মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আজ ১৫ অগাস্ট। স্বাধীনতা দিবস। ১৯৪৭ সালের এই দিনেই দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ভারত। স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক এই দিন। দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেশের প্রত্যন্ত প্রান্ত—জাতীয় পতাকার রঙে সেজে উঠেছে ভারত। স্বাধীনতা অর্জনের এই পথ অবশ্য সহজ ছিল না। বহু আন্দোলন, বিদ্রোহ, আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এসেছে ১৯৪৭-এর ১৫ অগাস্ট। আজকের দিনে তাই ফিরে দেখা যাক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৮৫৭-র বিদ্রোহ: স্বাধীনতার প্রথম বড় স্ফুলিঙ্গ
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ইতিহাসে এটি সিপাই বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবেও পরিচিত। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ দ্রুত বিস্তৃত আকার নেয়। মঙ্গল পাণ্ডে, বাহাদুর শাহ জাফর, রানি লক্ষ্মীবাই, নানা সাহেব-সহ বহু নেতা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের আগুন।
স্বদেশি আন্দোলন: বিদেশি পণ্য বর্জনের ডাক
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে স্বদেশি ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বিদেশি পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয় দেশবাসীকে। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় স্বদেশি আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন পায়। বাল গঙ্গাধর তিলকের মতো নেতারা দেশীয় শিল্প ও পণ্যের প্রসারে জোর দেন। স্বদেশি ভাবনা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন
স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ভারত ছাড়ো আন্দোলন। ১৯৪২ সালের ৮ অগাস্ট বম্বেতে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশদের উদ্দেশে ওঠে ‘ভারত ছাড়ো’ স্লোগান। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে স্বাধীনতা অর্জন। দেশজুড়ে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয় এবং বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী গ্রেফতার হন।
ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকা থেকে আজকের তেরঙা
স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকার বর্তমান রূপ একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯০৬ সালের ৭ অগাস্ট কলকাতার পার্সি বাগান স্কোয়ারে একটি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। সেই পতাকায় ছিল সবুজ, হলুদ ও লাল রং। পরবর্তীতে জাতীয় পতাকার নকশায় একাধিক পরিবর্তন আসে। ১৯২১ সালে পিঙ্গালি বেঙ্কাইয়া তেরঙার নকশা উপস্থাপন করেন। বর্তমান জাতীয় পতাকায় রয়েছে গেরুয়া, সাদা ও সবুজ রং এবং মাঝখানে ২৪টি কাঁটাযুক্ত নীল অশোকচক্র। ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই সংবিধান সভা ভারতের জাতীয় পতাকার বর্তমান নকশা গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর ১৫ অগাস্ট দিল্লির লালকেল্লায় প্রথমবার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু।
‘জনগণমন’ কীভাবে জাতীয় সঙ্গীত হল?
ভারতের স্বাধীনতার সময় কোনও আনুষ্ঠানিক জাতীয় সঙ্গীত ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১১ সালে ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’ রচনা করেন। পরবর্তীতে এর প্রথম স্তবক ‘জনগণমন’ নামে পরিচিত হয়। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান সভা ‘জনগণমন’-কে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করে।
জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-এর ইতিহাস
স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ শুধু একটি গান ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ গানটি রচনা করেন। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান সভা ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
র্যাডক্লিফ লাইন ও দেশভাগ
স্বাধীনতার সঙ্গে ভারতীয় ইতিহাসে যুক্ত হয়ে আছে দেশভাগের গভীর বেদনা। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে। পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগের সীমারেখা নিয়ে কাজ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৭ সালের ১৭ অগাস্ট তা প্রকাশ্যে আসে। স্বাধীনতার মাত্র দু’দিন পর প্রকাশিত সেই সীমারেখা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও বাসস্থানকে বদলে দেয়।
১৫ অগাস্ট ১৯৪৭: স্বাধীন ভারতের জন্ম
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন—১৫ অগাস্ট, ১৯৪৭। দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ভারত। একই সঙ্গে দেশভাগের ফলে জন্ম নেয় পাকিস্তান। ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন প্রথমে ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এগিয়ে আনা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা অর্জন করে ভারত।
লালকেল্লায় প্রথম তেরঙা উত্তোলন
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট দিল্লির লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। স্বাধীনতার প্রথম প্রভাতে জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন তিনি। সেই ভাষণে নেহরুর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল স্বাধীন ভারতের নতুন যাত্রার প্রত্যয়—“গোটা পৃথিবী যখন ঘুমোচ্ছে, তখন ভারত জাগবে নতুন জীবন ও স্বাধীনতা নিয়ে।” আজ ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে সেই আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও স্বপ্নকেই ফের স্মরণ করছে দেশ। স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়— এটি ভারতীয় গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় চেতনার ভিত্তি।

Leave a Reply