Sona Pappu Arrest: প্রোমোটার, পুলিশকর্তার পর তোলাবাজি-জমি দুর্নীতি তদন্তে ইডির জালে ‘কসবার ত্রাস’ সোনা পাপ্পু, এবার কি কোনও হেভিওয়েট?

ed-arrests-sona-pappu-after-marathon-questioning-over-land-scam-hawala-links-financial-fraud-and-extortion-case

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দক্ষিণ কলকাতার বহুল চর্চিত ব্যবসায়ী (প্রকারম্তরে সমাজবিরোধী) তথা ‘কসবার ত্রাস’ বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পু অবশেষে গ্রেফতার হলেন। সোমবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর দফতরে হাজিরা দেওয়ার পর টানা প্রায় ৯ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে তাঁকে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আর্থিক প্রতারণা, তোলাবাজি, জমি দখল, বেআইনি নির্মাণ এবং হাওয়ালা লেনদেন-সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছিল বহুদিন ধরেই।

কাঁকুলিয়ার বোমাবাজি ঘটনায় উঠে আসে নাম

ভোটের আগেই নানা বিতর্কে নাম জড়িয়েছিল কসবার এই ব্যবসায়ীর। বিশেষ করে গোলপার্কের কাঁকুলিয়া এলাকা এবং রবীন্দ্র সরোবর থানা সংলগ্ন এলাকায় বোমাবাজি, গুলি চালানো, ভাঙচুর ও অশান্তির ঘটনায় তাঁর নাম উঠে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই অশান্তির নেপথ্যে ছিলেন সোনা পাপ্পু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরা। যদিও অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই কার্যত আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন তাঁকে খুঁজে না পাওয়ায় তদন্তকারীদের সন্দেহ ছিল, তিনি ভিনরাজ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে এই সময়ের মধ্যেই দু’বার ফেসবুক লাইভে এসে সোনা পাপ্পু দাবি করেছিলেন, তিনি পলাতক নন এবং কোনও বেআইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিকভাবে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে। কিন্তু তদন্ত থেমে থাকেনি।

হঠাৎ ইডি দফতরে হাজিরা, সঙ্গে স্ত্রী

সোমবার সকালে আচমকাই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সল্টলেকের ইডি অফিসে পৌঁছে যান সোনা পাপ্পু। উল্লেখযোগ্য বিষয়, তিনি কোনও নতুন নোটিস ছাড়াই নিজে থেকে হাজিরা দেন বলে জানা গিয়েছে। অতীতে একাধিকবার তাঁকে তলব করা হলেও তিনি হাজিরা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। ইডি সূত্রের দাবি, হাজিরা দেওয়ার পর তদন্তকারীরা তাঁকে জমি দখল, আর্থিক লেনদেন, নগদ টাকার উৎস, সম্পত্তি কেনাবেচা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক যোগাযোগ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু তদন্তে অসহযোগিতা, অসংলগ্ন উত্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

বাড়িতে তল্লাশি: নগদ, অস্ত্র, গয়না উদ্ধার

এর আগেই সোনা পাপ্পুর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল নগদ টাকা, সোনা-রুপোর গয়না, সম্পত্তির নথি এবং একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করে ইডি। তদন্তকারীদের দাবি, ওই অস্ত্রটি ব্যবসায়ী জয় কামদারের মাধ্যমে কেনা হয়েছিল। পরে অস্ত্রটি গড়িয়াহাট থানায় জমা করা হয়। শুধু নগদ বা অস্ত্র নয়, উদ্ধার হওয়া নথি ঘেঁটে বেশ কিছু সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের হদিশও পেয়েছেন তদন্তকারীরা। অভিযোগ, নির্মাণ সংস্থা ও প্রোমোটারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তোলা হত এবং সেই অর্থ একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে যেত।

জয় কামদার ও শান্তনু সিনহা বিশ্বাস যোগ

এই মামলায় আগেই গ্রেফতার হয়েছেন বেহালার ব্যবসায়ী তথা সান কনস্ট্রাকশন-এক মালিক জয় কামদার। প্রোমোটার জয় কামদারের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা উদ্ধার হয়েছিল বলে তদন্তকারী সূত্রে খবর। তদন্তে উঠে আসে, সোনা পাপ্পু, জয় কামদার এবং কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাস-এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে তোলাবাজি, জমি দখল এবং আর্থিক লেনদেনে এই চক্র সক্রিয় ছিল। গত মাসে ফার্ন রোডে শান্তনুর বাড়িতেও হানা দেয় ইডি। পরে তাঁকেও গ্রেফতার করা হয়। যদিও সিজিও-তে হাজিরা দিয়ে সোনা পাপ্পু দাবি করেছিলেন, তিনি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসকে চেনেন না এবং কোনওদিন দেখেননি। কিন্তু তদন্তকারীদের দাবি, ফোন রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং একাধিক সাক্ষ্যপ্রমাণে তাঁদের যোগসূত্র মিলেছে।

তদন্তে হাওয়ালা লেনদেনের সূত্রও

ইডি সূত্রে খবর, মামলার তদন্তে হাওয়ালা চক্রের যোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সোনা পাপ্পুর আর্থিক নেটওয়ার্ক কেবল স্থানীয় স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না বলেই সন্দেহ তদন্তকারীদের। বিভিন্ন ব্যবসায়ী, নির্মাণ সংস্থা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের দিকটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী মহলের মতে, এই গ্রেফতার শুধু একজন ব্যবসায়ীর গ্রেফতার নয়—কলকাতার রিয়েল এস্টেট, তোলাবাজি এবং বেআইনি আর্থিক লেনদেনের একটি বড় নেটওয়ার্কের পর্দাফাঁসের সূচনা হতে পারে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য

ভোটপর্ব শেষ হতেই সোনা পাপ্পুর গ্রেফতার রাজনৈতিক মহলেও চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন অধরা থাকার পর তাঁর আচমকা হাজিরা এবং তারপর গ্রেফতার—এই গোটা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, সোনা পাপ্পুর জেরা থেকে আরও বেশ কিছু প্রভাবশালী নাম সামনে আসতে পারে। ফলে আগামী কয়েক দিনে এই মামলায় নতুন গ্রেফতার বা আরও তল্লাশির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এখন আদালতে পেশ করে সোনা পাপ্পুকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাতে পারে ইডি। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য, এই চক্রের আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ার পূর্ণ ছবি সামনে আনা।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share