ আটকানো সহজ হবে। ছোটো থেকে বড়—প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই চোখের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এবং নিয়মিত পরীক্ষা ভবিষ্যতের দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share