Cyclone Arnab: মধ্যরাতে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, ১৩৫ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়া! বিপর্যস্ত জনজীবন

cyclone arnab landfall

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মধ্যরাতে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় অর্ণব (Cyclone Arnab)। প্রবল আকারেই তার ‘ল্যান্ডফল’ হচ্ছে। ভারতের মৌসম ভবন জানিয়েছে, বুধবার রাত ১টা ২০ মিনিটে ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাড়ার নিকটবর্তী পুদুচেরির ইয়ানামের কাছে ‘ল্যান্ডফল’ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঝড় বইছে ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার বেগে। প্রবল ঝড়, মুষলধারে বৃষ্টি সঙ্গে উত্তাল সমুদ্র। ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণবে’র প্রভাবে বিপর্যস্ত অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় এলাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় সতর্কতা জারি হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল, সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের ঊপকূলভাগেও। দিঘা, মন্দারমনি একাধিক জায়গায় ইতিমধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশাখাপত্তনমে ২১৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে এখনও।

অন্ধ্র উপকূলে ঝড়ের দাপট

আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম-মধ্য অংশ থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের বাপাতলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূল অতিক্রম করেছে অর্ণব। ইয়ানামের দক্ষিণে স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া শুরু হয় বুধবার রাত দেড়টা নাগাদ। ভোরের পরেও সেই প্রক্রিয়া চলছে। কাকিনাড়া, বিশাখাপত্তনম, অনকাপল্লি ও কোনাসীমা জেলায় ভারী বৃষ্টি এবং প্রবল হাওয়ার খবর মিলেছে। বিভিন্ন জায়গায় গাছ উপড়ে পড়েছে। কাকিনাড়ার কয়েকটি এলাকায় বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতির খবরও সামনে এসেছে। ‘ল্যান্ডফল’ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর ঝড়ের দাপট আরও বেড়ে গিয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশে। জারি করা হয়েছে উচ্চ সতর্কতা। ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগেও বেড়েছে। বেশ কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ পরিষেবা। ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে ইয়ানামের কাছে জাতীয় সড়ক ২১৬-এ বেশ কয়েকটি গাছ উপড়ে পড়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী মাঝরাস্তা থেকে গাছগুলি দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা করছে।

ব্যাহত বিমান ও রেল পরিষেবা

ঝড়ের কারণে অন্ধ্রপ্রদেশের তিনটি বিমানবন্দরে বিমান পরিষেবা স্থগিত রাখা হয়েছে। বেশ কিছু বিমান বাতিলও করা হয়েছে। পাশাপাশি বাতিল করা হয়েছে ট্রেন পরিষেবাও। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু জানান, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে যাতে কারও কোনও ক্ষতি না হয়, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রায় দু’হাজারেরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। উপকূল এলাকা থেকে ‌ইতিমধ্যেই বহু মানুষকে সরিয়ে এই কেন্দ্রগুলিতে নিরাপদে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গর্ভবতী মহিলাদের চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় একাধিক ট্রেন বাতিল করেছে রেল। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কমিটির বৈঠকে প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সচিব সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষতি যথাসম্ভব কমানোর নির্দেশ দেন। অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন। স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া শেষ হলেও বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার প্রভাব কিছু সময় বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা।

৮৯ হাজার মানুষকে অন্যত্র স্থানান্তর

অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। তার মধ্যে বিশাখাপত্তনমে ২০০ মিলিমিটারের বেশি এবং কোঠাবল্লসায় ১৬২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে নিচু এলাকা ও রাস্তাঘাট জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। কাঁকিনাড়া ও ইয়ানাম উপকূলে সমুদ্রের জলের উচ্চতা দেড় থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যার ফলে উপকূলীয় গ্রামগুলো প্লাবিত। অন্ধ্রপ্রদেশ প্রশাসন প্রাথমিক সমীক্ষার পরে জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে পূর্ব ও পশ্চিম গোদাবরী জেলার কমবেশি ৪০ হাজার হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধান ও অন্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া, ঝড়ে বহু মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রশাসন কমবেশি ৮৯ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও পুলিশ আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার ও রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চালাচ্ছে।

