মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে (PM Modi) প্রকাশ্য বিতর্কে বসার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। এবার সেই চ্যালেঞ্জের পাল্টা জবাব দিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (Nirmala Attacks Rahul)। তাঁর প্রশ্ন, বিতর্কের জন্য আলাদা জায়গা খোঁজার প্রয়োজন কী? সংসদ তো রয়েছেই। সেখানে বিরোধী দলনেতা হিসেবে রাহুল গান্ধীর উপস্থিত থাকার কথা। গত ৩ নভেম্বর সমাজমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট করে রাহুল গান্ধীকে কটাক্ষ করেন নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman)। তিনি লেখেন, “রাহুলজি, আপনি প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কের জন্য একটি জায়গা বেছে নিতে বলছেন। সেই জায়গা তো আগে থেকেই রয়েছে—সংসদ, যেখানে আপনি বিরোধী দলনেতা।”
সংসদে বিতর্কে অংশ নেওয়ার আহ্বান
নির্মলা সীতারামন তাঁর বক্তব্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) এবং ইভিএম নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন অমিত শাহ। সেই প্রসঙ্গ তুলে অর্থমন্ত্রীর প্রশ্ন, সংসদের বাইরে বিতর্কে এত আগ্রহ থাকলেও সংসদের ভিতরে আলোচনায় অংশ নিতে একই রকম উৎসাহ দেখা যায় না কেন? তাঁর অভিযোগ, সংসদে সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলার পর সেই অভিযোগের জবাব দেওয়ার সময় রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের সাংসদরা বারবার অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন। কংগ্রেস এবং ইন্ডিয়া জোটের সাংসদদের বিরুদ্ধে সংসদের কাজকর্ম ব্যাহত করার অভিযোগও তোলেন তিনি। এর ফলে সংসদের একাধিক দিনের কাজকর্ম কার্যত ভেস্তে গিয়েছে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী।
মক পার্লামেন্ট নিয়ে কটাক্ষ নির্মলার
সীতারামনের কথায়, “উত্তর দাবি করার পাশাপাশি সেই উত্তর শোনার দায়িত্বও রয়েছে।” তাঁর বক্তব্য, সংসদে আলোচনা চলতে না দিয়ে কীভাবে বিতর্কের দাবি জানানো যায়? সম্প্রতি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে আয়োজিত মক পার্লামেন্ট নিয়েও কটাক্ষ করেন নির্মলা। তাঁর মতে, সেটি মক পার্লামেন্টের চেয়ে সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি উপহাসই বেশি ছিল। গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার কথা বলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি আচরণেও তার প্রতিফলন থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণও পেশ করুন’
শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, রাহুল গান্ধীর অভিযোগের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। তাঁর দাবি, একের পর এক অভিযোগের তালিকা তৈরি করলেই তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। অভিযোগের সমর্থনে নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ সামনে আনতে হবে। সীতারামন বলেন, “আপনি যে বিষয়গুলি নিয়ে অভিযোগ তুলছেন, সেগুলির নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ পেশ করুন। একগুচ্ছ অভিযোগ একসঙ্গে তুলে ধরলেই আপনার বক্তব্যের জোর বাড়বে না।” রাহুল গান্ধীর বহুল ব্যবহৃত স্লোগান ‘ডরো মত’-এর প্রসঙ্গ টেনেও তাঁকে কটাক্ষ করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ভয় না পেয়ে তথ্য সামনে আনুন, প্রশ্নের মুখোমুখি হন এবং সংসদে থেকে সরকারের জবাব শুনুন।
কী বলেছিলেন রাহুল গান্ধী?
উল্লেখ্য, নির্মলা সীতারামনের এই প্রতিক্রিয়া এসেছে রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রকাশ্য বিতর্কে বসার চ্যালেঞ্জের পর। বিদেশি যোগ, দেশের আর্থিক ব্যবস্থা-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। এক্স-এ নিজের পোস্টে রাহুল দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কের জন্য যে কোনও জায়গা বেছে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ জানানোর পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। তিনি প্রস্তাব দেন, দুই নেতা মুখোমুখি বসে আলোচনা করুন। সেখানে সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি দেশের যুবসমাজও উপস্থিত থাকবে। এমনকী, বিতর্কের বিচারক হিসেবে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের নামও প্রস্তাব করেন তিনি। এছাড়াও ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাহুল। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাকে না জানিয়েই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। আদানি মামলা এবং এপস্টিন সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাব চান তিনি। নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মানহানির মামলার প্রসঙ্গ তুলে রাহুল দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৪৫টি মামলা রয়েছে। বিদেশি যোগ নিয়ে তাঁর মন্তব্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী চাইলে আরও একটি মামলা করতে পারেন বলেও চ্যালেঞ্জ জানান তিনি। রাহুলের বক্তব্য, “সত্য সামনে আসুক। সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাক।” ফের ‘ডরো মত’ স্লোগান তুলে প্রধানমন্ত্রীকে প্রকাশ্য বিতর্কে বসার আহ্বান জানান তিনি।
নির্মলা বনাম রাহুল
এর আগে কানাডার সংস্থা ফেয়ারফ্যাক্সের কাছে আইডিবিআই ব্যাঙ্ক বিক্রির কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন রাহুল গান্ধী। তার প্রেক্ষিতে সমাজমাধ্যমে নির্মলা স্পষ্ট বলেছেন, আইডিবিআই ব্যাঙ্ক যখন এনডিএ সরকারের হাতে আসে, তখন ব্যাঙ্কের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। ধুঁকছিল ব্যাঙ্ক। এই পরিস্থিতির জন্য কংগ্রেসকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নির্মলার দাবি, নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলেই আইডিবিআই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নির্মলার অভিযোগ, কংগ্রেস ব্যাঙ্ককে নিজেদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করত। যখন ইচ্ছা-যাকে ইচ্ছা ঋণ দিয়ে দিত। এমনকী কর্মীদেরও চাপ দেওয়া হত।” অর্থমন্ত্রী সাফ বলে দেন, কংগ্রেস জমানায় আইডিবিআইকে একপ্রকার বাধ্য করা হয় বিভিন্ন ডুবে যাওয়া সংস্থায় বিনিয়োগ করাতে। রাহুল গান্ধী তাঁর এক্স পোস্টে অভিযোগ করেছেন, টাটা গোষ্ঠীকে অপরাধমূলকভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, অথচ দেশের কোনও শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী নেতা এ বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। রাহুলের এই আক্রমণের জবাবে নির্মলা সীতারামন তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। প্রতিটি বিষয়কে রাজনীতির রং দেওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, কোনও বাণিজ্যিক বা আইনি বিরোধকে প্রমাণ ছাড়াই অপরাধমূলক বলে চিহ্নিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। আর এবার, সংসদের ভিতরে বিতর্কের মঞ্চ বনাম সংসদের বাইরে প্রকাশ্য বিতর্ক—এই দুই অবস্থানকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে নির্মলা ও রাহুল তথা বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে।

Leave a Reply