মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ‘বন্দে মাতরম’ সম্পূর্ণ গাওয়া নিয়ে বিতর্কের জেরে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বংশধর তথা পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক বিজেপির সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও যন্ত্রণা প্রকাশ করে তিনি সোনিয়ার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সুমিত্র ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নৈহাটি কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়েছেন। চিঠিতে সুমিত্র অভিযোগ করেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ পরিবেশনা থামানোর চেষ্টা আসলে “ঐতিহাসিক ভুলের নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি”। তাঁর দাবি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ গাওয়ার সময় কংগ্রেস কর্মীদের থামানোর বারবার চেষ্টা তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।
‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ সংস্করণ (Bankim Chandra)
সুমিত্রর কথায়, “আজ, ১৫ আগস্ট ২০২৬, স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষপূর্তির এই পবিত্র সকালে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ ভারতমাতাকে শ্রদ্ধা জানাতে নিবেদিত, তখন সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সদর দফতরে যা ঘটেছে, তা শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, বরং ঐতিহাসিক ভুলের নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি।” তিনি এও বলেন, “বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ সংস্করণ কংগ্রেস কর্মীরা যখন গাইছিলেন, তখন তাঁদের অস্বস্তি, অসন্তোষ এবং বারবার থামানোর চেষ্টা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিক, দেশপ্রেমিক এবং সর্বোপরি ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের সরাসরি বংশধর হিসেবে গভীর বেদনা, শূন্যতা ও যন্ত্রণা নিয়ে আমি এই চিঠি লিখছি।” কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগও তুলেছেন বিজেপি বিধায়ক। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লিগের অধিবেশনে মহম্মদ আলি জিন্নার ‘বন্দে মাতরম’-কে মুসলিমবিরোধী আখ্যা দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, সেই আপত্তির জেরে কংগ্রেস সরকারি অনুষ্ঠানে গানটির প্রথম দু’টি প্রকৃতিবন্দনামূলক স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, সেই আপসের ছায়া এখনও কংগ্রেসের মতাদর্শ ও আচরণে দেখা যায়।
দ্বিচারিতা নতুন কিছু নয়
চিঠিতে সুমিত্র লেখেন, “ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, আপনাদের কথিত দ্বিচারিতা নতুন কিছু নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে আপনারাও মহম্মদ আলি জিন্নার অযৌক্তিক আপত্তির কাছে নতিস্বীকার করে এই চিরন্তন দেশাত্মবোধক গানকে খণ্ডিত করেছিলেন। সেই আপসের ছায়া এখনও আপনাদের মতাদর্শে দৃশ্যমান এবং আজ আপনাদের আচরণে তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।” ঘটনার জেরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আবেগেও আঘাত লেগেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আজকের এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আবেগ গভীরভাবে আহত হয়েছে। বিষয়টি আপনাকে জানানো আমার নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করি।” সোনিয়ার উদ্দেশে তাঁর আবেদন, “বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের বংশধর হিসেবে অত্যন্ত বিনীত কিন্তু দৃঢ় ভাষায় আমি আপনাকে আত্মসমালোচনা করে আমার সমস্ত দেশবাসীর কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে, আপনার আচরণের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। যে নেতৃত্ব নিজের স্বাধীনতার মন্ত্রকেই সম্মান করতে ব্যর্থ হয়, ইতিহাসে তাঁর স্থান বিস্মৃতির অন্ধকারে।”
অমিত মালব্যর অভিযোগ
এর আগে বিজেপি নেতা অমিত মালব্য অভিযোগ করেছিলেন, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে কংগ্রেসের সদর দফতরে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ পরিবেশনা বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বার্তায় তাঁর দাবি, অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের প্রথম স্তবকগুলি গাওয়ার পর সোনিয়া “অসন্তুষ্ট” হয়ে তা থামানোর কথা বলেছিলেন। রাহুলও (গান্ধী) গান শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন মালব্য। তবে পরে তাঁদের জানানো হয় যে গানটি চলবে এবং শেষ পর্যন্ত ‘বন্দে মাতরম’ পূর্ণাঙ্গ পরিবেশন করা হয়। এই ঘটনার নিন্দা করে মালব্য অভিযোগ করেন, গান্ধী পরিবারের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ও সভ্যতাগত শিকড়ে প্রতিষ্ঠিত ভারতের ধারণার সম্পর্ক বরাবরই অস্বস্তিকর। ঘটনা প্রসঙ্গে সুমিত্র বলেন, “তাঁর কাজ সত্যিই লজ্জাজনক। এটি দেশের প্রতি অপমান। গোটা ভারত এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতি অপমান। আমার গোটা পরিবার এতে ব্যথিত হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, এত বছর ভারতে বসবাস করেও সোনিয়া গান্ধী তাঁর ইতালীয় সংস্কৃতিকে ভুলতে পারেননি।”
সোনিয়াকে ই-মেলে চিঠি
তিনি জানান, বিষয়টি জানিয়ে সরাসরি সোনিয়াকে ই-মেলে চিঠি পাঠিয়েছেন এবং দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকেও তার প্রতিলিপি দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “দেখা যাক, তাঁরা বিষয়টি বুঝতে পারেন কি না।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ভারতের রাষ্ট্রপতি বা অন্য কোনও সরকারি আধিকারিককে তিনি চিঠি দেননি, যাঁকে এই ঘটনার জন্য দায়ী মনে করেছেন, তাঁকেই সরাসরি জানিয়েছেন এবং দলের প্রধানকে প্রতিলিপি পাঠিয়েছেন।

Leave a Reply