মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করলেন ভারতে নিযুক্ত চিনের (China) নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে রিয়ার অ্যাডমিরাল ইউ জিয়ান (Rear Admiral You Jian)। গত বছর কেরল উপকূলে আগুনে বিধ্বস্ত একটি কার্গো জাহাজ থেকে ১২ জন চিনা নাবিককে উদ্ধারের জন্য ভারতীয় নৌবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ভারত ও চিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’’
‘‘ভারত-চিন সম্পর্কে ইতিবাচক অগ্রগতি’’
নয়াদিল্লিতে ২১ জুলাই পিপলস্ লিবারেশন আর্মির (PLA) প্রতিষ্ঠার ৯৯তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইউ জিয়ান বলেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় ভারত-চিন সম্পর্ক আবারও উন্নয়ন ও ইতিবাচক অগ্রগতির পথে ফিরেছে। তিনি বলেন, ‘‘চিন ও ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ। বর্তমানে দুই দেশই উন্নয়ন ও পুনর্জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। আমাদের নেতাদের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আবার সঠিক পথে ফিরেছে।’’
‘‘সেই সহযোগিতা কখনও ভুলব না’’
ইউ জিয়ান বিশেষভাবে ২০২৫ সালের জুন মাসে কেরল উপকূলে ঘটে যাওয়া একটি উদ্ধার অভিযানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘‘গত জুনে কেরল উপকূলে আগুন ও বিস্ফোরণের কবলে পড়া একটি কার্গো জাহাজ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ১২ জন চিনা নাবিককে উদ্ধার করেছিল। আমরা সেই সহযোগিতা কখনও ভুলব না।’’
জ্বলন্ত জাহাজ থেকে চিনা নাবিকদের উদ্ধার ভারত
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ৯ জুন সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কনটেনার জাহাজ এমভি ওয়ান হাই ৫০৩ (MV Wan Hai 503) কেরলের আজহিক্কালের (Azhikkal) উপকূল থেকে প্রায় ৪৪ নটিক্যাল মাইল দূরে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের কবলে পড়ে। কলম্বো থেকে নাভা শেভার উদ্দেশে যাত্রারত জাহাজটিতে মোট ২২ জন নাবিক ছিলেন। বিপদের মুখে ১৮ জন নাবিককে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও চারজন নিখোঁজ হন। উদ্ধার হওয়া নাবিকদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন চিনা নাগরিক। সে সময় চিনা দূতাবাস ভারতীয় নৌবাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনীর দ্রুত ও পেশাদার উদ্ধার অভিযানের ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। পরে ভারতীয় নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও বায়ুসেনা যৌথভাবে অগ্নিনির্বাপণ ও জাহাজটিকে নিরাপদে সরানোর অভিযানও চালায়।
রাষ্ট্রসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের প্রসঙ্গ
ভারত ও চিনের সেনাবাহিনীর যৌথ অবদানের প্রসঙ্গ তুলে ইউ জিয়ান বলেন, রাষ্ট্রসংঘের (UN) শান্তিরক্ষা অভিযানে দুই দেশের সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং বহু আত্মত্যাগও করেছে। তার কথায়, ‘‘ভারত ও চিনের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ সেই পার্থক্যের তুলনায় অনেক বেশি।’’
সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার বার্তা
ভারতের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার পক্ষেও সওয়াল করেন চিনের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চাই।’’
লাদাখ অচলাবস্থার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা
২০২০ সালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) বরাবর পূর্ব লাদাখে সামরিক সংঘাত এবং গালওয়ান উপত্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা এবং চারজন চিনা সেনার মৃত্যু হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে ডেপসাং ও ডেমচক এলাকায় টহল সংক্রান্ত সমঝোতায় পৌঁছায় দুই দেশ। এর ফলে সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ কিছুটা প্রশস্ত হয়। পরবর্তীতে ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হয়। পরে ২০২৫ সালে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনের ফাঁকে তিয়ানজিনেও দুই নেতার মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উভয় দেশ একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখার উপর জোর দেয়।
সীমান্ত সংলাপ ও প্রতিরক্ষা বৈঠক অব্যাহত
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠক হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং চিনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডং জুনের মধ্যে এসসিও বৈঠকের ফাঁকে আলোচনা হয়। এছাড়া সীমান্ত বিষয়ক ওয়ার্কিং মেকানিজমের ৩৫তম বৈঠক বেজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়। পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র বৈঠকেও দুই দেশ সম্পর্কের ‘‘ধীরে ধীরে স্বাভাবিকীকরণ’’ নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে। তবে ইউ জিয়ানের বক্তব্যে ভারত-চিন যৌথ সামরিক মহড়া পুনরায় শুরু করা বা নতুন কোনও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ব্যবস্থার ঘোষণা করা হয়নি।

Leave a Reply