US Midterm Election: মার্কিন কংগ্রেসে ধাক্কা ট্রাম্পের! ডেমোক্র্যাটদের জয়ে ভারতের জন্য কী কী নতুন সম্ভাবনা তৈরি হল?

us midterm election results trump republicans' loss what is the affect of relation with india

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মার্কিন রাজনীতিতে বড়সড় পালাবদল। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে (US Midterm Election) কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিল ডেমোক্র্যাটরা। ৪ নভেম্বর প্রকাশিত নির্বাচনের ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর রিপাবলিকান দলের কাছে বড় ধাক্কা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর এই প্রথম মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাল রিপাবলিকানরা।

মানুষের ক্ষোভের মুখে ট্রাম্প

মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনীতির অস্থিরতা, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং সরকারি স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ—একাধিক ইস্যুতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে নির্বাচনের ফলাফলে। আর এই ফলাফলের দিকে বিশেষ নজর ছিল ভারতেরও। কারণ, গত কয়েক মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভারতের রফতানি ও অর্থনীতিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় ভারতের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসতে পারে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের সমস্ত জটিলতা যে রাতারাতি মিটে যাবে, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই।

ট্রাম্পের ক্ষমতায় লাগাম, বাড়বে সিদ্ধান্তে বাধা?

২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে থাকবেন ট্রাম্প। তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় তাঁর সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও অভিবাসন নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়তে পারে কংগ্রেসের নজরদারি। তদন্ত, শুনানি, বাজেট সংক্রান্ত ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর নজরদারির মাধ্যমে ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতির রাজনৈতিক মূল্য বাড়াতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও চাপে পড়তে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বাণিজ্য ও শুল্কনীতি: ভারতের জন্য কি মিলবে স্বস্তি?

ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম বাণিজ্য। ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্কনীতির জেরে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড়সড় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একসময় ভারতীয় পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপানো হয়েছিল। পরে অধিকাংশ ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সেই শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা এবং ভারতীয় কৃষিপণ্যের বাজারে মার্কিন প্রবেশাধিকার—এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই জটিলতা রয়েছে দুই দেশের মধ্যে। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেসে এবার মার্কিন ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির উপর অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে ভারতের উপর শুল্কের চাপ কমানোর বিষয়ে আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ডেমোক্র্যাটরাও সব ক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্যের সমর্থক নন। তাই অবিলম্বে শুল্ক প্রত্যাহারের সম্ভাবনা এখনও স্পষ্ট নয়।

রুশ তেল আমদানি: চাপ কি কমবে ভারতের উপর?

রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার কারণে ভারতের উপর একাধিকবার চাপ তৈরি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। রুশ তেল কেনা দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪৪ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে। ফলে রুশ তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কনীতির প্রভাব ভারতের অর্থনীতির উপর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয় আপাতত ভারতের উপর মার্কিন চাপ কিছুটা কমাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

এইচওয়ান বি ভিসা: ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের জন্য আশার আলো?

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এইচওয়ান বি ভিসা। নির্দিষ্ট কিছু নতুন এইচওয়ান বি ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ১ লক্ষ ডলারের অতিরিক্ত ফি আরোপের প্রস্তাব ঘিরে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এর ফলে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ফেডারেল আদালত এই ফি কার্যকরের উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে। পাশাপাশি, মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (USCIS) ফি ছাড়াই জমা পড়া কিছু আবেদন অনুমোদন করতে শুরু করেছে। এবার কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় দক্ষ বিদেশি কর্মীদের উপর বিধিনিষেধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কর্মী নিয়োগে এই নীতির প্রভাব খতিয়ে দেখা হতে পারে। ফলে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও অভিবাসন নীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখনও প্রেসিডেন্টের প্রশাসনিক ক্ষমতার আওতায় রয়েছে।

প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা: বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত ও আমেরিকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব বেশি পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে দুই দেশ ১০ বছরের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামোতে সম্মত হয়েছিল। এর আওতায় কৌশলগত সহযোগিতা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান এবং যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের বিষয়গুলি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ভারত ও আমেরিকার অভিন্ন উদ্বেগ দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। আমেরিকায় রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় শিবিরের মধ্যেই ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন রয়েছে। তাই কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও এই ক্ষেত্রে বড়সড় নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

ভারতের জন্য কৌশলগত সুবিধা, নাকি বাড়বে অনিশ্চয়তা?

মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয় ভারতের সামনে আলোচনার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সমস্ত নীতি যে বদলে যাবে, তা নয়। বাণিজ্য, বাজারে প্রবেশাধিকার, অভিবাসন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক—এই বিষয়গুলিতে দুই দেশের মতপার্থক্য থেকেই যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকার রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে ভারতের বিদেশনীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা উচিত নয়। বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প অংশীদারিত্ব বাড়ানো, দেশীয় উৎপাদন শক্তিশালী করা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধির উপর জোর দিতে হবে। সব মিলিয়ে, মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয় ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ভারতের জন্য তা আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি করলেও ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ নীতির অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটবে না। এটাই ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল থেকে ভারতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share