India Italy Relation: ‘মেলোডি’-র হাত ধরে ভারত-ইটালির কূটনীতিতে নয়া মোড়! কী হল মোদি-মেলোনি বৈঠকে?

india Italy relation pm modi and meloni meeting unlocks new era of cooperation

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কূটনীতিতে চকোলেটের মতো মিষ্টি-মধুর সম্পর্ক তৈরি হল ভারত-ইটালির (India Italy Relation)। ‘মেলোডি’ শুধু দুই ব্যক্তির বন্ধুত্বপূর্ণ রসায়নেই থেমে থাকল না। বুধবার ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে পাশে (Modi-Meloni Meet) নিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘স্পেশাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপে’ পরিণত করার ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জানিয়ে দিলেন বাণিজ্য থেকে প্রতিরক্ষায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবে দুই দেশ। মোদি-মোলোনির বন্ধুত্বের ছাপ পড়ল দুই দেশের সম্পর্কেও। যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বাড়ানোর কথা জানিয়ে জর্জিয়া বলেন, ‘বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৪ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৯ সালের মধ্যে সেটিকে আমরা ২২ বিলিয়ন ইউরোতে নিয়ে যেতে চাই।’

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে বিশাল সুযোগ

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন ইটালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি। আর সেটাকেই কাজে লাগাতে চান ‘মেলোডি’। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সময়ে ইটালির সমর্থনের জন্য মেলোনিকে ধন্যবাদ জানান মোদি। সোজাসুজি বলে দেন, ‘দুই দেশের ব্যবসায়ীরা যাতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পান, তার জন্য আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’ ২০২৩ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪০০ কোটি ইউরো। ২০২৯ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০০ কোটি ইউরোতে (সাড়ে ২ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি) পৌঁছোনোর যৌথ লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে ভারতে ৮০০-র বেশি ইটালির সংস্থা কাজ করছে।

ইন্ডিয়া-ইটালি ইনোভেশন সেন্টার

প্রযুক্তির উপরে সবচেয়ে বেশি জোর দেন মোদি। তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা ও অসামরিক পারমাণবিক শক্তির মতো ক্ষেত্রে ভারত-ইতালির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।’ দুই দেশের স্টার্টআপ, গবেষণা কেন্দ্র ও শিল্পক্ষেত্রকে যুক্ত করতে একটি ‘ইন্ডিয়া-ইটালি ইনোভেশন সেন্টার’ গড়ে তোলার কথাও ঘোষণা করেন তিনি। প্রতিরক্ষা এবং ক্লিন এনার্জি খাতেও একসঙ্গে কাজ হবে বলে ঘোষণা করেছেন মোদি। প্রতিরক্ষা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি এবং জ্বালানি-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সম্পর্ক নিবিড় করার কথা জানানো হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে।

লজিস্টিকস এবং ব্লু ইকোনমি

ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-সহ পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীতে সঙ্কটের প্রসঙ্গও এসেছে যৌথ বিবৃতিতে। বৈঠকের পরে মোদি বলেন, “প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন আমাদের অংশীদারির চালিকাশক্তি। এআই, কোয়ান্টাম, মহাকাশ এবং অসামরিক পারমাণু শক্তির মতো অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।” জাহাজ চলাচল, বন্দর আধুনিকীকরণ, লজিস্টিকস এবং ব্লু ইকোনমি আগামী দিনে নয়াদিল্লি-রোম সম্পর্কের অন্যতম ভরকেন্দ্র হবে বলেও জানান মোদি। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা— ‘‘হেলিকপ্টার, নৌ-প্ল্যাটফর্ম-সহ সমুদ্র-যুদ্ধের উপযোগী অস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা—সংক্রান্ত অংশীদারিত্ব বাড়ানো হবে।’’

প্রেসিডেন্ট মাত্তারেল্লার সঙ্গে সাক্ষাৎ মোদির

২০ মে রোমের কুইরিনালে প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট মাত্তারেল্লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বৈঠকে দুই নেতা ভারত-ইটালি সম্পর্কের দ্রুত অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ গুরুত্ব পায় উদীয়মান প্রযুক্তি ও এআই। ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার উপর জোর দেন দুই নেতা। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের সংঘাত পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় হয়। আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্রপথে স্বাধীন চলাচল এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তাঁরা।

ভারত-পশ্চিম এশিয়া-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর

দুই প্রধানমন্ত্রী ভারত-পশ্চিম এশিয়া-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর (আইএমইসি)-এ সহযোগিতার কথাও ঘোষণা করেছেন। মেলোনি জানিয়েছেন, বিশেষত ছাত্রছাত্রী, গবেষক ও দক্ষ কর্মীদের যাতায়াত বাড়াতে এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নে ভবিষ্যতে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে গাজায় যাওয়া জাহাজ আটক করা নিয়ে ইজরায়েলের সমালোচনা করেন মেলোনি।

ভারত-ইটালি নিয়মিত আলোচনা

মোদি-মেলোনি বৈঠকে স্থির হয়, দুই দেশ প্রতি বছর শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক করবে এবং নিয়মিত মন্ত্রীস্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাবে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ। সন্ত্রাসে অর্থ জোগান বন্ধে যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গুজরাটের লোথালে ন্যাশনাল মেরিটাইম হেরিটেজ কমপ্লেক্স গড়ে তোলা এবং ভারতীয় নার্স নিয়োগ সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারত ও ইতালি ২০২৭ সালকে সংস্কৃতি এবং পর্যটনের বছর “Year of Culture and Tourism” হিসেবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

একে অপরের পরিপূরক

যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ইটালির ডিজাইন ও জিনিস তৈরির দক্ষতা এবং ভারতের উদ্ভাবনী চিন্তা একে অপরের পরিপূরক। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি এই দিনটিকে “ঐতিহাসিক” বলে উল্লেখ করে জানান, ভারত-ইতালি সম্পর্ক এখন এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদিকে গার্ড অফ অনার দেওয়া হয়। কূটনৈতিক বৈঠকের বাইরেও নজর কাড়ে মোদি-মেলোনি দুই নেতার ব্যক্তিগত মুহূর্ত। কূটনীতির টেবিলে চুক্তির কালি শুকোতে সময় লাগে। তবে ‘মেলোডি’র মিষ্টি স্বাদ বুঝিয়ে দিয়েছে— ভারত ও ইটালির সম্পর্ক এখন শুধু কাগজে-কলমে নয়, তাতে অন্য রসায়নও দানা বাঁধছে।

 

 

 

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share