ওড়িশায় প্রস্তুত উদ্ধারকারী দল

ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলায় ওড়িশায় ৩১৩টি উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ৬০টি দল, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ৯টি দল এবং দমকল ও জরুরি পরিষেবার ২৪৪টি দল। পাশাপাশি প্রস্তুত রয়েছে ২,০৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র। ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী মহিলাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আগেই। মৎস্যজীবীদেরও উপকূলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে সোমবারের মধ্যে। প্রশাসনের লক্ষ্য, কোনও প্রাণহানি যাতে না হয়। ওড়িশা প্রশাসন সূত্রে খবর, সেখানেও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিভিন্ন জায়গায় প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে ও ঝোড়ো হাওয়া বইছে। গজপতি, গঞ্জাম, রায়গাড়া, কোরাপুট, নওরংপুর, মালকানগিরি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। পুরী, খুর্দা, সম্বলপুর, দেওগড়, কালাহান্ডি, কান্ধামাল, নুয়াপাড়াতেও ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি চলছে। রাজ্যের দক্ষিণ অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলি থেকে কমবেশি ৪৮ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে ও মাল্টিপারপাস ফ্লাড সেন্টারে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।  পুরী-সহ বিভিন্ন সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের নামা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং লাল সতর্কতা নিশান ওড়ানো হচ্ছে।

স্থলভাগে  প্রবেশের পর শক্তিক্ষয় অর্ণবের

ঝাড়খণ্ডের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। রাঁচি, খুঁটি, সিমডেগা, গুমলা, লোহারদাগা-সহ কয়েকটি জেলায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে স্থলভাগে ঢোকার পর দ্রুত শক্তিক্ষয়ের ইঙ্গিত মিলেছে ঘূর্ণিঝড়ের। ছত্তিশগড়েই সুস্পষ্ট নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে অর্ণব। স্থলভাগে আছড়ে পড়ার পর ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ধীরে ধীরে উত্তর পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

বাংলায় বৃষ্টি, দিঘায় উত্তাল সমুদ্র

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে কলকাতায় মঙ্গলবার বৃষ্টি হয়েছে হালকা। বুধবার ভোর থেকে আকাশের মুখ ভার। যদিও আপাতত রোদ উঠেছে। অর্ণবের দাপট খুব বেশি বোঝা যাচ্ছে না। দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলা, বিশেষ করে উপকূলীয় জেলাগুলির অবস্থা যদিও এমন নয়। দিঘায় উত্তাল সমুদ্র, আকাশ অন্ধকার, পাশাপাশি প্রবল হাওয়ার দাপট রয়েছে মঙ্গলবার রাত থেকেই। উপকূলবর্তী সমস্ত এলাকায় সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। আবহাওয়া খারাপ দক্ষিণ ২৪ পরগনার কিছু জায়গাতেও। বুধবার কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় রয়েছে হলুদ সতর্কতা। ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। চার জেলায় রয়েছে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামে ভারী (৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার) বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ওই চার জেলায় ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। বৃহস্পতিবারও কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় ঝড়বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। ওই দিন ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া। শুক্রবার ঝড়বৃষ্টির জন্য সতর্কতা রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদিয়ায়।

উত্তরবঙ্গে বৃষ্টির পূর্বাভাস

পুজোর মরশুমে পাহাড়ে এখন লোকের ঢল। মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখলেই ভেসে উঠছে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। তবে, নিম্নচাপের প্রভাবে বৃহস্পতি এবং শুক্রবার ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার এবং জলপাইগুড়ি জেলায়। বাকি জেলাগুলিতেও রয়েছে ঝড়বৃষ্টির জন্য হলুদ সতর্কতা। বর্ষণের জেরে পাহাড়ি এলাকায় ধস নামতে পারে বলে সতর্ক করেছে হাওয়া অফিস। আগামী শনিবার পাহাড় এবং সংলগ্ন পাঁচ জেলায় রয়েছে ঝড়বৃষ্টির সতর্কতা।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share